ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

প্রবাসীদের জন্য সংসদীয় টাস্কফোর্সের প্রস্তাব বিরোধীদলের

প্রবাসীদের জন্য সংসদীয় টাস্কফোর্সের প্রস্তাব বিরোধীদলের
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ২২:৪৬

প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে সংসদ সদস্য এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সংসদীয় টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব করেছে বিরোধী দল। এই প্রস্তাব বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে সরকারি দল। সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিরা বুধবার সংসদের বৈঠকে এক সুরে প্রবাসীদের সমস্যা তুলে ধরেন। বিএনপির এমপিরা নিজ সরকারের সমালোচনা করেন, প্রবাসীদের ভোগান্তি লাঘব না হওয়ায়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আর যাতে সিন্ডিকেট না হয়, এ দাবি তোলেন। সরকারের পক্ষ আশ্বাস দেয়, প্রধানমন্ত্রী শ্রমবাজার খোলাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অতীতের মত সিন্ডিকেট হবে না।  

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ বিধিতে আনা একটি প্রস্তাব (সাধারণ) এর ওপর আলোচনায় এই দাবি ওঠে আসে। বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এ প্রস্তাবটি আনেন। এতে বলা হয়, ‘দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখা প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সমস্যা সমাধান, তাদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী ও টেকসই করা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত রাখার স্বার্থের বিষয়ে আলোচনা।’ এক ঘণ্টা ২০ মিনিটের এই আলোচনায় সরকারি দল ও বিরোধী দলের মোট ৯ জন সদস্য অংশ নেন। প্রস্তাব আনায় বৈঠকে সভাপতিত্ব করা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ধন্যবাদ জানান বিরোধীদলীয় নেতাকে। তিনি বলেন, এত বছরের সংসদীয় জীবনে কখনও বিরোধীদলকে এমন প্রস্তাব আনতে দেখেননি।

সরকারি দলের পক্ষে শেষ বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানান। বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা সংসদকে প্রাণবন্ত করেছেন প্রস্তাবটি এনে। 

এর আগে জামায়াতের এমপি নজিবুর রহমান মোমেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি বক্রোক্তি করে বলেন, ‘আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুমের পর ভারতে প্রবাসী ছিলেন। সবার তো উনার মত কপাল হয় না। উনি দেশে বীরোচিত সংবর্ধনা পেয়েছেন। এস আলেমর গাড়ি ব্যবহার করেন। আমি সেদিকে যেতে চাই না। তিনি এস আলমের পক্ষে বলেছেন। যার নুন খেয়েছেন, তার গান গেয়েছেন। সেদিকে যেতে চাই না।’

বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার চারটি গাড়ি আছে। চারজন চালক আছে। খুব একটা গরিব মানুষ না। বিদেশ থেকে আসার পর এলাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ সংবর্ধনা দিয়েছেন। সমর্থকরা একেকটি গাড়িতে তুলেছন। যে গাড়ির কথা বলা হচ্ছে, তা কোনো ব্যক্তি নয়, একটি প্রতিষ্ঠানে নামে গাড়িটি নিবন্ধন করা। তাতে আমার সমর্থকরা তুলেছেন। এজন্য আমি আগেও জাতির কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছি।’

এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব প্রসঙ্গে বলেন, মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি যদি খুব দ্রুত গঠন করা যায় অনেক বিষয় আলোচনা করেও সমাধান করা যাবে। অনেক অভিযোগেরও নিষ্পত্তি করা যাবে। তবে টাস্কফোর্স সম্পর্কিত যে প্রস্তাবটা দিয়েছেন, তা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে পারে। আমার মনে হয় টাস্কফোর্স প্রতিষ্ঠা করা যায়।

শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট সম্পর্কে সালাহউদ্দিন বলেন, মালয়েশিয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর নির্ধারিত হয়েছে। তিনি দিয়েছেন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার জন্য। আগে মন্ত্রী এবং উপদেষ্টাকে পাঠিয়েছেন শ্রমবাজার খুলতে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা অভিবাসনকে কলঙ্কিত করেছে, কিছু ক্ষেত্রে মানবপাচারও হয়েছে। এর বিচারে কয়েকদিনে আগে ১০০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। 

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, প্রবাসীরা শুধু সম্মাণ এবং কাজের জন্য পরিবেশ চায়। প্রধানমন্ত্রী যেন শুধু আর্থিক রেমিট্যান্স নয়, ইন্টিলেকচুয়াল রেমিট্যান্সকেও গুরত্ব দেন। প্রবাসীদের উত্তারাধিকারে সমস্যা হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। 

পাসপোর্টের ভুলের কারণে হাজার হাজার প্রবাসী অবৈধ হয়ে পড়েছেন জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, আকার ইকারের ভুলের কারণে অনেকে ভুক্তভোগী হচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উদ্যেগ নিলে পারবেন। টাস্কফোর্স গঠনের যে প্রস্তাব এসেছে, তা বাস্তবায়ন করা হোক। 

পাসপোর্ট ভোগান্তি দূরের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৭৩টি মিশনের ৭১টিতে ই-পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। পাসপোর্ট সংশোধন আবেদন করা যাচ্ছে জন্মনিবন্ধন সনদের মাধ্যমে। পাসপোর্ট সেবা সহজীকরণে পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। 

লিবিয়াতে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিরা যে মানবেতর অবস্থায় রয়েছে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ কারণে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হচ্ছে। 

প্রবাসীদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক। তিনি বলেন, দূতাবাসে যে ধরনের এপ্রোচ দরকার সেটা অনেকক্ষেত্রে হচ্ছে না। 

উচ্চ পর্যায়ের সফর হলে কিছু দরজা খুলবে। মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার মতো অবস্থা। খোলে আবার বন্ধ হয়। এখন পর্যন্ত বন্ধ আছে। এখানে যেন সিন্ডিকেট না হয় সংসদ সদস্যরা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীও এখানে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, সসরকারের বদনাম সৃষ্টি করা যাবে না। ২০২১ সালে এমইউ যেটা হয়েছে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়া থেকে ঠিক করা হয়। ৩ হাজার লাইসেন্সগুলো বাছাই করে গ্রেডিং করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ বিরোধী দলের অভিযোগ নাকচ করে বলেন, সরকার প্রবাসীদের ধারন করে। প্রত্যেক রেমিট্যান্স যোদ্ধার সমস্যা মানবিকভাবে দেখে সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মত অভিবাসন উইং খুলেছে। বাংলাদেশিরা বৈধ বা অবৈধ যেভাবেই বিদেশে যাক, মন্ত্রণালয় তা দেখেছ। পাসপোর্ট নবায়নে সমস্যা রয়েছে। ই-পাসপোর্টের আবেদন অনলাইনে গ্রহণ করা হয়। ইউরোপের পথে লিবিয়ায় দালাল ও জিম্মি করার ঘটনা রয়েছে। দালাল চক্রকে ধরতে না পারা পর্যন্ত এ সমস্যা বন্ধ করা কঠিন। 

শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রীদের সমালোচনা করে বিএনপির এমপি মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, লোটাস কামালের মত দানবদের কারণে প্রবাসীদের এই অবস্থা। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের জন্য দায়ী সিন্ডিকেট। সব সরকারের আমলে সিন্ডিকেট হয়। এই সরকারের সময়ে হবে না, আশা করি। ইউরোপে কর্মীদের জিম্মি মুক্তিপণ আদায় বন্ধে দূতাবাসগুলোর কোনো ভূমিকা আজ পর্যন্ত দেখিনি। মন্ত্রণালয় হয়েছে, বড় বড় বিল্ডিং হয়েছে। তারা কী কাজ করে। কূটনীতিকদের একদিন সংসদে ডাকেন, তাদের প্রশ্ন করি, তারা করে কী।  

এই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সব যখন ধরেছেন, এদেরও ধরেন। এই সময় হাসির রোল পড়ে সংসদে। 

সাম্প্রতিক সৌদি আরব সফরের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনিপর এমপি বরকত উল্লাহ বুলু বলেন, সবচেয়ে নিম্নমানের কাজ করে বাংলাদেশিরা। ৪০০ রিয়ালে চাকরি করে। পাকিস্তানী, নেপালের কর্মী দুই হাজার রিয়াল পর্যন্ত বেতন পায়। তাদের সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে পাঠিয়েছে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের এজেন্সি। এই যে টাকা লুটপাট হয়েছে, এর জন্য মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসকে তদন্ত করতে হবে। মালয়েশিয়ায় গত সরকারের সময়ে এজেন্সির সিন্ডিকেট ২৫ হাজার কোটি লুট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শিগগির মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন। আশা করি, বিএনপি সরকারের সময় সিন্ডিকেট হবে না। 

জামায়াতের এমপি ব্যারিস্টার মাহবুব সালেহী বলেন, এই অর্থবছর ৩২ বিলিয়ন ডলার এসেছে। রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হবে এর জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। প্রবাসীদের ন্যাশনাল প্রসপার পার্টনার- এনপিপি ঘোষণার প্রস্তাব করেন মাহবুব সালেহী। প্রবাসী বন্ড, বিনিয়োগ সুবিধা চালুরও দাবি জানান। 

এনসিপির এমপি আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, প্রবাসীদের সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা করা হয়। নির্বাচন আসলে মঞ্চে ভাষণে বলি প্রবাসীদের গুরুত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যায় বিমানবন্দরে ব্যাগ  কেটে তাদের নিঃস্ব করা হয়। ভিসার নামে তাদের নিঃস্ব করা হয়। ভুয়া চাহিদাপত্র এনে কর্মী পাঠানো হয়। কাজ না পেয়ে না খেয়ে রাস্তায় মারা যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। কিন্ত বাংলাদেশের দূতাবাসে একবার দুঃখপ্রকাশ করা হয়নি। 

আরও পড়ুন

×