জামায়াতের সহযোগিতা না পেয়ে নাখোশ শরিকরা
ফাইল ছবি
রাজীব আহাম্মদ
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৫:৪০ | আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:৫৫
ভোটের মাঠে জামায়াতে ইসলামীর ‘পূর্ণ সমর্থন’ না পেয়ে নাখোশ ১১ দলের শরিকরা। এ দলগুলোর মধ্যে অভিযোগ, ছেড়ে দেওয়া চারটি আসনে জামায়াত প্রার্থীরা থেকে যাওয়ায় শরিকরা নির্বাচন থেকে প্রায় ছিটকে গেছেন। ‘আর্থিক সহযোগিতা’ না পাওয়ায় এনসিপির অধিকাংশ প্রার্থী ভোটের মাঠে হাবুডুবু খাচ্ছেন। আবার আসন ছাড়লেও প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের তুলনায় জামায়াত নেতাকর্মীরা না নামায় শরিকদের প্রার্থীরা প্রচারে পিছিয়ে রয়েছেন।
এ দলগুলোর ভাষ্য, জোট গঠনের সময় জামায়াত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, শরিকদের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর সমান সহযোগিতা দেওয়া হবে। এই শর্তে জোট হলেও মাঠে তা পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও জামায়াত এই অভিযোগ নাকচ করেছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আবদুল হালিম সমকালকে বলেছেন, শরিকদের সাধ্য অনুযায়ী সহায়তা করা হচ্ছে। নেতাকর্মীরা শরিক প্রার্থীদের পক্ষে রয়েছেন।
তবে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য সমকালকে বলেছেন, মূল অভিযোগ আর্থিক সহযোগিতা না করা। অন্য দলের প্রার্থীরা টাকা চেয়ে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু জামায়াতকে দলীয় প্রার্থীদের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই চাইলেও সহযোগিতা করা যাচ্ছে না।
টাকার সংকটে এনসিপি
এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একাধিক সদস্য সমকালকে বলেছেন, গুজব রটেছে, জামায়াত প্রতি আসনে দেড় কোটি টাকা করে দিচ্ছে শাপলা কলির প্রার্থীদের। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এনসিপির কাউকে এক টাকাও দেওয়া হয়নি। কারও অনুদান চাইলে বলা হচ্ছে, জামায়াত টাকা দিয়েছে আর কেন সহায়তা দরকার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এ পরিস্থিতিতে অন্তত ১৮টি আসনের প্রার্থীরা ঠিকমতো প্রচার চালাতে পারছেন না। নির্বাচনী প্রচারসামগ্রী দিতে পারছেন না।
এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরা জানান, কয়েক দিন পরপর দলীয় প্রার্থীদের এক-দুই লাখ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। এটা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। আবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা মাঠে দিনে ১০ লাখ টাকা খরচ করছে। ফলে ভোটের মাঠে টেকা যাচ্ছে না।
এনসিপির একজন প্রার্থী সমকালকে জানান, ১৩০টি নির্বাচনী কার্যালয় করার সুযোগ রয়েছে তাঁর আসনে। কিন্তু ৩০-৩২টি করতে পেরেছেন। টাকার অভাবে বাকি ওয়ার্ডগুলোতে কার্যালয় নেই। যেসব কার্যালয় করা হয়েছে, সেগুলোতে দিনে এক হাজার টাকা করে দিচ্ছেন। যা সামান্য। বিপরীতে বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর কার্যালয়গুলোতে দিনে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন। জামায়াত নিজ খরচে নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ এবং কর্মী দিয়ে সহায়তা দিলেও আর্থিক সহযোগিতা করছে না। তারাও বলছে, টাকা নেই।
এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারিমন সমকালকে বলেছেন, নতুন এবং তরুণদের দল হিসেবে আর্থিক টানাপোড়েন তো সব সময়ই রয়েছে। এনসিপির দু-একজন বাদে কারও পক্ষে নিজ খরচে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। আবার দলীয়ভাবেও সম্ভব নয়। তারপও যতটুকু সম্ভব দল এবং প্রার্থীরা খরচ জোগাচ্ছে।
জামায়াতকর্মীরা নেই শরিকের পাশে
এনসিপিকে ৩০ আসন ছেড়েছে জামায়াত। তবে নরসিংদী-২ এবং চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি জামায়াতের প্রার্থীরা। যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে আশ্বস্ত করে এ আসনগুলো থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক প্রত্যাহারে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল জামায়াত। তাতে অবশ্য কাজ হয়নি। এনসিপির ৩০ আসনের ১২টিতে কোনো না কোনো শরিকের প্রার্থী রয়েছেন। মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী রয়েছেন ছয়টি আসনে। এসব আসনে একাধিক শরিক দলের প্রার্থী থাকায় জামায়াত কোনো দলের পক্ষে পুরোপুরি নামছে না। তবে জামায়াতের আবদুল হালিম সমকালকে বলেছেন, আজ রোববারের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
এনসিপির মনিরা শারিমন সমকালকে বলেছেন, শুরুতে এই সমস্যা বেশি ছিল। আস্তে আস্তে তা কাটছে। এখন পর্যন্ত দুটি বাদে ২৮ আসনে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এনসিপির প্রচারে নেমেছেন। নরসিংদী-২ এবং চট্টগ্রাম-৮ আসনে কিছু সমস্যা রয়েছে। এগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটি। আশা করি, শিগগির ঠিক হবে।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের নেতৃত্বাধীন এলডিপিকে একটি উন্মুক্তসহ সাতটি আসন ছেড়েছিল জামায়াত। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ময়মনসিংহ-১০ আসন উন্মুক্ত থাকবে। সেখানে জামায়াত এবং এলডিপি যে যার মতো নির্বাচন করবে। বাকি ছয়টি আসনে এলডিপিকে পূর্ণ সমর্থন দেবে জামায়াত।
তবে ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে এলডিপিকে ছেড়ে দেওয়া ভোলা-২ এবং চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি জামায়াতের প্রার্থীরা। এসব আসনে জামায়াত নামেনি এলডিপির পক্ষে। বরং দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।
এলডিপির মোকফার উদ্দিনকে ছেড়ে দেওয়া ভোলা-২ আসনে জামায়াতের মোহাম্মদ ফজলুল করিমও রয়ে গেছেন। জেলা এলডিপি দলের প্রার্থীর পরিবর্তে জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে। ফলে দাঁড়িপাল্লা নির্বাচন করছে জোট শরিককে ছেড়ে দেওয়া আসনে।
চট্টগ্রাম-১২ আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের মনোনয়ন পেয়েছিলেন এলডিপির এম এয়াকুব আলী। ২৪ জানুয়ারি জামায়াতের মোহাম্মদ ফরিদুল আলম তাঁকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ান। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা এলডিপির পক্ষে নামেননি। এ পরিস্থিতিতে ২৯ জানুয়ারি ফরিদুল আলমকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন এয়াকুব আলী। ফলে জামায়াতই নির্বাচন করছে এই আসন থেকে।
শরিক দল নেজামে ইসলামের মুজাম্মিল হক তালুকদারের ছেড়ে দেওয়া সুনামগঞ্জ-১ আসনে জামায়াতের তোফায়েল আহমেদ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। পরে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও গত বুধবার জানান, নির্বাচনে আছেন। জামায়াতের সবাই তাঁর পক্ষে প্রচার করছেন।
খেলাফত মজলিসের আহমদ বিলালকে ছেড়ে দেওয়া মৌলভীবাজার-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী আবদুল মান্নান মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। তাঁর সমর্থকরা জোট শরিকের পাশে না থেকে দাঁড়িপাল্লার প্রচার চালাচ্ছেন। একই অবস্থা চট্টগ্রাম-৮ আসনে। প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করা জামায়াতের আবু নাছের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও তাঁর সমর্থকরা এনসিপির জুবাইরুল হাসান আরিফের নির্বাচনী প্রচারে নেই। তারা দাঁড়িপাল্লার প্রচার করছেন।
জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা এনসিপিকে পূর্ণ সহায়তা করছেন না নরসিংদী-২ আসনেও। তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো আমজাদ হোসেনের দাঁড়িপাল্লার প্রচার করছেন। জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার চিঠি দিলেও কাজ হয়নি।
দলের প্রার্থীদের প্রচারে জামায়াত আমির
জোট শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জনসভায় না করায় অসন্তোষ রয়েছে ১১ দলে। জামায়াত আমির ঢাকা-৫, ৬, ৭ ও ১০ আসনে জনসভা করলেও, এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া ৮, ১১, ১৮, ১৯ ও ২০ আসনে যাননি। যাননি বাংলাদেশ খেলাফতকে ছেড়ে দেওয়া ঢাকা-১৩ আসনে।
ঢাকা-৬ আসনের জনসভায় ঢাকা-৮ আসনের এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ডেকে নিয়ে শাপলা কলি তুলে দেন জামায়াত আমির। গত শুক্রবার ঢাকা-২ আসনে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে জনসভা করেন তিনি। সেখানে ঢাকা-১৯ এবং ঢাকা-২০ আসনের এনসিপির প্রার্থীদের ডেকে আনা হয়।
শরিক দলগুলোর মধ্যে শুধু এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া পঞ্চগড়-১ আসনে সারজিস আলমের জন্য প্রচার করেন জামায়াত আমির। সেখানে বড় জনসভা করেন। শরিক দলগুলো বলছে, জামায়াত আমির ঢাকার বাইরে লাখো মানুষের জনসভা করছেন। শরিক দলগুলোর আসনে একই রকম সমাবেশ করলে এলাকায় শক্ত বার্তা দেওয়া যেত। জামায়াত আমির না গেলে, জামায়াত জোট শরিকদের জনসভায় বেশি লোক পাঠায় না। ফলে আকর্ষণ তৈরি হয় না। জামায়াত আমিরকে পেতে দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কাছে শরিক দলের অন্তত ১০ প্রার্থী অনুরোধ করলেও জনসভার সময় পাওয়া যায়নি।
