ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন
ইসির শেষ 'পরীক্ষা' নেবে বিএনপি
লোটন একরাম
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২৯
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত লড়তে চায় বিএনপি।
কোনোভাবেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে 'ওয়াকওভার' দেবে না তারা। পাশাপাশি
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর আস্থা না থাকার পরও শেষ 'পরীক্ষা' নিতে
চায় রাজপথের প্রধান বিরোধী দলটি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কমিশন
ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করে কি-না, তা
দেখতেই ভোটযুদ্ধে অংশ নিয়েছে তারা। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু
নির্বাচন সম্ভব নয় প্রমাণ করতেও নির্বাচনে যাচ্ছেন বলে দাবি করছেন দলটির
শীর্ষ নেতারা। এবারের সিটি নির্বাচনে 'পক্ষপাতমূলক' আচরণ করলে ভবিষ্যতে এ
কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারে দলটি।
দলের নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়, দেশি-বিদেশিদের সামনে আওয়ামী লীগ ও
নির্বাচন কমিশনের 'নিরপেক্ষতার' ধরন আবারও উন্মোচন করতে চায় বিএনপি। সিটি
নির্বাচনে কারচুপি হলে কমিশন 'ঘেরাও' ও 'থুতু' নিক্ষেপের মতো কর্মসূচি
দেওয়ার চিন্তাভাবনাও করছেন তারা।
এ পরিস্থিতিতে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা ইসির সামনে
কঠিন চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। তারা বলছেন, ইসিকে
সবাইকে আশ্বস্ত করতে হবে। আইন প্রয়োগ করতে হবে।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক
এমাজউদ্দীন আহমদ সমকালকে বলেছেন, দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে প্রতিটি
নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া প্রয়োজন। সাংবিধানিক
প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন
নিশ্চিত করা। বিগত নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করে বলা যায়, বর্তমান ইসি তাদের
ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কমিশনের প্রতি সবার
আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইসিকে আরও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায়
গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং কমিশনের প্রতি অনাস্থা আরও বেড়ে যাবে। এবারের
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপিরও উচিত শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকে
কমিশনের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করা।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে
বলেন, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক
দায়িত্ব। কমিশনকে আশ্বস্ত করতে হবে সবাইকে। সবার সঙ্গে সমান আচরণ করতে হবে।
আইন প্রয়োগ করতে হবে। অ্যাকশনে যেতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা সিটি নির্বাচন এবং
কমিশন নিয়ে বিএনপির বক্তব্যকে 'রাজনৈতিক বক্তব্য' আখ্যায়িত করে কিছু বলতে
অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
গত এক দশকে বিএনপি বেশকিছু নির্বাচন বর্জন করেছে আবার কিছু নির্বাচনে অংশ
নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে নির্বাচন নির্দলীয় সরকারের অধীনে না হওয়ায় ২০১৪ সালের
সংসদ নির্বাচন বর্জন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকারের
অধীনে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। কিন্তু ভোট ডাকাতির
অভিযোগ তুলে ফল প্রত্যাখ্যানের পর দলটি বলেছিল, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে
এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এরপর ইসির
প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন
বর্জন করলেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে বিএনপি।
তবে ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবং ইশরাক
হোসেনও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
অবশ্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা না থাকলেও বিএনপি কেন সিটি নির্বাচনে
অংশ নিচ্ছে- এমন প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল
কাদের। একই দিন তারও জবাব দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম
আলমগীর। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগকে সরকারে রেখে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হবে না,
তা প্রমাণের জন্যই তাদের এই অংশগ্রহণ।
বিএনপি সূত্র জানায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও বর্জন নিয়ে দেশে ও বিদেশে
বিএনপির ভুলত্রুটি খোঁজে সবাই। শীর্ষ নেতাদের শুধু দলের বাইরে নয়, দলের
তৃণমূল কর্মীদের নানা তির্যক মন্তব্য শুনতে হয়। অনেকেই প্রশ্ন করেন, আপনারা
নির্বাচনে কেন গেলেন? বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়ায় অনেকেই বলে
থাকেন, বিএনপি ভুল করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়া যে সঠিক, তা
প্রমাণ করার জন্যই তারা ২০১৮ সালে নির্বাচনে যায়। আওয়ামী লীগের অধীনে যে
নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, তা প্রমাণ করার জন্য বিএনপি তখন নির্বাচনে অংশ
নেয়। আজকেও প্রশ্ন এসেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি সিটি করপোরেশনের
নির্বাচনে যাচ্ছেন কেন? এর উত্তরে বলতে হয়, আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু
নির্বাচন হতে পারে না। এটি বারবার প্রমাণ করতেই বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে।
আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন। ২০১৫ সালে ঢাকা সিটির
নির্বাচনে দুপুরে ভোট বর্জন করলেও এবার শেষ পর্যন্ত মাঠে লড়তে চায় বিএনপি।
বিগত নির্বাচনে উত্তর সিটিতে তাবিথ আউয়াল ও দক্ষিণে মির্জা আব্বাস দুপুরেই
ভোট বর্জন করেন। তবে দলীয় সূত্র জানায়, এবার সহজেই মাঠ ছেড়ে দেবে না দলটি।
বিগত নির্বাচনে মাঠ ছেড়ে দেওয়ার পরও বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়েছিলেন বিএনপির
মেয়র প্রার্থীরা। মাঝপথে নির্বাচন বর্জন করায় দলের ভেতর ও বাইরে সমালোচনার
ঝড়ও উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকলে ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখছিলেন
অনেকেই। দলের সিদ্ধান্তকে ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন দলের নেতাকর্মী এবং
রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। অতীতের মতো আর প্রশ্নের মুখে থাকতে চান না বিএনপি
হাইকমান্ড।
এসব নানা হিসাব-নিকাশ কষেই বিএনপি শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকার নীতিগত
সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিশনের কার্যাবলি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বিএনপি।
কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করলে ভবিষ্যতে তাদের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ
না নেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে তারা। সম্প্রতি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী
কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ শনিবার দলের স্থায়ী কমিটির
বৈঠকেও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে ইতোমধ্যে যে ধরপাকড়ও
শুরু হয়েছে- সে সম্পর্কে কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানাবেন তারা। দলের একজন
কাউন্সিলর প্রার্থীকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ক্ষুব্ধ নেতারা। তারা অভিযোগ
করছেন, পুলিশ অন্য প্রার্থীদের পুরোনো মামলাগুলোও সামনে আনতে তৎপর হয়ে
উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা সমকালকে বলেন, কয়েকদিন ধরে
বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থীসহ ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকের
অ্যাকাউন্ট ও ঋণ এবং লিজিং কোম্পানিগুলোতে ঋণ সম্পর্কিত ফাইল খোঁজা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির পক্ষ থেকে মেয়র ও কাউন্সিলর
প্রার্থীদের বিষয়টি জানিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করা হয়েছে। দুদকও পুরোনো ফাইল
ফের নাড়াচাড়া করতে শুরু করেছে। প্যারাডাইস পেপারস মামলায় তাবিথ আউয়ালসহ ১১
ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত ফাইলগুলো সামনে আনতে তৎপর হয়ে উঠেছে। এসব
তৎপরতা থেকে মনে হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত প্রার্থীদের মাঠে থাকতে দেওয়া হবে না।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই তারা চেষ্টা করবেন শেষ দেখে নিতে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগের দিন ২৯ ডিসেম্বর রাতে ভোট কারচুপি করার অভিযোগ
করে আসছে বিএনপি। এবার সিটি নির্বাচনে ইভিএমের (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন)
মাধ্যমে কারচুপির আশঙ্কা করছে দলটি।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ গতকাল সমকালকে আশঙ্কা
প্রকাশ করে বলেন, ইভিএমের ভোটে ঢাকার সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা
কম। কারণ এখন পর্যন্ত এই সরকারের অধীনে আর এই নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায়
কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। অন্যদিকে, ইভিএম সম্পূর্ণভাবে ত্রুটিযুক্ত।
এজন্য তারা সেটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ইভিএমে জনগণের রায় প্রতিফলিত
হবে না। এতে যথেষ্ট সুযোগ থাকবে ভোটের ফলাফলকে ভিন্নমুখী করার।
অবশ্য বিএনপির এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও
সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ের জন্য
আসেনি। তারা 'কারচুপি' প্রমাণ করতে অংশ নিচ্ছে। এ জন্য আগেভাগেই তারা
কারচুপির নানা অভিযোগ তুলছে। ইভিএম নিয়ে কোনো বড় অভিযোগ পাওয়া যায়নি। বরং
যেসব জায়গায় ইভিএমে ভোট হয়েছে, সেখানে বিএনপির প্রার্থীই বেশি বিজয়ী
হয়েছেন।
- বিষয় :
- বিএনপি
