‘অনুপ্রবেশকারীদের’ দুষছে আওয়ামী লীগ-জাসদ
সাজ্জাদ রানা, কুষ্টিয়া ও আজিজুল হাকিম, ভেড়ামারা
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৩ | ০৫:১৯
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় রাজনৈতিক আধিপত্য ও পূর্ব বিরোধের জেরে ২ আগস্ট পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক সঞ্জয় কুমার প্রামাণিকসহ তিনজনকে কুপিয়ে আহত করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সহযোগী সংগঠন যুবজোটের নেতাকর্মীরা। বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান সঞ্জয়। এ খবর পেয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা ভেড়ামারা শহরে যুবজোট নেতা মোস্তাফিজুর রহমান শোভন এবং তার আত্মীয়স্বজনের ৯টি বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
জাতীয় নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এ ঘটনায় ভেড়ামারায় ক্ষমতাসীন মহাজোটের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিরাজ করছে উত্তেজনা।
ভেড়ামারা কুষ্টিয়া-২ আসনের একটি উপজেলা; অন্যটি মিরপুর উপজেলা। ২০০৮ সাল থেকে এ আসনে সংসদ সদস্য মহাজোটের শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। একই আসনে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্বাচন করলেও পরাজিত হন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ। জোটের জন্য আসনটি তাঁকে ছেড়ে দিতে হয় এবং পরে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে কুষ্টিয়া-৩ (সদর) থেকে এমপি হন হানিফ। কিন্তু এরপর থেকে ভেড়ামারায় আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। দুই নেতার অনুসারীর মধ্যেও আধিপত্য নিয়ে দেখা দেয় বিরোধ।
নতুন করে সংঘাতের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, জাসদের নেতাকর্মীরা ভেড়ামারায় হত্যার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে দলে ভিড়িয়ে টার্গেট করছে। গত দুই বছরে তারা আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে হত্যা করে রাজনীতির মাঠে ফায়দা নিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভেড়ামারায় জাসদ নেতাকর্মীর যে ৯টি বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বুধবার হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, তারা এক সময় বিএনপি করতেন। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা হাজি নুর ইসলামসহ অন্যরা ইনুর দলে যোগ দেন। বুধবার নুর ইসলামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে আগুন দিয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি করা হয়। নুর ইসলাম আগে পৌর বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন।
এ ছাড়া নিহত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সঞ্জয়ের ওপর হামলার ঘটনায় মূল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান শোভন ও মো. ইয়ামিন ছাত্রদলের কর্মী ছিলেন। ইয়ামিনের চাচা সালাউদ্দিন আহমেদ বর্তমানে ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি। ছাত্রদল ছাড়ার পর শোভনকে যুবজোটের জেলার ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক এবং ইয়ামিনকে পৌর ৯ নম্বর ওয়ার্ড জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি করা হয়।
জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম আলম জানান, নুর ইসলামসহ কয়েকজন এক সময় তাদের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। এখন তারা জাসদ করেন এবং বিএনপির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। সালাউদ্দিন আহমেদ বিএনপির সঙ্গেই আছেন বলে জানান তিনি। সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিএনপি করলেও আমার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো বিরোধ নেই। ভাতিজা ইয়ামিনের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ থেকেই আমি ক্ষমতাসীনদের আক্রোশের শিকার।’
স্বামীর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা জানিয়ে নুর ইসলামের স্ত্রী পলি ইসলাম বলেন, ‘আগে বিএনপি করলেও এখন আমরা জাসদের লোক। সঞ্জয়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব আলম বিশ্বাসের নেতৃত্বে আমাদের বসতঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’
তবে হামলা ও আগুন দেওয়ার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কেউ জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। তবে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউন্সিলর মাহবুব আলমের সঙ্গে নুর ইসলামের বিরোধ বেশ পুরোনো। সঞ্জয়ের মৃত্যুকে কাজে লাগিয়ে মাহবুব তাণ্ডব চালান। হামলায় অংশ নেওয়া বেশির ভাগই হেলমেট পরে ছিলেন এবং বয়সে তরুণ। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অন্তত ৪০ জন বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার সঞ্জয় কুমারের সঙ্গে যুবজোট নেতা শোভনের ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল বলে দাবি করেন জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম স্বপন। তিনি জানান, জমির বিরোধ নিয়ে প্রথমে সঞ্জয়ের ওপরে হামলা হয়, পরে মারা যান তিনি। এটিকে জাসদ নেতারা রাজনৈতিক বিরোধ বলতে না চাইলেও আওয়ামী লীগের দাবি, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। দু’দলের নেতাকর্মীরা জানান, দীর্ঘ ১৫ বছরেও ভেড়ামারায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাসদের বনিবনা হয়নি। এখানে জোটগত কোনো কর্মসূচি হয় না। দু’দলের শীর্ষ নেতারাও পরস্পর থেকে দূরে থাকেন। এরই জেরে বারবার সংঘাত হচ্ছে।
জেলা জাসদ নেতা কারশেদ আলম বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরা ফায়দা লুটতে অপতৎরতা চালাচ্ছে। এরই জেরে বারবার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।’ বিএনপি-জামায়াত জাসদের ঘাড়ে ভর করেছে কিনা– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাদের সক্রিয় কোনো নেতাকর্মী আমাদের সঙ্গে আছেন, এটি কেউই বলতে পারবে না। তবে মহাজোটের দূরত্ব না ঘুচলে আগামী নির্বাচনে প্রভাব পড়বে। বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই দ্বন্দ্ব নিরসনে উদ্যোগ নিতে হবে।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলীও সাম্প্রতিক সংঘাতের দায় অনুপ্রবেশকারীদের ওপর চাপান। তিনি বলেন, ‘জাসদকে হত্যার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জ্বালাও-পোড়াওর মতো রাজনীতি আওয়ামী লীগের প্রকৃত কর্মীরা করতে পারে না। এসব চলতে থাকলে অনুপ্রবেশকারীরা সুযোগ নিয়ে আরও বড় অঘটন ঘটাতে পারে।’
এদিকে, ঘটনার পর আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল-আলম হানিফ গতকাল সঞ্জয়ের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। এ সময় তিনি নেতাকর্মীকে আইন হাতে তুলে না নিতে আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হত্যার সঙ্গে জড়িত ও নেপথ্য নায়কদের সামনে এনে বিচার করার আশ্বাস দেন হানিফ।
গতকাল স্থানীয় শ্মশানে সঞ্জয়ের সৎকার করা হয়। এ সময় পরিবারের সদস্য ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। হত্যার ঘটনায় স্ত্রী থানায় মামলা করেছেন। এখন পর্যন্ত যুবজোট নেতা শোভন, ইয়ামিন খান, নুর ইসলামের ছেলে তামিম খানসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভেড়ামারা থানার ওসি জহুরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত। পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
