ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৩০ আসন নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে গেল এনসিপি

৩০ আসন নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে গেল এনসিপি
×

সংবাদ সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান। পাশে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (ছবি-সমকাল)

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৪ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৫

জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতাদের একাংশের আপত্তির মুখেই পাঁচ দিন আলোচনার পর রোববার জোটে যোগদানের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিএনপির জোট থেকে বেরিয়ে আসা এলডিপিও নতুন জোটটিতে যোগ দিয়েছে। এর ফলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটটিতে দলের সংখ্যা বেড়ে হলো ১০। 

জোটের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এরই মধ্যে জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টনও হয়েছে। এনসিপি ৩০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শর্ত মেনে নিয়েছে। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনকে ৩১ আসন এবং মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৩ আসন দেওয়া হয়েছে। তবে দল দুটি এতে সন্তুষ্ট নয়। তারা আরও বেশি সংখ্যক আসনে প্রার্থী দেবে। 

সূত্র আরও জানায়, আসন সমঝোতা না হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়নি এবি পার্টি। দলটিকে তিনটি আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত। তবে এবি অন্তত ১০টি আসন চায়। আসন না পেয়ে বিএনপি ছেড়ে আসা লেবার পার্টিসহ কয়েকটি দলকে জামায়াতও আসন দেয়নি।

এনসিপির নেতাদের মধ্যে নাহিদ ইসলামকে ঢাকা-১১, আখতার হোসেনকে রংপুর-৪, সারজিস আলমকে পঞ্চগড়-১, হাসনাত আবদুল্লাহকে কুমিল্লা-৪, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা-৮, আরিফুল ইসলাম আদীবকে ঢাকা-১৮ আসন ছেড়ে দিয়েছে জামায়াত।

এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে যোগ দেওয়ায় গতকাল দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন পদত্যাগ করেন। এর আগের দিন দল ছাড়েন ডা. তাসনিম জারা। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিনসহ আরও কয়েক নেতা ক্ষোভ জানিয়েছেন প্রকাশ্যে। তারাও পদত্যাগ করতে পারেন।  গতকাল বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, এনসিপি এবং এলডিপিও যোগ হয়েছে তাদের নির্বাচনী সমঝোতার উদ্যোগে। এ সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। 

রাতে রাজধানীর বাংলামটরে সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানান, জামায়াত ও সমমনা দলগুলোর নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে। যেসব আসনে শাপলা কলির প্রার্থী থাকবেন না, সেখানে এনসিপি সমমনা দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবে। 

এনসিপির সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধী সামান্থা শারমিন এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য নাহিদ সারোয়ার নিভা ছিলেন না। জামায়াত এবং এনসিপি দুদলই পৃথক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, আদর্শিক নয়, নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে। জুলাই সনদের বাস্তবায়নে গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ ভোট, সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে এই সমঝোতা হয়েছে। 

জামায়াতের পুরোনো মিত্রদের জোট ভাঙার হুঁশিয়ারি
এনসিপি ৩০ আসনে মানলেও, জামায়াতের পুরোনো মিত্র ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি অসন্তুষ্ট। এই পাঁচ দল মিলেই গত মে মাসে মোর্চা তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে এতে যোগ দেয় জামায়াত। পরে যুক্ত হয় জাগপা এবং বিডিপি।

চরমোনাই পীর ১৫০ আসন চেয়েছিলেন। দলটির পরবর্তী প্রস্তাব ছিল, জামায়াত ১৫০ এবং বাকি দলগুলো ১৫০ আসনে নির্বাচন করবে। গত শনিবার পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন ৭৫ আসনে ছাড়ের দাবি জানায়। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত হাতপাখার প্রার্থীদের জন্য ৩১ আসন ছাড়ে জামায়াত। 

মামুনুল হকের খেলাফত মজলিস ৫০ আসন চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দলটিকে ১৩ আসন নিশ্চিত করেছে জামায়াত। খেলাফতের অপর অংশ ৩০ আসন চাইলেও ছাড় দিয়েছে পাঁচটিতে। নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলনকে দুটি করে আসন ছেড়েছে। জাগপা এবং বিডিপিকে একটি করে আসন ছাড়ে জামায়াত। 

প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের পর পুরানা পল্টনে চরোমানাই এবং মামুনুল হকের দলের নেতারা বৈঠক করেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, ছাড়ের বাইরে আসনেও আজ সোমবার শেষ দিনে মনোনয়নপত্র জমা দেবেন দল দুটির নেতারা। ইসলামী আন্দোলন শতাধিক এবং খেলাফত অর্ধশত আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আগামী ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে। এই দুই দলের নেতারা বলছেন, জামায়াত নিজে ৩০০ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিচ্ছে। তাই তারাও বাড়তি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। প্রত্যাহারের সময়সীমার মধ্যে এসব আসনে সমঝোতার চেষ্টা করা হবে। সমঝোতা না হলে জোট টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেছেন, ১৩ নয় আরও বেশি সংখ্যক আসনে রিকশা প্রতীকের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেবেন।

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে বলেন, কিছু আসনে সমঝোতা বাকি রয়েছে। রোববারের রাতে মধ্যে তা হয়ে যাবে। তা সম্ভব না হলে, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আগে সব ঠিক হয়ে যাবে। ৩০০ আসনে জোটের একক প্রার্থী থাকবে। কারও ক্ষোভ-অসন্তোষ নেই। 

দুই সাবেক উপদেষ্টা নিয়ে এনসিপির চেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জোটের প্রার্থী করা হবে না, তা গত বৃহস্পতিবারই জানিয়ে দেয় জামায়াত। তবে এনসিপির দাবির মুখে জামায়াতের প্রতিনিধিরা আসিফকে বিবেচনার আশ্বাস দিলেও দলটি শীর্ষ পর্যায় থেকে গতকাল জানিয়ে দেওয়া হয় দুই সাবেক উপদেষ্টার কাউকে জোটের প্রার্থী করা হবে না। 

মাহফুজ আলম গতকাল ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানান, তিনি এনসিপিতে যুক্ত হচ্ছেন না। জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে নির্বাচন করতে প্রস্তাব দেওয়া হয়নি জানিয়ে মাহফুজ লেখেন, ঢাকার কোনো একটা আসনে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থী হওয়ার চেয়ে, দীর্ঘদিনের অবস্থান ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। 
প্রার্থী হতে ঢাকা-১০ আসনে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন আসিফ। গতকাল জামায়াতের এক জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে জানান, পদে থাকাকালে আসিফকে নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়। তাই জামায়াত তাঁকে প্রার্থী করে বিতর্ক ও বিরোধের দায় নিতে চায় না। 
তবে এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, রোববার রাতেও দেনদরবার চলেছে আসিফকে প্রার্থী করতে। আসিফ আজ মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। এনসিপির প্রার্থী হবেন নাকি স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন, তা নির্ভর করছে আলোচনার ওপর। 

অপেক্ষায় এবি পার্টি
এনসিপির গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের শরিক এবি পার্টি গত বুধবার থেকে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলাপে যোগ দেয়। দলটিকে তিনটি আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত। তবে এবি পার্টি চেয়েছে ১০টি আসন। এ কারণে গতকাল প্রেস ক্লাবে জামায়াত আমিরসহ ৯ দলের নেতাদের সংবাদ সম্মেলনে যায়নি এবি। 

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আলোচনা চলমান রয়েছে। এবি পার্টির প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। যদি প্রত্যাহারের আগে সমঝোতা হয়, তবে এবি পার্টিও যুক্ত হবে। তবে এর জন্য ন্যূনতম ঐকমত্যের কর্মসূচি প্রয়োজন হবে।

যা বললেন জামায়াত আমির
প্রেস ক্লাবে শফিকুর রহমান বলেন, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি আট দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এনসিপি, এলডিপিসহ ১০ দলে মজবুত নির্বাচনী সমঝোতায় এক হয়েছে। দুটি দল একেবারে শেষ পর্যায়ে এসেছে। আরও অনেক দল আসন সমঝোতায় আগ্রহী ছিল। তবে এ মুহূর্তে এই প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পৃক্ত করা দুরূহ হয়ে গেছে। অনেকের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাদের সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে না। 

কোন দল কত আসনে প্রার্থী দেবে তা প্রকাশ না করে জামায়াতের আমির বলেন, কাজ প্রায় চূড়ান্ত। বাকি কাজ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর ইনশাআল্লাহ আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সুন্দরভাবেই সমাধান করতে পারব। কোনো সমস্যা হবে না। 

তিনি বলেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে দলগুলো অঙ্গীকারবদ্ধ। দলগুলো চায়, নির্ধারিত তারিখেই নির্বাচন হোক। নির্বাচন কমিশনকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। এখনও সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ হয়নি। আগামী নির্বাচনে কেউ ভোটের অধিকার হরণ করতে চাইলে সেটি বরদাশত করা হবে না। ১০ দলের জোট দেশ গঠনের। 

নাহিদ বললেন সমঝোতার কারণ
বাংলামটরে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, প্রাথমিকভাবে এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শরিফ ওসমান হাদির শাহাদাতের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সমঝোতা করতে হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারছি যে, বাংলাদেশে আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী শক্তি এখনও কার্যকর রয়েছে। তারা জুলাই প্রজন্মকে নিঃশেষ করার চক্রান্ত করছে। 

তিনি আরও উল্লেখ করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সমুন্নত রাখতে এবং আধিপত্যবাদী শক্তির অগ্রযাত্রা রুখতে এই মুহূর্তে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন। তাই জামায়াত ও সমমনা দলের সঙ্গে একত্রে নির্বাচন করব। এই জোটকে কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার মাধ্যম নয়, সংস্কার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্ল্যাটফর্ম আখ্যা দিয়ে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, দুর্নীতিবিরোধী লড়াই, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে আমাদের ন্যূনতম কর্মসূচি থাকবে। জুলাই প্রজন্মকে রক্ষা করতে এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আকাঙ্ক্ষা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্যই ঐক্যের জায়গায় পৌঁছেছি।

জোটের বিরোধিতায় এনসিপি নেতাদের পদত্যাগ এবং চিঠির বিষয়ে তিনি বলেন, যে কোনো সিদ্ধান্তে দ্বিমত বা বিরোধিতা থাকতে পারে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কেউ যদি ব্যক্তিগত কারণে দল ত্যাগ করেন, তা তার একান্ত সিদ্ধান্ত।

জামায়াতের মতো ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে আদর্শিক পার্থক্যের বিষয়ে নাহিদ বলেন, নির্বাচনী সমঝোতা– সামগ্রিক আদর্শিক ঐক্য নেই। এনসিপি তার নিজস্ব লক্ষ্য ও আদর্শ অনুযায়ী কাজ করবে। সংস্কার, ন্যায়বিচার এবং আধিপত্যবাদ বিরোধিতায় ন্যূনতম কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এনসিপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবে। 

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। 


 

আরও পড়ুন

×