ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন বিষয়ক সমীক্ষা

আসক্তির নাম অনলাইন

আসক্তির নাম অনলাইন
×

অনলাইনে না থাকলে যদি অস্থির লাগে তবে বুঝতে হবে আপনি অনলাইনে আসক্ত -মডেল: রাহিনুর; ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

আশিক মুস্তাফা

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৮ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

পড়ার টেবিল কিংবা খাবার টেবিল, ফুটপাত কিংবা গাড়ি; সবখানেই যেন তরুণরা ডুবে থাকছে অনলাইনে! দিনের বড় একটা অংশ এখানেই কেটে যাচ্ছে তাদের। এতে মানসিক সমস্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ছে অনেকে। এ নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরাও। সম্প্রতি দেড় লাখ শিশু-কিশোরকে নিয়ে ২০টি সমীক্ষা করেছে ব্রিটেনের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়। সেই গবেষণা ও বাস্তবতায় উত্তরণের পথ খুঁজেছেন আশিক মুস্তাফা

সা মাজিক মাধ্যম ছাড়া এখন চলেই না আমাদের। দিনের বড় একটা অংশ এখানেই কেটে যায়। এতে আমাদের মানসিক সমস্যা যেমন বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ছি। উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশের তরুণরাও এ সমস্যার মুখোমুখি। এ নিয়ে চিন্তিত বিশেষজ্ঞরাও। তরুণদের মতো ছোটরাও এই জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সম্প্রতি ১,২৫,০০০ শিশু-কিশোরকে নিয়ে ২০টি সমীক্ষা করে ব্রিটেনের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষণায় যে 
ফল পাওয়া গেছে তা খুবই ভয়াবহ! 

বড় সতর্কবার্তা যাদের জন্য
স্মার্টফোন বা আইপ্যাডে চোখ রেখে যারা বিছানায় যান, যাদের স্মার্টফোন ছাড়া চলেই না, তাদের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন গবেষকরা। ঘুমের আগে পিসি বা ফোনের ডিসপ্লের আলো ঘুমের হরমোনকে ছড়িয়ে দিতে বাধা সৃষ্টি করে। এতে শারীরিক সমস্যা যেমন হয়, তেমনি মানসিক সমস্যাও বাড়তে থাকে। তাই তরুণদের প্রতি এবং তাদের বাবা-মায়ের প্রতি গবেষকদের পরামর্শ, ‘ঘুমের আগে যেন তরুণরা ও বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের প্রযুক্তির সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখেন। কারণ তরুণ ও শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ভালো ঘুমের বিকল্প নেই।’ 

বছরে দুই মাস হাওয়া
দিনে গড়ে চার ঘণ্টা অনলাইনে ব্যয় করা মানে জীবন থেকে বছরে দুটি মাস হারিয়ে যাওয়া। ভেবে দেখেছেন ব্যাপারটা? আর এমন কে আছে, প্রতিদিন অনলাইনে চার-পাঁচ ঘণ্টা ব্যয় করেন না? যারা করেন না, তাদের সংখ্যা সীমিত। এ হিসেবে শুরুটা খুব সাধারণ মনে হলেও বছর শেষে জমা কিন্তু অনেক বেশি। সুতরাং অনলাইন আসক্তি দূর করা আমাদের জন্য অতি প্রয়োজনীয়, যেখানে এর চেয়ে আরও অনেক জরুরি সময় ও কাজ রয়েছে। সেটি কীভাবে? অনলাইনে না থাকলে যে চলে না? ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক, লিংকডইন, এক্স, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়া যে বরিং লাইফ? এসব করতে গিয়ে জীবন থেকে ব্যয় হচ্ছে সময়। 

মনোযোগ খাবারে নয়; অনলাইনে
রাতের খাবারের সময় যারা অনলাইনে পড়ে থাকেন, তাদের নানা সমস্যা হয়। যেমন- অনলাইনে ধ্যান-জ্ঞান থাকায় খাবারে মনোযোগ থাকে না। ফলে খাবার ভালোভাবে খাওয়া হয় না; এতে হজমে সমস্যা হয়। খাবার টেবিলে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। অনলাইনে থাকলে কেউ কাউকে সেভাবে আপন ভেবে মনের কথা, জীবনযাত্রার কথা ভাগাভাগি করতে পারেন না। ফলে মনোমালিন্য আর একঘেয়ে একটা ভাব চলে আসতে পারে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। 

সমাজ থেকে দূরে
অনলাইন আসক্তি চলে এলে সমাজ থেকে প্রতিনিয়ত আপনি দূরে সরে পড়বেন। আপনি অনলাইনে বুঁদ হয়ে আছেন। ওদিকে সমস্যা এসে তার সমাধান নিয়ে কেটে পড়েছে। আপনি নেই সমাজে। বন্ধুদের মাঝে!
 
হায় পাঠ্যাভ্যাস
মুখ তুলে তাকানোর সময় মেলে না আপনার। যেই আপনি বইয়ের মায়ায় পড়ে থাকতেন। একটু সময় পেলেই চোখ ডোবাতেন বইয়ের পাতায় সেই আপনি এখন ক্লাসের বইটিতেও চোখ বোলানোর সময় করতে পারেন না। এভাবে আপনি সরে যাচ্ছেন বইয়ের জগৎ থেকে; যেখানে আপনি লেখকের ভাবনায় চড়ে গড়ে তুলতেন একান্ত একটা জগৎ! 
চলুন, গবেষকদের হাত ধরে সামাজিক মাধ্যম-জ্বর কাটানোর উপায় খুঁজে নিই– 


সমাধান-১
অনলাইনে বসার আগে ঠিক করে নিন, মূলত কী জন্য বসছেন। দরকারে নাকি হুদাই! জরুরি হলে টাইমার ব্যবহার করতে পারেন। যখন বসা দরকার, তার দু-তিন মিনিট আগে অ্যালার্ম সেট করে রাখুন। অ্যালার্ম বাজলে অনলাইনে যান। কাজ শেষে আবার বেরিয়ে পড়ুন। 
সমাধান-২
বিশেষজ্ঞদের এমন মতামত মেনে নিতে পারি আমাদের পরিবারগুলোর ওপর চোখ রাখলেই। তাই এর সমাধান একটাই। রাতের খাবারে বন্ধ রাখুন অনলাইন। মন দিয়ে খান আর গল্প করুন পরিবারের সঙ্গে। 
সমাধান-৩
স্মৃতিকাতরতা কিংবা স্মৃতি মধুরতায় না ভুগে বুকসেলফ থেকে বই টেনে নিন। প্রতিদিন ফের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। শুরুতে অনলাইনে মনোযোগ দেওয়ার আগে অন্তত ৩০ পৃষ্ঠা বই পড়ার নিয়ম নিজের মাঝে চালু করুন। দেখবেন এতে অনলাইনে সময় অনেক কম দিচ্ছেন। এটা আপনার জন্য খুবই ইতিবাচক বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।  
সমাধান-৪ 
সকালে ও রাতের খাবারের পর হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই দরকারি। এতে দুটি লাভ। এক. আপনার স্বাস্থ্য ভালো থাকছে আর দুই. আপনার আসক্তি কমছে অনলাইনের প্রতি। সুতরাং হাঁটুন। 
সমাধান-৫
বন্ধু-বান্ধব কিংবা আপনজনদের নিয়ে বাইরে বেড়াতে যেতে পারেন। পথশিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। এমনও হতে পারে, আগে যে সময় অনলাইনে পড়ে থাকতেন অযথা এখন থেকে সে সময়ে অন্য কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। এভাবে এক মাসেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন নিজের মধ্যে। আপনি যদি মনে করেন অনলাইনে আসক্তি আছে, তাহলেই শুধু পারবেন এটি দূর করতে। সুতরাং আগে নিজের মাঝে অনুধাবন করুন–এটা ক্ষতিকর।
কিছুদিন ওপরের নিয়মে চলার পর দেখবেন শারীরিক ফিটনেস ফিরে আসার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও ফিরে এসেছে। এবার নিজের সাফল্যের জন্য নিজেকেই পুরস্কৃত করতে পারেন। শুধু তাই নয়; পরিবারে আপনার গুরুত্বটাও বেড়ে যাবে। এবার নিজেকে ফিরে পান নতুন করে! 

আরও পড়ুন

×