নির্বাচনে অংশ নিতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ চায় বাম দলগুলো
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২১ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে চায় বাম ও প্রগতিশীল দলগুলো। সে জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, অর্থাৎ ভোটের অনুকূল পরিবেশ চায় তারা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য পরিবেশসহ বাস্তব পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় নিতে চায় দলগুলো।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) এরই মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। পাঁচ ধাপে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি, শেষ ধাপ হবে ২৭ মে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে ইসি। পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকারের অন্য চার প্রতিষ্ঠান– উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। নতুন আইন অনুযায়ী, এবার স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ের নির্বাচন নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে।
এই অবস্থায় ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জোট, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধীদলীয় জোট এবং অন্যান্য দলও কমবেশি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। সরকারি জোটের শরিক হিসেবে রয়েছে চার-পাঁচটি বাম ও প্রগতিশীল দল। তবে সরকারি ও বিরোধীদলীয় জোটের শীর্ষ দলগুলো আলাদাভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্তের কথা জানালেও বাম ও প্রগতিশীল দলগুলো এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
অন্যদিকে, সরকারি ও বিরোধী জোটের বাইরে থাকা বাম ও প্রগতিশীল দলগুলো নিজেদের মতো করে মাঠ গুছিয়ে ভোটে নামার কথা জানিয়েছে। যদিও স্থানীয়ভাবে মাঠের রাজনীতিতে সাংগঠনিক সামর্থ্য ও জনসমর্থন যাচাইয়ের লক্ষ্যকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণ বলে জানিয়েছে তারা। স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকে তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে দলগুলো। তবে সবার আগে ভোটে অংশগ্রহণের মতো পরিবেশ এবং সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে তারা।
এ ছাড়া বাম দলগুলোর প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় সংগঠনের ওপর নির্ভর করার পক্ষে মত দিচ্ছেন। বিশেষ করে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে বাম দলগুলোর দীর্ঘদিনের কৃষক, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ভোটে রূপান্তর করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণে সরকার ও বিরোধীদলীয় জোটের বাইরে থাকা বাম ও প্রগতিশীল দলগুলো একাধিক জোটে বিভক্ত হয়ে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে বামপন্থিদের বড় জোটটি হচ্ছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৯টি বাম ও প্রগতিশীল দল মিলে এই জোট গঠিত হয়। পরে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে দেড় শতাধিক আসনে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেয় তারা। যদিও ভোটের মাঠে তাদের সমর্থন আসে ১ শতাংশেরও কম। এক-দুটি বাদে সব আসনেই যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টভুক্ত দলগুলো এবং ছোট কয়েকটি বামপন্থি দলগুলোকে নিয়ে গঠিত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট নামে আরেকটি মোর্চা। যদিও এই জোট নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের মোর্চা। এ ছাড়া আরও পাঁচটি ক্ষুদ্র বামপন্থি দল নিয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য নামে আরেকটি জোট সক্রিয় রয়েছে। ছোটখাটো বামপন্থি আরও কিছু দল আলাদাভাবে থাকলেও, তারাও রাজনীতির মাঠে নামসর্বস্ব দল হিসেবে বিবেচিত হয়।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি জোটটি। এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনাও শুরু করেনি তারা। তবে নির্বাচনে গেলে জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারও জোটগতভাবেই অংশগ্রহণের চিন্তাভাবনা রয়েছে শরিক দলগুলোর। শরিক যে দলের সাংগঠনিক বা প্রার্থীর অবস্থান ভালো, সেখানে ওই দল বা প্রার্থীর পক্ষে জোটের সমর্থন থাকবে বলেও জানিয়েছেন নেতারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও বাম দলগুলো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেখছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে সরাসরি অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে চায় দলগুলো। নির্বাচনের মাঠ যদি সবার জন্য সমান থাকে এবং অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়, তা হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে বামপন্থিরা।
বাম দলগুলোর নেতারা বলছেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে আমরা একমত। তবে নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সবার জন্য সমান রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সুযোগ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হবে।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন সমকালকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আমরা জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখি। তবে শুধু তপশিল ঘোষণা করলেই হবে না, নির্বাচনের মাঠে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হলে এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে, আমরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব।’
এই জোটের অন্যতম প্রধান শরিক বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘আমরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে, কিন্তু তার জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকতে হবে। ভোটাররা যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, প্রার্থী যেন ভয়ভীতি ছাড়া প্রচার করতে পারেন এবং প্রশাসন যেন কারও পক্ষে না দাঁড়ায়– এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে বাম দলগুলো নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, ‘আমরা নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে চাই না। কিন্তু নির্বাচন যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করা হয়, তাহলে অংশগ্রহণ করে কোনো লাভও নেই। স্থানীয় নির্বাচনে অর্থবহ, পেশিশক্তি ও প্রশাসনিক প্রভাব যাতে কোনো প্রার্থী ব্যবহার করতে না পারেন, সেটি ইসিকে নিশ্চিত করতে হবে। কমিশন মাঠে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে পারলে বাম দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।’