প্রেরণা
জীবন বদলাতে বড় ভূমিকা রাখা উচিত পরিবারের
মোহামেদ সালাহ ছবি : সংগ্রহ
আরমান খান
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মোহামেদ সালাহ। পুরো নাম মোহাম্মদ সালাহ হামেদ মাহরুস ঘালে। ক্লাব ফুটবলের দাপুটে ফুটবলার। মিসর জাতীয় দলের হয়ে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ দাপিয়ে বেড়ানো এই কিংবদন্তি ফুটবলারের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনেছেন আরমান খান
অনেকেই বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকাদের কাতারে রাখেন। আমার লিভারপুলের সাবেক কোচ ইউর্গেন ক্লপের মতে আমি কেবল একজন বড় খেলোয়াড়ই নই; সর্বকালের অন্যতম সেরাদের একজন! অথচ আমি নিজেকে কখনোই এমন কিছু মনে করি না। তবে আমি যদি কিছুটা সফলতা পাই ক্যারিয়ারে তার পুরোটাই কঠোর পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার কারণে।
কঠোর পরিশ্রমে বেড়ে ওঠা
মিসরের ছোট্ট গ্রাম নাগরিগে আমার জন্ম। খুবই সাধারণ এক পরিবারে। সুযোগ-সুবিধাও ছিল সীমিত। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল অদম্য ভালোবাসা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে আমি রাজধানী কায়রোয় অনুশীলনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৯ ঘণ্টা বাসে যাতায়াত করতাম। সকালে স্কুল, তারপর দীর্ঘ ভ্রমণ, রাতে আবার বাড়ি ফেরা–এই কঠিন রুটিনই ছিল আমার প্রতিদিনের জীবন। তবে এত কষ্টের মধ্যেও হাল ছাড়িনি আমি।
হতাশার দিন ও বাবার প্রেরণা
এত পরিশ্রম করে কিছুটা সফলতার মুখ দেখার পরও একসময় ক্লাবে টানা দুই মাস বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল আমাকে। হতাশ হয়ে তখন বাবাকে বলেছিলাম, আমি আর খেলতে চাই না! বাবা তখন বলেছিলেন, যারা বড় হয়, তারা কষ্ট করেই বড় হয়। এখন থেমে গেলে কখনও সফল হতে পারবে না। সেই কথাই বলতে পারেন আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়!
ইউরোপের পথে পা এবং আমার লক্ষ্য
দেশের ক্লাব ফুটবলে পরিচিতি পাওয়ার পর সুযোগ আসে সুইজারল্যান্ডের ক্লাব এফসি বাসেল-এ। ইউরোপে এটিই ছিল আমার প্রথম পদক্ষেপ। আসলে যেদিন মিসর ছাড়লাম, সেদিনই ঠিক করেছিলাম আমাকে বদলাতে হবে। আমি এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যাতে মানুষ আমাকে ভালোবাসে এবং অনুসরণ করে। যদিও ইউরোপের পথ মোটেও সহজ ছিল না। বাসেলের পর ইংল্যান্ডে চেলসিতে যোগ দিলেও সেখানে খুবই কম সুযোগ আসে। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এখানেই শেষ আমার ইউরোপ স্বপ্ন। আমি হার মানিনি। সেখান থেকে প্রথমে ইতালির ক্লাব ফিওরেন্তিনা এবং পরে রোমাতে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলি। ২০১৭ সালে যখন লিভারপুলে ফিরি তখনও অনেকে সন্দিহান
ছিল আমাকে নিয়ে। আমি ঘুরে দাঁড়াই পরিশ্রমে ভর করে।
লিভারপুলে ঘুরে দাঁড়ানো
লিভারপুলে প্রথম মৌসুমে ভালোই গোল পাই। দলও নড়েচড়ে বসে। আমরা একে একে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, লিগ কাপ, সুপার কাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপও জিতে নিই। কেবল ট্রফিই নয়, এই সময় বলতে পারেন আমি মানুষের হৃদয় জয় করতে পেরেছি। অ্যানফিল্ডের বিখ্যাত গ্যালারি ‘দ্য কপ’-এ প্রতিটি ম্যাচে ধ্বনিত হতো একটি গান- ‘মো সালাহ, মো সালাহ, দ্য ইজিপশিয়ান কিং!’ একজন ইজিপশিয়ান হিসেবে এরচেয়ে গর্বের কিছুই হতে পারে না।
আমার বাড়িটা আসলে হাসপাতাল
আমি শুধু ফুটবল নিয়েই ভাবি। প্রতিদিন নিজেকে আরও ভালো করার চেষ্টা করি। এজন্যই নিজের বাড়িতে গড়ে তুলেছি অত্যাধুনিক জিম, রিকভারি সিস্টেম, এমনকি উচ্চপারিবারিক অক্সিজেন চেম্বারও; যা দ্রুত শরীরের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। আমার বাড়িটা আসলে হাসপাতাল। প্রতিদিন দুইবার জিম করি। এরপর নিই আইস বাথ, যাতে শরীরের ব্যথা ও পেশির ক্লান্তি কমে। এছাড়া নিয়মিত যোগব্যায়াম ও পাইলেটস করি, যাতে শরীর নমনীয় থাকে এবং ইনজুরির ঝুঁকি কমে। খাদ্যাভ্যাসেও কঠোর নিয়ম মেনে চলি। আমি বিশ্বাস করি, একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের বড় অংশ নির্ভর করে খাবারের ওপর। আমার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকে ডিম, অ্যাভোকাডো, ব্রকলি, ওটস, মিষ্টি আলু, বাদাম, দুধ এবং বিভিন্ন ফল। চিনি এড়িয়ে চলি এবং সাধারণ রুটির বদলে খাই গ্লুটেন-ফ্রি ব্রাউন ব্রেড। তবে মিসরে ফিরলে প্রিয় খাবার কোশারি খেতে ভুল করি না। শরীরের পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতিতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট মেডিটেশন করি। এতে মন শান্ত থাকে এবং লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া নিয়মিত দাবা খেলি। দাবা আমাকে
দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে এবং মনোযোগ ধরে
রাখতে সাহায্য করে।
পরিচয় ও ভালোবাসা
আমি খোলাখুলিভাবে নিজের মুসলিম পরিচয় প্রকাশ করি। গোল করার পর মাঠে সিজদা দিই। আমার এমন আচরণে ইংল্যান্ডের অনেক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছে। লিভারপুল ভক্তরা একটি গান বানিয়েছে এই নিয়ে। গানটি এমন–‘সে যদি তোমার জন্য যথেষ্ট ভালো হয়, তবে আমার জন্যও ভালো। সে যদি আরও গোল করে, আমিও মুসলিম হয়ে যাব!’ আমি ভক্তদের কাছে কেবল একজন ফুটবলার নই; সংগ্রাম, শৃঙ্খলা আর স্বপ্নপূরণের প্রতীক বলতে পারেন। আর এটিই আমার বড় সাফল্য; যা আমি অর্জন করতে পেরেছি কেবলই কঠোর পরিশ্রম করে।
- বিষয় :
- প্রেরণার কথা