ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

জামানত হারিয়েছেন ৬৫ শতাংশ প্রার্থী

৩০টি দলের প্রার্থী সবাই জামানত হারান

জামানত হারিয়েছেন ৬৫ শতাংশ প্রার্থী
×

ফাইল ছবি

অমরেশ রায়

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ১৯:৩১

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানত হারিয়েছেন ১ হাজার ৩৪৭ জন প্রার্থী, যা মোট প্রার্থীর ৬৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। জামানত হারানো প্রার্থীদের জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা হিসাবে ৬ কোটি সাড়ে ৭৩ লাখ টাকা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হবে।  

নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রকাশিত চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। আইন অনুযায়ী, ইসি জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা দেয়।

ইসির গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, কোনো আসনে প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগের কম ভোট পেলে ওই প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। শতাংশ হিসাবে কোনো প্রার্থী প্রদত্ত ভোটের সাড়ে ১২ শতাংশের কম পেলে জামানত হারান।     

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোট গ্রহণ করা হয়। ইসিতে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি এ নির্বাচনে অংশ নেয়। ২৯৯ আসনে প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৪ জন। 

ভোট গ্রহণের পরদিন ২৯৭টি আসনের ভোটের সরকারি ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে ইসি। আর ৪ মার্চ ইসির ওয়েবসাইটে কেন্দ্রভিত্তিক বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। তবে ২৯৯টি আসনে ভোট হলেও আদালতের নির্দেশনার কারণে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল ঘোষণা স্থগিত রাখে ইসি। এ দুই আসনে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হন। 

কোন দল থেকে কত আয়
ক্ষমতায় আসা বিএনপির ২৯০ জন প্রার্থীর সবারই জামানত টিকে গেছে। তবে বিএনপি জোটের অন্য শরিক দলের প্রার্থীরা কম-বেশি জামানত হারান। এর মধ্যে নির্বাচনে জিতে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের দলের ৯৪ প্রার্থীর মধ্যে ৯২ জনই জামানত হারান। এ বাবদ সরকারি কোষাগারে গেছে ৪৬ লাখ টাকা। 

একই অবস্থা গণসংহতি আন্দোলনের। দলটির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি মন্ত্রিসভায় যেতে পারলেও তাঁর দলের বাকি ১৬ প্রার্থীই জামানত হারান। ফলে দলটির গচ্চা গেছে আট লাখ টাকা। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হন। পরে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয় তাঁর। তবে এনডিএম থেকে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী হওয়া অন্য আট প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এ বাবদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় ৪ লাখ টাকা।    

বিএনপি জোটের আরেক শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ভোটে হারলেও জামানত রক্ষা করতে পেরেছেন। তবে তাঁর দলের অন্য ছয় প্রার্থীই জামানত খোয়ানোয় দলটির গচ্চা গেছে তিন লাখ টাকা। এই জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ জিতলেও তাঁর দলের অপর প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ৫০ হাজার টাকার জামানত খুইয়েছেন তিনি। 

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর ২২৭ প্রার্থীর মধ্যে ৩ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এ বাবদ দেড় লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়। এই জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ জন প্রার্থীর মধ্যে জামানত হারান ৮ জন। এ বাবদ ৪ লাখ টাকা গচ্চা গেছে দলটির। 

জামায়াত জোটের অন্য শরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩৪ প্রার্থীর ৯ জন, খেলাফত মজলিসের ২০ প্রার্থীর মধ্যে ১৫ জন, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ৩০ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৭ জন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ১৩ প্রার্থীর ৮ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ৭ প্রার্থীর মধ্যে ৭ জন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ৪ প্রার্থীর মধ্যে ২ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এই ৬৮ জন প্রার্থী জামানত হারানোয় সরকারি কোষাগারে জমা হয় ৩৪ লাখ টাকা।  
 
দলগতভাবে সর্বোচ্চ পরিমাণ জামানত হারিয়েছে চরমোনাইর পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এ দলের ২৫৭ প্রার্থীর মধ্যে ২৪৮ জনেরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। ফলে দলটির গচ্চা যায় ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। 

জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ১৯৯ জন প্রার্থীর ১৯০ জন জামানত হারান। তাদের বাজেয়াপ্ত হয় ৯৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ২৫ প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জন জামানত হারান। এ বাবদ ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা কোষাগারে জমা হয়।    

নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৩০টি দলের মনোনীত প্রার্থী সবাই জামানত হারান। দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ৬৩, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ৪২, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৩৬, বাসদের (মার্কসবাদী) ৩৩, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) ২৮, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) ২২, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ২০, জনতার দলের ২০, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) ২০, গণফোরামের ২০, বাংলাদেশ কংগ্রেসের ১৯, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) ১৮, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ১৭, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ১৭, বাংলাদেশ জাসদের ১৫, আমজনতার দলের ১৫, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) ১৪, জাতীয় পার্টির (জেপি) ১০, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) ৮, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির (বিএমজেপি) ৮, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির ৬, জাকের পার্টির ৫, গণফ্রন্টের ৫, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের (বিএমএল) ৩, ইসলামী ঐক্যজোটের ২, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির ২, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ১, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টির (বিইপি) ১, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (বাংলাদেশ ন্যাপ) ১ এবং গণতন্ত্রী পার্টির ১ জন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। জামানত হারানো এই ৪৮২ প্রার্থীর কাছ থেকে আয় হয়েছে ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। 

এ ছাড়া ২৭৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ২১৭ জনের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। এখান থেকে ইসি পেয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

জেলাওয়ারি জামানত বাজেয়াপ্তের পরিসংখ্যান
ইসির বিস্তারিত ফলাফল বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে ঢাকা জেলার ২০টি আসনে। এখানে ১৫৭ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। আর সবচেয়ে কম জামানত বাজেয়াপ্ত চুয়াডাঙ্গা ও বান্দরবান জেলায়। দুই জেলার তিনটি আসনে দুজন করে প্রার্থী জামানত হারান। 

এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩৫, কুমিল্লায় ৫৯, চাঁদপুরে ২৫, ফেনীতে ২০, নোয়াখালীতে ৩৫, লক্ষ্মীপুরে ২০, মেহেরপুরে ৩, কুষ্টিয়ায় ১৭, ঝিনাইদহে ১২, যশোরে ২৪, মাগুরায় ৭, নড়াইলে ১১, বাগেরহাটে ১৪, খুলনায় ২৬, সাতক্ষীরায় ১১, চট্টগ্রামে ৭৭, কক্সবাজারে ১০, খাগড়াছড়িতে ৭, রাঙামাটিতে ৬, বান্দরবানে ২, পঞ্চগড়ে ১১, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৪, দিনাজপুরে ২৭, নীলফামারীতে ১৮, লালমনিরহাটে ১৬, রংপুরে ৩১, কুড়িগ্রামে ১৮, গাইবান্ধায় ২৮, বরগুনায় ১১, পটুয়াখালীতে ২০, ভোলায় ২১, বরিশালে ২১, ঝালকাঠিতে ১৪, পিরোজপুরে ৮, টাঙ্গাইলে ২৭, জামালপুরে ২৪, শেরপুরে ৫, ময়মনসিংহে ৩৭, নেত্রকোনায় ১৩, কিশোরগঞ্জে ৩৪, রাজবাড়ীতে ৮, ফরিদপুরে ১৯, গোপালগঞ্জে ২০, মাদারীপুরে ১৭, শরীয়তপুরে ১৫, মানিকগঞ্জে ১৩, মুন্সীগঞ্জে ১২, গাজীপুরে ৩২, নরসিংদীতে ২৯, নারায়ণগঞ্জে ৩৬, জয়পুরহাটে ৪, বগুড়ায় ২০, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০, নওগাঁয় ২০, রাজশাহীতে ২০, নাটোরে ১৮, সিরাজগঞ্জে ২৭, পাবনায় ১৮, সুনামগঞ্জে ১২, সিলেটে ২০, মৌলভীবাজারে ১৪, হবিগঞ্জে ১৬ এবং ভোলায় ২১ প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×