শ্রদ্ধাঞ্জলি
নির্লোভ সহযাত্রীর বিদায়
আমীর খসরু
হোসেন জিল্লুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাসপাতাল থেকে হয়তো তাঁরই ফোন এসেছিল। আমি ধরতে পারিনি। পরে দেখলাম, আর কোনো সাড়া নেই। ১০ অক্টোবর, শনিবার সন্ধ্যায় আমীর খসরু চলে গেলেন, আর সেই না-ধরা ফোন আমার কাছে একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবে হয়ে রয়ে গেল।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অসুস্থতা কতটা গভীর, তা বেশ কিছুদিন ঠিক বুঝতে পারিনি। ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছি, কিন্তু কিছু কথা পোস্টে ধরে না। তাই এই লেখা।
তাঁর চলে যাওয়ার দুটি দিক আমি দেখি। একটি ব্যক্তিগত। একজন পরিচিত মানুষ, একজন বন্ধু চলে গেলেন। অন্যটি বৃহত্তর। বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশা আজ অনেক কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে। ঠিক এই সময়ে একটি দৃষ্টান্ত কমে গেল।
সাধারণ আগ্রহের সূত্রে
আমাদের পরিচয়ের ভিত্তি ছিল একটি কমন ইন্টারেস্ট। সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, রাষ্ট্রযন্ত্র পরিবর্তনে, অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায়– সবখানে এই প্রশ্নই আমাদের টানত। আমি তা বুঝতে চাইতাম একজন গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে; তিনি একজন সাংবাদিকের। দুই দৃষ্টিকোণের মাঝখানে ছিল একটি কমন মিটিং গ্রাউন্ড।
আমাদের আলাপ ঘুরত রাজনীতি, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ ঘিরে। মওলানা ভাসানীও ছিলেন আমাদের সাধারণ আগ্রহের বিষয়। তিনি এ নিয়ে আমার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেটি কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল বলে আমার মনে পড়ে। ‘বুধবার’-এ আমার বেশ কয়েকটি গভীর আলাপ ছাপা হয়েছিল, যা পরে আমার বইতেও স্থান পেয়েছে। তাঁর বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছি, বক্তাও হয়েছি। আরও কয়েকটি বই লেখার পরিকল্পনার কথাও বলেছিলেন। জানি না, সেগুলো কী পর্যায়ে রেখে গেছেন তিনি।
নির্লোভ, কিন্তু বোকা নন
তাঁর সম্পর্কে একটি বিষয় আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি: তিনি ছিলেন নির্লোভ ধরনের মানুষ। আমাদের কিছু পরিচিত বন্ধু ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে বদলে গেছেন। তাদের নিয়ে আমরা যৌথভাবে অনেক তির্যক মন্তব্য করেছি। কারণ দেখেছি, এক পর্যায়ে এক ধরনের কথাবার্তা, আর ক্ষমতার সুযোগের জায়গায় গিয়ে আরেক ধরনের পরিবর্তন। এটা তাঁকে ব্যথিত করত।
তাঁর মায়ের মৃত্যু ছিল অস্বাভাবিক। আমার যতদূর মনে পড়ে, ঘটনাটি পিরোজপুরে ঘটেছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছ থেকে যে সাড়া পাওয়ার কথা ছিল, তিনি তা পাননি– এই দুঃখ তিনি আমার কাছে বহুবার প্রকাশ করেছেন। কী করা যেতে পারে, আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। কিন্তু নির্লোভ মানে সরল নয়। তিনি বোকা ছিলেন না; সবকিছু ভালো করেই বুঝতেন। রাষ্ট্র নিয়ে, সমাজ নিয়ে তাঁর ধারণা ছিল খুব পরিষ্কার।
তৃণমূলের সাংবাদিকদের পাশে
আমরা একসঙ্গে ভাবছিলাম, স্থানীয় সাংবাদিকদের কীভাবে ক্ষমতায়ন করা যায়; তাদের কীভাবে একজন গবেষক হিসেবে সম্পৃক্ত করা যায়; একটি নেটওয়ার্ক গড়া সম্ভব কিনা। আমাদের পরিচিত বন্ধু ফিলিপ গাইন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করেন; তৃণমূলের সাংবাদিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ নিয়ে আমীর খসরুর মতো তাঁরও গভীর আগ্রহ আছে। আমীর খসরুর লেখার হাত ছিল। তিনি ভালো লিখতেন। তাঁর স্বতন্ত্র সম্পাদকীয় সক্ষমতাও ছিল। কোন কাজ কীভাবে করলে, কোন অ্যাঙ্গেলে দিলে ভালো হয়, এ নিয়ে আমাদের আলাপ হতো।
সাংবাদিকতার সংকট, আর একটি দৃষ্টান্তের ঘাটতি
সাংবাদিকতা এখন বাংলাদেশে পেশা হিসেবে অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখে। আগে নৈতিকতার একটি বিষয় ছিল; মানের একটি বিষয় ছিল। সাংবাদিকতা ছিল নিবেদিত মনোযোগের কাজ। এখন সেখানে ফাটল ধরেছে। একদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে যারা এ জগতে ঢুকেছিলেন, তাদের অনেকে থাকতে চাইছেন না; কেউ কেউ অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য হয়েছেন।
অন্যদিকে প্রশ্ন আরও গভীরের। এই পেশাকে আমরা ফোর্থ স্টেট বলি; কিন্তু আজ তা বলা কঠিন। সাংবাদিক চরিত্র আজ সংকটে। আমি এই সংকটের তিনটি ধরন দেখি: প্রথমটি পেশাদারিত্বের, দ্বিতীয়টি লোভের, অর্থাৎ নির্লোভ থাকতে পারার, আর তৃতীয়টি মানের। অবশ্য মানের প্রশ্ন পেশাদারিত্বেরই অংশ।
যাদের নামে আমরা সাংবাদিক পরিচয় সহজে দিতে পারতাম– আতাউস সামাদ, গ্রামীণ সাংবাদিকতার মোনাজাতউদ্দিন, প্রথম আলোয় হঠাৎ প্রয়াত মিজানুর রহমান খান, এনায়েতুল্লাহ খান– সেই ধরনের দৃষ্টান্ত কমে এসেছে। সংবাদ কেবল একটি কমোডিটি নয়। সাংবাদিকতা সমাজকে আরও উন্নত পর্যায়ে নেওয়া; সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি পেশা। আমীর খসরুর কর্মজীবনে সেই সংযোগ খুব স্পষ্ট ছিল। তাঁর নির্লোভ থাকা সেই সংযোগকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে। এমন সময়ে তাঁর চলে যাওয়া দৃষ্টান্তের ঘাটতিকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিল।
আড্ডা, সোশ্যাল সার্কেল, সামাজিক পুঁজি
আমীর খসরুর একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল: উঁচু মাপের পেশাদার মনোভাবের একটি সার্কেল গড়ে তোলা। আমরা সত্তর-আশির দশকে, নব্বইয়ের প্রথমার্ধ পর্যন্ত, বিআইডিএসে এমন একটি কমন গ্রুপ, এমন একটি সার্কেলের মধ্যে ছিলাম। আমীর খসরু সেই ধরনের সার্কেলের চিন্তা করতেন।
আজকের দুনিয়ায় এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সারাবিশ্বে সোশ্যাল ক্যাপিটাল বলে একটি শব্দ আছে। অর্থবিত্তের কথা আমরা বলি। কিন্তু সোশ্যাল ক্যাপিটাল মানে এই সোশ্যাল সার্কেলগুলো। বাংলাদেশে এখন এর ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
একটি চকলেট
স্মৃতির সবচেয়ে ব্যক্তিগত অংশটি ছোট নয়। আমীর খসরু চকলেট খুব পছন্দ করতেন। মাঝে মাঝে আমাকে বলতেন, চকলেট; আমি মাঝে মাঝে এনে রাখতাম। এই ছোট বিনিময়ের মধ্যেই একটি সম্পর্কের উষ্ণতা ছিল।
খসরু চলে গেছেন। রেখে গেছেন একটি প্রশ্ন: আমরা কি আবার সেই বৃত্ত গড়ব, যেখানে স্বপ্ন নিয়ে বিতর্ক হয়, লোভ নিয়ে নয়?
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ; এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি