শহীদ মিনার এলাকায় বসেছে ২০০ বর্গফুট এলইডি টিভি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোরের ফুটবল-আনন্দ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী রাত জেগে দেখেছেন আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দের ম্যাচ সমকাল
মেহেদী হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
নিঝুম রাত। ক্যাম্পাসজুড়ে নীরবতা। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তখন ভিন্ন এক চিত্র। ঘড়ির কাঁটা ভোর ৪টা ছুঁতেই হাজারো শিক্ষার্থীর চোখ আটকে যায় ২০০ বর্গফুট এলইডি পর্দায়। আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ ঘিরে রাতভর জেগে থাকা শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস জমে ওঠে ভোরে।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের জয় নিশ্চিত হয়। তখন পূর্ব আকাশে ফুটতে শুরু করেছে ভোরের আলো। আর শহীদ মিনার চত্বরে একযোগে ধ্বনিত হতে থাকে– ‘মেসি, মেসি’। বিজয়ের আনন্দে নেচে-গেয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন আর্জেন্টাইন সমর্থকরা। রাতভর জেগে থাকা ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়।
বিশ্বকাপের এই ম্যাচ ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিও ছিল ব্যতিক্রম। খেলা ভোরে হওয়ায় অনেকেই পুরো রাত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে কাটিয়েছেন। ছাত্রদের সঙ্গে এই আনন্দ আয়োজনে শামিল ছিলেন ছাত্রীরাও।
অর্থনীতি বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘খেলা তো ভোর ৪টায়, তাই ঘুমানোর প্রশ্নই আসে না। সারারাত বন্ধুদের সঙ্গে হলের সামনে আর জিরো পয়েন্টে আড্ডা দিয়েছি। চবিতে এসে বন্ধুদের সঙ্গে এভাবে রাত জেগে খেলা দেখার আনন্দটাই আলাদা।’
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দে সমতায় ফিরলে মুহূর্তেই নেমে আসে উদ্বেগ। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের জয়সূচক গোলে উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো প্রাঙ্গণ।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন প্রান্তি বলেন, ‘পুরো ম্যাচজুড়ে মনে হচ্ছিল এই বুঝি প্রিয় দল হেরে যাবে। দ্বিতীয়ার্ধে গোল খাওয়ার পর তো দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তবে শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।’
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথমবার বড় পর্দায় বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা জানিয়ে স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী মিফতা জাহান মিম বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই অন্যরকম। সবাই মিলে খেলা উপভোগ করছি। এটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সঙ্গে আর্জেন্টিনার খেলা দেখতাম। এবার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বন্ধুদের সঙ্গে বড় পর্দায় খেলা দেখছি। আয়োজনটা দারুণ হয়েছে।’
এই রাতের আয়োজনকে ঘিরে ছিল শিক্ষার্থীদের নানা গল্পও। আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রাফেজা রওনাফ রিপা বলেন, ‘বাসার গেট রাতেই বন্ধ হয়ে যায়। তাই বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে আড্ডা দিয়েছি। একসঙ্গে খাওয়া, লুডু খেলা, আড্ডার পর প্রিয় দলের জয়– সব মিলিয়ে দারুণ সময় কেটেছে।’
কেপ ভার্দের পক্ষেও ছিল গ্যালারি
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের পাশাপাশি ব্রাজিল সমর্থকরাও হাজির ছিলেন বড় পর্দার সামনে।
তবে তারা কেপ ভার্দের পক্ষেই গলা মিলিয়েছেন। প্রতিপক্ষের প্রতিটি আক্রমণে তাদের উচ্ছ্বাস ম্যাচের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। ম্যাচ শেষে হাস্যরসের ছলে এক ব্রাজিল সমর্থক বলেন, “আজ কেপ ভার্দে পারেনি, সমস্যা নেই। ব্রাজিলের সামনে পড়লে বুঝবেন। কাপ এবার আমাদেরই হবে।”
ভোরের আলোয় বিজয়-উল্লাস
খেলা শেষে ভোরের আলোয় ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় আনন্দ মিছিল, নাচ-গান ও ছবি তোলার ব্যস্ততা। চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “শেষ রাতে খেলা দেখা আর ভোরে বিজয় উদযাপন—সব মিলিয়ে এটি ছিল একেবারেই নতুন ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।”
রাউন্ড অব ৩২ থেকে ফাইনাল পর্যন্ত বড় পর্দায় খেলা
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ মীর হেলাল উদ্দিনের সহযোগিতায় ২০০ বর্গফুটের এলইডি স্ক্রিনে রাউন্ড অব ৩২ থেকে ফাইনাল পর্যন্ত সব ম্যাচ প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে।
ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বড় পর্দায় খেলা দেখার সুযোগ করে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। মীর হেলাল উদ্দিনের আন্তরিক সহযোগিতায় এই আয়োজন সম্ভব হয়েছে। সামনের ম্যাচগুলোতেও এ আয়োজন অব্যাহত থাকবে।”
নিরাপত্তায় ছিল প্রশাসনের কড়া নজর
বৃহৎ এ আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিশেষ ব্যবস্থা। সহকারী প্রক্টর নুরুল হামিদ কানন বলেন, ‘বিশ্বকাপ উপলক্ষে শুরু থেকেই আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। দর্শক বেশি হওয়ায় চারজন সহকারী প্রক্টর, প্রক্টর, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রীদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থাও ছিল। সবার সহযোগিতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজন শেষ হয়েছে।’
- বিষয় :
- শহীদ মিনার