ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

আখড়ার গণ্ডি পেরিয়ে লালনকে বোঝার পালা

তিরোধান দিবস

আখড়ার গণ্ডি পেরিয়ে লালনকে বোঝার পালা
×
×

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫৪

‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’– ফকির লালন সাঁইয়ের এই গানে মানুষ নিজের সত্তাকে খোঁজার ইঙ্গিত পায়। নিজ পরিচয়, বিশ্বাস আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলার পথও দেখায়। অথচ লালনকে ঘিরে আয়োজন, গান আর স্মরণে যতটা আগ্রহ, তাঁর দর্শন নিজের জীবনে ধারণ করার চর্চা কি ততটা?

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের আয়োজন ঘিরে তাই সামনে আসছে তাঁকে নতুন করে বোঝার প্রশ্ন। আজ শনিবার থেকে তিন দিনের আয়োজনে সমবেত হবেন লালনভক্ত, সাধক ও দর্শনার্থীরা। উৎসবের আবহের বাইরে তাঁর জীবন, সাধনা ও মানবধর্মের দর্শন কতটা চর্চা হচ্ছে– সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

লালনের জন্মের দিন ও স্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, তাঁর জন্ম ১৭৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর। আবার কেউ কেউ বলেন ১৭৭২ বা ১৭৭৩ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া অথবা যশোর– এই তিন স্থানের কোনো একটিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন বলে জানা যায়। তাঁর মৃত্যু হয় ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ায় নিজের আখড়াতে। 

লালনের জীবনকথা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও তাঁর গান ও দর্শনের প্রভাব নিয়ে সংশয় কম। লালনের গানে উঠে এসেছে মানুষ, আত্মপরিচয়, জীবনবোধ ও মানবধর্মের প্রসঙ্গ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব গান মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। কিন্তু গান গাওয়া বা বাণী উদ্ধৃত করাই কি লালনচর্চার শেষ কথা? তাঁর দর্শনের তাৎপর্য বুঝতে হলে মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও নিজের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হয়।

লালন সাঁইয়ের মাজারের প্রধান খাদেম ফকির মোহাম্মদ আলী শাহের ভাষ্য, বাংলার প্রত্যন্ত পল্লিতে অনেক সাধক ও গুণী মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের মধ্যে লালন অন্যতম। তাঁর গান, বাণী ও দর্শন মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে, হয়ে উঠেছে বাংলা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লালনের সাধনার পথে চলতে গিয়ে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন মামুন সাধু। তাঁর কথায়, ২০১৫ সালের দিকে স্থানীয় লোকজন তাঁকে ‘পাগল’ বলে বিদ্রুপ করত। এক পর্যায়ে তাঁকে মানসিক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানেও ভর্তি করা হয়েছিল। সেই প্রতিকূল সময়ে লালনের বাণী তাঁকে সাহস জুগিয়েছে, দেখিয়েছে সাধনার পথ। ২০০০ সালের পর থেকে ছেঁউড়িয়ার লালনধামে নিয়মিত যাতায়াত তাঁর। তিরোধান দিবসের আয়োজনেও যুক্ত থাকেন তিনি। লালন একাডেমি, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবস্থা করা এবং সেবামূলক কাজে অংশ নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও সহযোগিতা করেন।

মামুন সাধু বলেন, ‘ফকির লালন সাঁইয়ের প্রতিটি বাণী আমাকে সাহস জোগায়, চলতে শেখায়, সাধনার পথ দেখায়। নিজের দেশকে চিনতে এবং মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যেতে শেখায়।’

লালনকে বোঝার প্রশ্ন শুধু ব্যক্তিগত সাধনায় সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর পরিচয় ও সাধনার ইতিহাস নিয়েও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন মনে করেন, লালনকে শুধু ‘বাউল’ পরিচয়ে দেখলে তাঁর ফকিরি সাধনার স্বাতন্ত্র্য বোঝা কঠিন।

মামুন বলেন, উনিশ শতকের শেষভাগে কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ‘বাউল’ পরিচয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। বাংলার বিভিন্ন সাধনধারার মানুষকে এই পরিচয়ের আওতায় আনার ফলে লালনের নিজস্ব সাধনপদ্ধতি ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃহত্তর ‘বাউল’ পরিচয়ের মধ্যে লালনকে দেখলে তাঁর নিজস্ব ফকিরি সাধনার বৈশিষ্ট্য আলাদা করে বোঝা কঠিন হতে পারে। তাঁর আখড়া, প্রতিকৃতি ও ‘বাউল সম্রাট’ পরিচয় কীভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তা নিয়েও গবেষণার প্রয়োজন।

লালনের দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দিক মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভেদাভেদ অতিক্রমের চেষ্টা। অ্যাডভোকেট লালিম হকের মতে, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে তাঁর দর্শনকে বোঝা যায়। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে প্রত্যেকের মর্যাদা স্বীকার করতে পারলে পারিবারিক সম্পর্ক থেকে রাষ্ট্রীয় পরিসরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

এই দর্শনের প্রতি আগ্রহ রয়েছে তরুণদের মধ্যেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহসানুল হক মনে করেন, লালনচর্চা শুধু সামাজিক মাধ্যমে গানের পঙ্‌ক্তি প্রকাশ কিংবা তাঁর আদলে পোশাক ও চুলের ধরন গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। অন্যের পরিচয় বিচার করার আগে নিজের বিশ্বাস ও আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলা দরকার। ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার কথা বলার পাশাপাশি নিজেদের আচরণে সেই শিক্ষা কতটা ধারণ করা হচ্ছে, সেটিও যাচাই করা জরুরি।

লালন স্মরণোৎসব শেষ হবে, মেলা ভাঙবে– কিন্তু মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও পারস্পরিক মর্যাদার প্রশ্ন থেকে যাবে। সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াই আখড়ার গণ্ডি পেরিয়ে লালনকে বোঝা ও খোঁজার পথ। (তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন কুমারখালী প্রতিনিধি)

আরও পড়ুন

×