ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নীল জলের শহরে

নীল জলের শহরে
×

সারনিয়ার সেন্ট ক্লেয়ার নদীর স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ হবে যে কেউ

মাহবুবা ফারুক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

কানাডার অন্যতম সুন্দর শহর সারনিয়ায় যাওয়ার সুযোগ হঠাৎ করে হয়ে গেল। যেমন হঠাৎ করে হয়েছে আমার কানাডায় আসা। এখানে এসে বেশ কয়েকটি জায়গায় বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে। মেয়ে ও জামাতা আমাদের আসার আগে প্রায় প্রতিটি উইকএন্ডে ঘিরে বেড়ানোর পরিকল্পনা সাজিয়ে রেখেছিল। এখানে গ্রীষ্ম ও বসন্ত যেন প্রকৃতিকে উপভোগ করার মৌসুম। শীত নামলে জীবন অনেকটাই বদলে যায়। তাপমাত্রা কখনও মাইনাস ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যায়, বরফে ঢেকে যায় রাস্তাঘাট। তাই সবাই গ্রীষ্মের প্রতিটি দিন আনন্দে কাটাতে চায়।
এই সময় প্রকৃতিও যেন নিজেকে উজাড় করে দেয়। সবুজ গাছ, রঙিন ফুল, নীল আকাশ, সাদা মেঘ–সব মিলিয়ে ছবির মতো চারপাশ। পাখিরা নির্ভয়ে উড়ছে, কাঠবিড়ালি বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কখনও খরগোশ এসে হাজির হচ্ছে। মন ভালো করার জন্য আর কী চাই! 
আজ বলব সারনিয়ার কথা। গিয়েছিলাম ২১ আগস্ট ২০২৬। আমাদের মেয়ে অফিসের কাজে সারনিয়া গিয়েছিল। ফেরার সময় জামাইবাবা তাকে নিয়ে আসার কথা। সেই সুবাদে আমাদের সারনিয়া দেখার সুযোগ। জামাইবাবা আগের দিন বলল–‘মা, তুমি আর বাবা সকালে তৈরি থাকবে। ঠিক ৯টায় বের হবো।’
পরদিন নির্ধারিত সময়ের আগে তৈরি হয়ে গাড়িতে বসলাম। রোদমাখা সুন্দর সকালে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। দুই পাশে ঘন সবুজ বন, ফসলের মাঠ, নাম না জানা গাছ আর ফুল। চমৎকার আবহাওয়া। গাড়িতে গান বাজছে আর আমি ছবি তুলছি, ভিডিও করছি। একসময় ছবি তোলা ছেড়ে শুধু তাকিয়ে রইলাম। পুরো দেশটি ছবির মতো সুন্দর। মনে হলো–আহা, জীবন এত সুন্দর! এত কিছু তো স্বপ্নেও দেখিনি! প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর পৌঁছলাম সারনিয়ায়। আমাদের মেয়ে হোটেলের সামনে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছিল। 
সারনিয়া সুন্দর, মাঝারি আকারের ছিমছাম ও শান্ত একটি শহর। অন্টারিও প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে হিউরন হ্রদ ও সেন্ট ক্লেয়ার নদীর সংযোগস্থলে এর অবস্থান। পাশে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্য। শহরটি তার সুন্দর জলসীমা ও সমুদ্রসৈকতের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। আমরা প্রথমেই গেলাম ব্লু ওয়াটার ব্রিজ দেখতে। এই সেতু কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রকে সংযুক্ত করেছে। আসলে এটি পাশাপাশি দুটি সেতুর সমন্বয়ে গঠিত। প্রথম সেতুটি ১৯৩৮ সালে এবং ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামলাতে দ্বিতীয়টি ১৯৯৭ সালে চালু করা হয়।
সেন্ট ক্লেয়ার নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ব্লু ওয়াটার ব্রিজের নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে সুন্দর রেলিং দেওয়া প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। নদীর জল এত স্বচ্ছ যে নিচের শ্যাওলাও দেখা যায়। নদীতে ছোট-বড় অসংখ্য বোট চলছে। কোনো বোটে একজন, কোনোটিতে পুরো পরিবার। বোটের পেছনে উড়ছে নিজ নিজ দেশের পতাকা।
সেতুর ওপর দিয়ে কানাডা ও আমেরিকার গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। মাঝখানে শুধু একটি নদী, একটি ব্রিজ–অথচ এপার থেকে ওপারে যাওয়ার কত নিয়ম! ওপারে আত্মীয়স্বজন, এপারে আমরা। এত কাছে, তবুও ইচ্ছে করলেও যাওয়া যায় না। 
নদীর তীরে সুন্দর পার্ক, বেঞ্চ, হাঁটার রাস্তা আর সবুজ ঘাসের গালিচা। কেউ হাঁটছে, কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, কেউ বা শিশুদের নিয়ে এসেছে। কেউ আবার প্রিয় পোষা কুকুর নিয়ে বেড়াচ্ছে। শহরজুড়ে রয়েছে অনেক পার্ক ও ট্রেইল। সারনিয়া শুধু পর্যটনের জন্যই নয়, শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি কানাডার অন্যতম প্রধান পেট্রোকেমিক্যাল ও শোধন শিল্পকেন্দ্র। এখানকার শিল্পাঞ্চল ‘কেমিক্যাল ভ্যালি’ নামে পরিচিত। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব বায়োকেমিক্যাল ও ক্লিন এনার্জি প্রযুক্তির দিকেও শহরটি এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২১ সালের শুমারি অনুযায়ী সারনিয়ার জনসংখ্যা ৭২ হাজার ৪৭ জন।
ঘুরতে ঘুরতে দুপুর পার হয়ে গেল। আমরা সেন্টেনিয়াল পার্কে গাছের ছায়ায় বসে নদীর জলছোঁয়া হাওয়া উপভোগ করছিলাম। এবার খাওয়ার পালা। জামাইবাবা ফোনে খুঁজে একটি চায়নিজ বুফে রেস্তোরাঁ বের করল। সেখানে খাওয়া সারলাম। খাওয়া শেষে বিলের সঙ্গে মেয়েটি চারটি ফরচুন কুকি দিল। প্রতিটি কুকির ভেতরে ছোট্ট কাগজে একটি করে বার্তা। আমরা সেগুলো ব্যাগে রেখে দিলাম–ঘরে ফিরে খুলব বলে। ফেরার পথে বাইরে থেকে দেখে এলাম ল্যাম্বটন কলেজ। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পাবলিক কলেজটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছেও বেশ পরিচিত।
বিকেল গড়িয়ে এবার টরন্টো ফেরার পালা। সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছে। একটু ঘুম পেলেও রাস্তার সৌন্দর্য ঘুমাতে দেয় না। যত দূর চোখ যায় সবুজ বন, লেক আর সুন্দর পথ। কোথাও পথ সোজা চলে গেছে দূরে, কোথাও আবার এঁকেবেঁকে হারিয়ে গেছে বনের ভেতরে। মনে হচ্ছিল কোনো অদৃশ্য মন্ত্রে চলছে সবকিছু।
সুন্দরী সারনিয়াকে মনে থাকবে। যেমন শহরটি সুন্দর, তেমনি সেখানে যাওয়ার পথটিও সুন্দর। রাতে ঘরে ফিরে চারটি ফরচুন কুকি খুললাম। কুকি খেতে যতটা মজা, তার চেয়েও মজার ভেতরের ছোট্ট চিরকুটগুলো। আশ্চর্যভাবে প্রত্যেকের বার্তা যেন তার সঙ্গে মিলে গেছে। ছোট্ট একটি বিষয়ও যে মানুষকে কত আনন্দ দিতে পারে, সেটি আবার মনে হলো। 
ভ্রমণে হাওয়া বদল হয়, রুচি বদল হয়, মনের অবস্থাও বদলে যায়। নতুন জায়গা দেখা মানে স্রষ্টার বিশাল সৃষ্টিকে নতুন করে আবিষ্কার করা। খুঁজে পাওয়া যায় বেঁচে থাকার নতুন রসদ। কানাডা ভ্রমণ শেষে একদিন আমরা দেশে ফিরে যাব। এই আনন্দ, এই পথ, এই নীল জল আর সুন্দর সারনিয়ার স্মৃতি আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে চিরদিন। 

আরও পড়ুন

×