চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচন
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে উত্তাপ
সারোয়ার সুমন
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৫৩ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রায় এক যুগ পর ভোট হচ্ছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজে। শতবর্ষের পুরোনো এই চেম্বারে ভোট হবে ১ নভেম্বর। ভোট ঘিরে ব্যবসায়ীরা আছেন উৎসবমুখর আমেজে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা দুটি প্যানেলে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। এবার দুই প্যানেলের নেতৃত্বে দিচ্ছেন দুই ‘হক’। এদের একজনের নাম আমিরুল হক। অন্যজন এস এম নুরুল হক।
ভোটারদের কাছে টানতে দুই প্যানেলই সামনে এগোচ্ছে কৌশলে। ভোটারের মন জয় করতে কেউ সামনে আনছেন রাজনৈতিক পরিচয়। কেউ তুলে ধরছেন ব্যবসায়িক সুনাম। কেউবা মন কাড়ার চেষ্টা করছেন আচার-ব্যবহার দিয়ে। তবে শেষ হাসি কার– সেই প্রশ্নের উত্তর জানেন কেবল ছয় হাজার ৭৮০ জন ভোটার।
প্রসঙ্গত, চেম্বার নির্বাচনে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ২০১৩ সালে। এর পর সব কমিটি এসেছে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
সভাপতিরা হয়েছেন মন্ত্রী-এমপি : চেম্বারের সভাপতি হন যিনি; পরবর্তী সময়ে এমপিও হন তিনি। এই বিষয়টি অলিখিত হলেও সত্য হয়েছে নানা ঘটনা প্রবাহে। এই চেম্বারের সভাপতি হয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী হয়েছিলেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ। টানা চারবার এমপি হয়েছিলেন এম এ লতিফও। কিন্তু ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জাভেদ পলাতক আছেন লন্ডনে। আর এম এর লতিফ ১৪ মাস ধরে আছেন কারাগারে। এই চেম্বারে নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপি থেকেও হয়েছে মন্ত্রী ও এমপি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মন্ত্রী হওয়ার আগে এখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সরওয়ার জামাল নিজামও একাধিকবার এমপি হয়েছেন চেম্বারের সভাপতি হওয়ার পর। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সামনে আছে একটি জাতীয় নির্বাচন। এবার যিনি সভাপতি হবেন, তিনি আগামী নির্বাচনে এমপি পদে প্রার্থী হবেন কিনা– সেই বিষয়টিও আছে নির্বাচনী আলাপে। প্রার্থীরা সেই দিকে নজর না দিয়ে আপাতত চেম্বারের বৈতরণি পার হতে মরিয়া।
কার প্যানেলে কে আছেন : আমিরুল হকের প্যানেলে থাকা উল্লেখযোগ্য প্রার্থীরা হলেন– রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসাইন চৌধুরী, পিএইচপি মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতার পারভেজ, মেরিডিয়ান ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম কামাল, আটলান্টিক ট্রেডার্সের কর্ণধার শওকত আলী, ওয়াইএনটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তওসিফ আহমেদ, ইস্টার্ন অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।
আমিরুল হকের প্যানেলে আরও রয়েছেন– রাজা করপোরেশনের কামাল মোস্তফা চৌধুরী, ইস্টিডেটর ফ্রেন্ডস সিন্ডিকেটের আমান উল্লা আল ছগির ছুট্ট, চুমকি অ্যাপারেলস লিমিটেডের আবু হায়দার চৌধুরী, নিউ কর্ণফুলী ট্রেডিংয়ের মোহাম্মদ শফিউল আলম, ফালগুনী ট্রেডার্স লিমিটেডের এ এস এম ইসমাইল খান, প্রান্তিক মেরিন সার্ভিসেস লিমিটেডের মো. গোলাম সরওয়ার, টার্নিং পয়েন্টের আসাদ ইফতেখার, জে এস এম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম চৌধুরী, দ্য ফোর হুইলার্সের মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, স্ট্যান্ডার্ড লজিস্টিকস সার্ভিসেসের শহিদুল আলম।
এস এম নুরুল হকের প্যানেলে চট্টগ্রামের পরিচিত ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছেন পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম রেজাউল করিম, শাহ আমানত করপোরেশনের কর্ণধার আহমদুল আলম চৌধুরী রাসেল, ডায়মন্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজুল হক, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহমদ রশিদ প্রমুখ।
এস এম নুরুল হকের প্যানেলে আরও রয়েছেন– এ আর তামু অ্যান্ড সন্সের আহমেদ রশিদ আমু, ই এম মোটরসের এমাদ এরশাদ, সিগনেট প্রেস লিমিটেডের জসিম উদ্দিন চৌধুরী, সিজন্ড সিন্ডিকেটের কাজী ইমরান এফ রহমান, টপ স্টার ফ্যাশন লিমিটেডের মো. আবছার হোসেন, চট্টোলা এফ অ্যান্ড পলি ইন্ডাস্ট্রিজের মো. আরিফ হোসেন, পার্ক ট্রেডিং করপোরেশনের মো. হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী, সিটি কমোডিটিজের মো. রাশেদ আলী, মদিনা গার্মেন্টস লিমিটেডের মো. মুসা।
অভিযোগ পাল্টা অভিযোগে উত্তাপ : চেম্বারের এবারের নির্বাচন বিভিন্ন কারণে আলোচনায় আছে ব্যাপক হারে। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ, রায়-পাল্টা রায়ে শুরু থেকেই অন্যরকম এক উত্তেজনা তৈরি করে এটি। টাউন ও ট্রেড গ্রুপ নিয়ে দুই প্যানেল মুখোমুখি অবস্থানে ছিল শুরু থেকেই। এখনও আছে সেই অবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন প্যানেল এই দুটি গ্রুপকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে তৎপর ছিল প্রথম থেকেই। অন্যদিকে, শিল্পপতি আমিরুল হকের নেতৃত্বাধীন প্যানেল শুরু থেকেই টাউন ও ট্রেড গ্রুপকে ভোটার করার পক্ষে ছিল।
এফবিসিসিআইয়ে অভিযোগ করা পক্ষটির দাবি, নির্বাচনকে বিগত বছরগুলোর মতো প্রভাবিত করতে চায় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। তারাই বিভিন্ন অকার্যকর সংগঠনকে ব্যবহার করে চেম্বারের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছেন। এরকমই দুটি গ্রুপ হচ্ছে টাউন ও ট্রেড গ্রুপ। তবে অপর পক্ষের দাবি, নির্বাচনকে পেছানোর জন্য দুটি শ্রেণির ভোটারদের নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এই দুটি গ্রুপে যারা আছেন তাদের কেউ কেউ ব্যবসা করছেন ৪০ বছর ধরে। প্রতিবছর চেম্বারের সদস্যপদ নবায়নও করেছেন তারা নিয়ম মেনে। তাহলে এখন প্রশ্ন উঠবে কেন?
নুরুল হকের অনুসারী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত ২০ আগস্ট এই দুই শ্রেণির অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোট প্রদানে সুযোগ না দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগে। এর পর চারটি টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও চারটি ট্রেড গ্রুপকে অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। তবে আমিরুল হকের অনুসারীরা পাল্টা যুক্তি দিয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর আরেক চিঠিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করাতে চিঠি ইস্যু করায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে।
নির্বাচনে এসব সংগঠনের ভোটাধিকার স্থগিত করতে পরে এফবিসিসিআইয়ের আর্বিট্রেশনাল ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেছেন প্রার্থী হওয়া এস এম নুরুল হক ও চেম্বার সদস্য আজিজুল হক। চেম্বার নির্বাচনে একটি প্যানেলের নেতা এস এম নুরুল হক বলেন, ‘চেম্বার থেকে তদন্ত করে এই আট সংগঠনকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আবার কিসের ভিত্তিতে তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। এ জন্য পরে আমরা ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেছি। আদালতেও গেছি। শেষ পর্যন্ত রায় আমাদের পক্ষে এসেছে। কিন্তু এটিকে আবার পাল্টানোর চেষ্টা চলছে।’
দ্বিমত পোষণ করে অন্য প্যানেলের নেতা আমিরুল হক বলেন, ‘যুক্তি না থাকলে রায় কখনও পাল্টায় না। যারা রায় দেন, যারা আপিল বোর্ডে থাকেন, তারা যথেষ্ট বিজ্ঞ লোক। টাউন ও ট্রেড গ্রুপে যারা আছেন তাদেরও অনেকে ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ী গ্রুপে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যে যুক্তি দিয়ে তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে– সেটি বিচারক
যৌক্তিক মনে করছেন না বলেই তাদের দৌড়ঝাঁপ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।’
টাউন ও ট্রেড গ্রুপ নিয়ে সর্বশেষ রায় আসে নুরুল হকদের পক্ষে। কিন্তু প্রতিপক্ষরা আবার যুক্তিতর্ক করে আপিলের মাধ্যমে সেই রায় তাদের পক্ষে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। তাই ভোটের আগে এই ইস্যুকে ঘিরে দেখা যেতে পারে আরও নাটকীয়তা। এটি বদলে ফেলতে পারে ভোটারের সংখ্যাও। বাণিজ্য সংগঠনের নির্দেশ অক্ষুণ্ন থাকলে এবারে ছয়টি পদ বাদ দিয়ে চেম্বারের প্রেসিডিয়ামে তিনজন ও পরিচালক পদে ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
কোথায় কত ভোট : এবারের নির্বাচনে ভোটাররা চারটি গ্রুপে ভাগ হয়ে দেবেন তাদের ভোট। চার ক্যাটেগরি মিলেই হবেন ২৪ পরিচালক। আলাদাভাবে সরাসিরি ভোটে নির্বাচিত হবেন সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও সহসভাপতি। আগে ২৪ জন পরিচালকই ঠিক করতেন, কে যাবেন শীর্ষ এই তিনটি পদে। সেদিক থেকে এবারের নির্বাচন অতীতের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় বেশি আকর্ষণীয়। নির্বাচনে ট্রেড গ্রুপে ভোটার আছে ৯ জন। এখান থেকে তিনজন হবেন পরিচালক। আর টাউন অ্যাসোসিয়েশনে ভোটার আছে ১১ জন। সেখান থেকেও তিনজন হবেন পরিচালক। চার হাজার একজন সাধারণ সদস্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করতে পারবেন ১২ জন পরিচালক। আর দুই হাজার ৭৬৪ জন সহযোগী সদস্যের ভোটে নির্বাচিত হবেন ছয়জন পরিচালক।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশেই হবে। ১২ বছর পর এমন একটি পরিবেশ পাচ্ছেন ভোটাররা। তাই ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন তারা।’
ট্রেড গ্রুপ প্রতিনিধি ও টাউন অ্যাসোসিয়েশন প্রতিনিধি নির্বাচন প্রসঙ্গে বোর্ড সদস্য আহমেদ হাছান বলেন, ‘দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যে রায় দেবে আমরা সেটিই মেনে কাজ করব। নিয়মের বাইরে গিয়ে আমাদের কোনোকিছু করা বা কারও আবদার রাখার সুযোগ নেই।’
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম চেম্বার
