ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সংসদে বিতর্ক

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সংসদে বিতর্ক
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ | ০৯:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ব্যাংকটিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। সরকারি দলের দুজন এবং বিরোধী দলের পাঁচজন নেতা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানিয়েছে বিরোধী দল। এই প্রেক্ষাপটে কারও নাম উল্লেখ না করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘একবার যে ব্যাংক আজান দিয়ে দখল করা হলো, সেই ব্যাংকের দখলটা বেদখল হয়ে যাবে, এই যাতনা তো আমরা বুঝি।’ 

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ‘ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে প্রত্যর্পণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধে’ আনা এক নোটিশ নিয়ে এ বিতর্ক হয়। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী এই নোটিশ দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। বিতর্ক চলাকালে জামায়াতে ইসলামীর শরিক এনসিপি সংসদে উপস্থিত ছিল না। 
জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী সংসদে নোটিশ দেওয়া যায়। নোটিশ গ্রহণ করা হলে স্পিকার আলোচনার সময় ঠিক করে দেন।  গতকাল ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আলোচনার জন্য ১ ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়। সরকারি দল ও বিরোধী দল আধা ঘণ্টা করে সময় পায়।

ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারধারীদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডাররা তারা কীভাবে খরিদ করেছে দ্যাট ইজ ডিফারেন্ট ডিবেট (সেটি আলাদা বিতর্ক)। সেটা দুদকের তদন্ত হতে পারে, মামলা হতে পারে। বাট শেয়ারহোল্ডার ইজ শেয়ারহোল্ডার (তবে শেয়ারধারীরা শেয়ারধারী)।’ 

ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ডাকাতি করে নেওয়া হয়েছে– বিরোধী দলের এমন অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইবনে সিনার ২ শতাংশ শেয়ার ছিল, ব্ল্যাক মার্কেটে তিন গুণ দামে তারা শেয়ার বিক্রি করেছে। বর্তমান শেয়ার হোল্ডিং স্ট্যাটাস অনুসারে এখানে ৮১ শতাংশ একটা গ্রুপের। তিনি বলেন, বৈধ এবং প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের কাছে এই মালিকানা ফেরত দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কারা কত শতাংশ শেয়ারের মালিক, সেটা প্রকাশ করার দাবি জানান তিনি। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আরডিএস ইসলামী ব্যাংকের একটা ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প আছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্বাচনের আগে ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের মধ্যে ১০ হাজার করে টাকা বিলি করা হয়েছে। আগে ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর এই ব্যাংক থেকে নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকা এলসির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। পরে মালপত্র বিক্রয় করে ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘দুষ্টু লোকেরা বলে, সেটা কোনো এক দলের (জামায়াত) নির্বাচনী তহবিলে গেছে। তারা একটা টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সেই টিভি চ্যানেলটা কোন পক্ষে খেলছে সেটা আমরা জানি।’
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তার (নাবিল গ্রুপ) ব্যাংক লাইবিলিটি (দায়) হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। তার বিরুদ্ধে তদন্ত কেন হচ্ছে না? সেটা নিয়ে কেন বিরোধীরা আওয়াজ তুলছে না। তবে এটারও তদন্ত হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, একটি গ্রুপকে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনের আগে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। সোশ্যাল করপোরেট রেসপনসিবিলিটির নাম দিয়ে যারা ঢাকা থেকে কক্সবাজার বিমানের টিকিট পর্যন্ত ব্যাংক থেকে করিয়েছে, সেগুলোরও তদন্ত হবে।

সালাহউদ্দিন বলেন, ‘তকবির দিয়ে ব্যাংক দখল’ করার পর ৯ হাজার জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ছয় হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের সবাই একটি রাজনৈতিক মতাবলম্বী। ১৩ হাজার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তিনটি করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই অনিয়মগুলো তো হয়েছে। ইসলামের নামেই তো হয়েছে বলে মনে হয়। সুতরাং এগুলো তদন্ত হলে হয়তোবা আমাদের কারও কারও নাম ওখানে চলে আসতে পারে। তিনি বলেন, ‘একবার যে ব্যাংক আজান দিয়ে দখল করা হলো, সেই ব্যাংকের দখলটা বেদখল হয়ে যাবে– এই যাতনা তো আমরা বুঝি।’ 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা চ্যালেঞ্জ করেছেন যে, ইসলামিক ব্যাংক থেকে যে টাকাগুলো বের হয়েছে, তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জড়িত নয়। এই দাবি সালমান রহমান, সালামও করতে পারেন। কারণ, তারা নিজের নামে কেউ টাকা নেননি।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই প্রশ্নগুলোর উদ্রেগ হয়েছে, কারণ বিগত নির্বাচনে আমরা দেখেছি, কী পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে। অবিশ্বাস্য রকমের টাকা খরচ হয়েছে।’ 
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ইসলামী ব্যংকের চেয়ারম্যানের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিষ্কারভাবে বলেছে, তদন্তে কিছুই পাওয়া যায়নি। একজন চেয়ারম্যানের মনোনয়নের কারণে কোনো ব্যাংকের গ্রাহকরা টাকা উত্তোলন করে চলে যান, এটার কোনো নজির দুনিয়াতে নেই। গ্রাহক দেখে তার ইন্টারেস্ট (মুনাফা) ঠিকমতো পাচ্ছেন কিনা, তিনি টাকাটা ফেরত পাবেন কিনা। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় ইসলামিক ব্যাংক যখন টেকওভার হয়, তখনও গ্রাহকরা টাকা সরিয়ে নেননি।

ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের পেছনে কিছু ব্যাপার আছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে উগ্র মিছিল এবং কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। যারা টাকা তুলে নিচ্ছেন, তারা চেয়ারম্যানের কারণে নয়, মনে হয় তারা ইসলামী ব্যাংককে বিপদে ফেলতে চাইছেন। এর পেছনে কারও হাত আছে। তারা ইসলামী ব্যাংককে ফেইল করে রাজনৈতিক ফায়দা উশুল করতে চায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকটিকে ঘিরে সুবিধাবাদী রাজনীতিতে অর্থায়নের যে প্রক্রিয়া চলছে, এটা শুধু ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এটা রাজনীতির মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
পুরো বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করার চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখানে একটা যোগসূত্র আছে। যারা টাকা নিয়ে যাচ্ছেন, যারা ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন, যারা প্রস্তাবটি এনেছেন, তাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে বলে তিনি মনে করেন।

বিরোধী দলের বক্তব্য
নোটিশের ওপর আলোচনায় অংশ নেন সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতের এমপি নূরন্নেসা সিদ্দিকা, মারদিয়া মমতাজ, ঢাকা-১২ আসনে জামায়াতের এমপি সাইফুল আলম, বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান।

আলোচনায় অংশ নিয়ে শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে শেয়ারহোল্ডার ইজ শেয়ারহোল্ডার। শেয়ারহোল্ডার হয়েছে সেটা পরে দেখা যাবে। এটা পরে কেন? এটা আগেই এক্সপোজ হয়ে গেছে।

এস আলমের বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই ব্যাংক থেকে তিনি একা নিয়েছেন ৮২ হাজার কোটি টাকা। আর সমুদয় শেয়ার কিনে ৮২ শতাংশের মালিক হয়েছেন। এগুলোর মূল্য ১২ হাজার কোটি টাকা। সবগুলো ব্যাংক থেকে ডাকাতি করা টাকা। 

বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, সব শেয়ারহোল্ডারের ওপরে বিশেষ একটা এজেন্সির মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে শেয়ার হস্তান্তরে বাধ্য করা হয়েছিল।
শফিকুর রহমান জানতে চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৭০০ কোটি টাকার বিষয়টি জামায়াতকে বুঝিয়েছেন কি না। যদি সেটা বুঝিয়ে থাকেন তাহলে তিনি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন, এটা প্রমাণ করতে পারলে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মেডেল (পদক) দেবেন। 

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আরডিএস প্রকল্প কোনো দলের নয়, কোনো ধর্মেরও নয়। এই ব্যাংকের গ্রাহক শুধু জামায়াতে ইসলামীর মানুষরাই নন। এই ব্যাংকের গ্রাহক বিএনপিরও বহু লোক আছেন। অন্যান্য ধর্মের আছে। এটা সবার ব্যাংক। 

নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এস আলমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাংকটাকে ধ্বংস করেছেন শেখ হাসিনা। সেই এস আলমকে আবার ফিরিয়ে আনার পথ করা হচ্ছে। নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান যখন ডেপুটি গভর্নর, তখন তিনি এস আলমের সব অপকর্মের সহযোগী ছিলেন।
ইসলামী ব্যাংক কোনো কারণে আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে বসে যাবে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, জোরজবরদস্তি করে যাদের কাছ থেকে এই শেয়ারগুলো ডাকাতি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই মূল্যেই তাদের কাছে আবার ফিরিয়ে দিতে হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব, বিষয়টা তিনি যেন সিরিয়াসলি ভাবেন। কোনো পূর্বধারণা থেকে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে এই ব্যাংকটাকে বাঁচাতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই ব্যাংক বাঁচলে তার আগের জায়গায় ফিরে আসলে, ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার ওপরে মানুষের আস্থা আবার ফিরে আসবে।’

বিরোধীদলীয় নেতার আগে দেওয়া বক্তব্যে ইসলামী ব্যাংক ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি অভিযোগ করেন, ‘(চব্বিশের) গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু এখন উল্টো ব্যাংকের ভেতরে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে।’
আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জোরপূর্বক দখল করা শেয়ার প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দিয়ে সৎ লোকদের মাধ্যমে ব্যাংকটি পরিচালনা করা না হলে তিন কোটি গ্রাহক রাস্তায় নামবে এবং দেশে বড় ধরনের গণআন্দোলন হবে। এস আলমের লোককে বসানোর চেষ্টা হচ্ছে। এস আলমের কোনো লোককে ইসলামী ব্যাংক আশ্রয় দিতে পারবে না।

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুকের প্রসঙ্গ তুলে তাহের বলেন, তাদের নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছিল এবং গ্রাহকদের আস্থাও পুনরুদ্ধার হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে চেয়ারম্যান পরিবর্তন এবং এমডিকে পদত্যাগে বাধ্য করার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে সরকারকে।
তাহের বলেন, কোন কারণে চেয়ারম্যানকে পরিবর্তন করা হলো, কোন কারণে এমডিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো, সেটি জাতির কাছে পরিষ্কার হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে জুবায়দুর রহমান ও ওমর ফারুককে পুনর্বহাল করে আগের ব্যবস্থাপনা কাঠামো ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

আরও পড়ুন

×