ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ক্যামেরায় আলো-অন্ধকারের গল্প

ক্যামেরায় আলো-অন্ধকারের গল্প
×

সৌরভ দাশের আলোকচিত্র দেখছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানসহ অন্যরা- সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারিতে ঢুকতেই যেন শব্দ থেমে যায়। বাইরে শহরের চেনা কোলাহল গাড়ির হর্ন, মানুষের হাঁটার তাড়া– ভেতরে ঢুকে হঠাৎ করেই অন্য এক জগৎ। দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো কথা বলে না, অথচ অনেক কিছু বলে দেয়। এই নীরব কথোপকথনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে আলোকচিত্রী সৌরভ দাশের প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘দৃষ্টিতে সৃষ্টি’।

প্রদর্শনীর ছবিগুলোর দিকে তাকালে প্রথমেই ধরা পড়ে সময়। এখানে সময় থেমে নেই, আবার পুরোপুরি ছুটেও যাচ্ছে না। বরং আলো আর গতির ভেতর দিয়ে সময় নিজেই হয়ে উঠেছে দৃশ্যের প্রধান চরিত্র। কোথাও ব্যস্ত সড়কের পাশে কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে থাকা এক বৃদ্ধ, কোথাও মানুষের চলাচল রূপ নিয়েছে রঙের রেখায়। বাস্তব দৃশ্যগুলো চেনা, কিন্তু উপস্থাপনা অচেনা– এই দ্বৈততার ভেতরেই সৌরভ দাশের কাজ আলাদা হয়ে ওঠে।

এই প্রদর্শনীতে মানুষ ও প্রকৃতি আছে, কিন্তু কোনোটি আলাদা করে সামনে আসে না। বরং দুটোর মাঝখানে যে সম্পর্ক– সেই সম্পর্কই মুখ্য। ‘স্লো শাটার’ ব্যবহার করে সৌরভ দাশ চলমান জীবনের গতি ধরেছেন এমনভাবে, যেখানে মানুষ কখনও স্পষ্ট নয়, কখনও আলো-ছায়ায় ভেঙে যায় অবয়ব। ছবিগুলোতে নেই স্থিরতা; আছে প্রবাহ। আলো এখানে কেবল আলো নয়, কখনও তা হয়ে ওঠে ভাষা, কখনও চরিত্র।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখলে মনে হয়, এগুলো কোনো ঘটনার দলিল নয়, কোনো সংবাদচিত্রও নয়। এগুলো আসলে দেখার অভ্যাসকে প্রশ্ন করে। আমরা যা দেখি, তা কি আসলেই পুরোটা দেখি? নাকি অভ্যাসের কারণে অনেক কিছু চোখ এড়িয়ে যায়? সৌরভ দাশ তাঁর ছবির মাধ্যমে দর্শককে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান কোনো ব্যাখ্যা চাপিয়ে না দিয়ে।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান প্রদর্শনী ঘুরে দেখে বলেন, ‘সৌরভ দাশ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে সংবাদ আলোকচিত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাঁর কাজের ভেতরে শিল্পের গভীর অন্বেষণ রয়েছে।’ তিনি সৌরভের ‘ভাসমান নায়ক’ সিরিজের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে সমাজের এক গভীর বৈপরীত্য ধরা পড়ে– যে মানুষ প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা বহন করে, দিনশেষে তার নিজের ঘুমানোর জায়গা নেই। এই সিরিজের মধ্য দিয়ে সৌরভ মেহনতি মানুষের জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন, যা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের মানবিক দর্শনের ধারাবাহিকতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, ‘ফটোগ্রাফি মানুষের দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দিয়েছে। বাস্তবতার নিখুঁত রূপ ধরতে গিয়েই শিল্পে নতুন ধারার জন্ম হয়েছে।’ তাঁর মতে, সৌরভ দাশের কাজ সেই ধারাবাহিকতারই আধুনিক রূপ, যেখানে বাস্তব দৃশ্যের ভেতরের ভাব ও আলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আলোকচিত্রী ও শিক্ষক শোয়েব ফারুকী স্মরণ করেন সৌরভের শুরুর দিনগুলোর কথা। তিনি বলেন, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সৌরভের চোখে এক ধরনের গভীরতা লক্ষ করা গিয়েছিল, যা তাকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।’
নিজের কাজ সম্পর্কে সৌরভ দাশ বলেন, ‘এই প্রদর্শনী কেবল ছবি দেখার আয়োজন নয়। এটি দেখার অভ্যাসকে নতুন করে ভাবার জায়গা। আলো, সময় আর মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নীরবে কথা বলাই তাঁর ছবির উদ্দেশ্য।’
দুই দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। শিল্পী, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী—সবাই যেন এই নীরব আলোকভাষার সঙ্গে নিজের মতো করে সংযোগ খুঁজে নেন।
 

আরও পড়ুন

×