ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডিজিটাল প্রিন্টে বসন

ডিজিটাল প্রিন্টে বসন
×

ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাক এখন চাহিদার শীর্ষে ছবি: হরিতকী

আসমাউল হুসনা

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ছাপা নকশার পোশাক অনেক বছর ধরেই ফ্যাশন সচেতনদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। সময় যত গড়াচ্ছে ততই এ নকশায় নতুনত্ব যোগ হচ্ছে। গত কয়েক বছরে ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাকের কদর বেড়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম রেখা থেকে শুরু করে রঙের স্তর, চিত্রকর্ম কিংবা জটিল কোনো মোটিফ কাপড়ে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা যায়। লিখেছেন আসমাউল হুসনা 

পোশাকের রং, নকশা, কাপড়ের বুনন কিংবা নকশার বিন্যাসে ফুটে ওঠে ব্যক্তিত্ব ও  রুচির বহিঃপ্রকাশ। সেই গল্পের সঙ্গে যখন মিশে যায় আধুনিক প্রযুক্তি, তখন পোশাক পেরিয়ে যায় তার চেনা সীমা। হয়ে ওঠে শিল্প আর সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রকাশ। ডিজিটাল প্রিন্ট ঠিক তেমনই এক মাধ্যম, যার ছোঁয়ায় কাপড়ে ফুটে উঠছে নতুন নতুন গল্প। কাপড়ে রং ও অলংকরণের ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরোনো। কখনও শিল্পীর তুলির আঁচড়, কখনও কাঠের ব্লকের ছাপ, আবার কখনও স্ক্রিন প্রিন্টের নিপুণ কারুকাজে পোশাকে ধরা দিয়েছে মানুষের কল্পনা। সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রযুক্তি, পাল্টেছে কাজের ধরন কিন্তু কাপড়ের ওপর নিজের ভাবনাকে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি। সেই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় আধুনিক সংযোজন ডিজিটাল প্রিন্ট।

প্রযুক্তিনির্ভর এ পদ্ধতি পোশাকের নকশায় এনে দিয়েছে বিস্তৃত সম্ভাবনা। সূক্ষ্ম রেখা, রঙের স্তর, আলো-ছায়ার খেলা, চিত্রকর্ম কিংবা জটিল কোনো মোটিফ অনেক কিছুই নিখুঁতভাবে তুলে ধরা সম্ভব কাপড়ে। ফলে একজন ডিজাইনার বা নকশাকারের ভাবনার পরিসরও হয়েছে আরও বিস্তৃত। রং, রেখা ও বিন্যাসের সমন্বয়ে সাধারণ একটি পোশাকও পেয়ে যেতে পারে স্বতন্ত্র এক পরিচয়। 
পোশাকের ডিজাইনাররা মনে করেন, ডিজিটাল প্রিন্টের অন্যতম সুবিধা হলো বিভিন্ন ধরনের ফেব্রিকের ব্যবহার। সুতি, সিল্ক, ভিসকস, লিনেন, পলিয়েস্টার, জর্জেট, ক্রেপ, সাটিনসহ নানা ধরনের কাপড়ে এ পদ্ধতিতে প্রিন্ট করা যায়। অবশ্য ফেব্রিকের ধরন অনুযায়ী প্রিন্টিং প্রযুক্তি, রং ও কালির ব্যবহারে ভিন্নতা রয়েছে। প্রাকৃতিক তন্তুর কাপড়ে রিঅ্যাকটিভসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি এবং সিনথেটিক ফেব্রিকে সাবলিমেশন বা উচ্চতর রূপান্তরসহ উপযুক্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তাই পোশাকের ধরন, ফেব্রিক এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের কথা বিবেচনায় রেখে সঠিক প্রিন্টিং পদ্ধতি নির্বাচন করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ বৈচিত্র্যের কারণেই সময়ের সঙ্গে ডিজিটাল প্রিন্টের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। শাড়ি, কামিজ, পাঞ্জাবি, থ্রিপিস, স্কার্ট, টপস কিংবা শার্ট–বিভিন্ন পোশাকেই দেখা যাচ্ছে এর নানামুখী ব্যবহার। বিশেষ করে গতানুগতিক নকশার বাইরে একটু আলাদা, স্বতন্ত্র কিছু পরতে চান যারা, তাদের কাছে ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাক হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় একটি পছন্দ। ডিজিটাল প্রিন্টের উজ্জ্বল রং সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে দেশীয় ফেব্রিকই ব্যবহার করা হয়। শাড়ি, থ্রিপিস, কুর্তি, স্কার্ট, ঘাগরা, ওড়না, টপস, স্কার্ফ, ফ্রক থেকে শুরু করে শিশু ও পুরুষের পোশাকেও ডিজিটাল প্রিন্ট করা যায় বলে এটি এখন ক্রেতা চাহিদার শীর্ষে।

হরীতকীর সহপ্রতিষ্ঠাতা বলরাম পাল বলেন, ‘বর্তমানে ক্রেতার মধ্যে মাল্টিকালার বা বিচিত্র রঙের নকশার চাহিদা বেশ লক্ষণীয়। একাধিক রঙের সমন্বয় পোশাকে এনে দেয় প্রাণবন্ত। তবে শুধু বেশি রং ব্যবহার করলে একটি নকশা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে না। রঙের পারস্পরিক সামঞ্জস্য, কম্পোজিশন এবং পোশাকের সঙ্গে মোটিফের মানানসই হওয়াটা একটি সুন্দর ভিজ্যুয়াল তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’ 
তিনি আরও বলেন, ‘নকশা তৈরির সময় এর মৌলিকত্ব ও কাজের নিখুঁতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ডিজাইন যেন স্বতন্ত্র হয় এবং অন্য কারও কাজের সঙ্গে অযথা মিল না থাকে শুরুতে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। পাশাপাশি নকশায় যেন অস্পষ্টতা না থাকে, রঙের ব্যবহার যেন দৃষ্টিনন্দন হয় এবং পুরো কাজটি ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, সেদিকেও নজর রাখা হয়।’ 

হরীতকীর নকশায় রয়েছে ফুল, ফল, লতা-পাতা, চিত্রকর্মসহ নানা বিষয়। পূজা, ঈদ ও পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবকে ঘিরে যেমন রয়েছে বিশেষ আয়োজন, তেমনি বর্ষা, শরৎ ও বসন্তের মতো ঋতুকেও নকশায় তুলে ধরা হয়েছে। ফলে পোশাকের রং ও অলংকরণে কখনও ধরা পড়ে উৎসবের আবহ, কখনও ফুটে ওঠে ঋতুর নিজস্ব রূপ। 
তবে পোশাক কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতার ভাবনা শুধু নকশায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি পোশাক দেখতে যতই আকর্ষণীয় হোক, পরতে আরামদায়ক না হলে তা দীর্ঘস্থায়ী পছন্দ হয়ে ওঠে না। তাই ইউনিক ডিজাইন বা ব্যতিক্রমী নকশার পাশাপাশি ফেব্রিকের মান, আরাম এবং ব্যবহারের উপযোগিতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন ক্রেতারা। অর্থাৎ নান্দনিকতা ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধের পাশাপাশি মানসম্মত পণ্যও এখন তাদের পছন্দের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ডিজিটাল প্রিন্ট নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণাও রয়েছে–এ ধরনের পোশাকের রং নাকি সহজেই উঠে যায় কিংবা কিছুদিন পর ফিকে হয়ে পড়ে। বাস্তবে বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করে ফেব্রিক, ব্যবহৃত রং ও কালি এবং প্রিন্টিংয়ের মানের ওপর। নিম্নমানের উপকরণ বা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণে কোথাও এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে এ ধারণা।
ডিজিটাল প্রিন্টের সম্ভাবনাকে আরও সৃজনশীলভাবে দেখছে স্টুডিও নুভিয়া। স্টুডিও নুভিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ফাতেমা তুজ জোহরা নুভিয়া বলেন, ‘ডিজিটাল প্রিন্ট কেবল একটি প্রিন্টিং টেকনিক নয়, এটি ভাবনা, অনুভূতি ও শিল্পকে পোশাকে তুলে ধরার মাধ্যম। প্রকৃতি, লোকজ জীবন, পুরোনো শিল্পভাষা কিংবা চারপাশের কোনো চেনা দৃশ্য সবকিছুই হতে পারে সৃষ্টির অনুপ্রেরণা। সেই ভাবনাকে রং, রেখা ও কম্পোজিশনের মাধ্যমে নতুনভাবে সাজিয়ে কখনও শাড়ি, কখনও শার্ট কিংবা অন্য পোশাকে তুলে ধরা হয়।’ 
নুভিয়া মনে করেন, কনটেম্পোরারি বা আধুনিকতা মানে শিকড় থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং পরিচিত দৃশ্য, দেশজ অনুভূতি ও ঐতিহ্যবাহী নান্দনিকতাকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে উপস্থাপন করাই এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পুরোনো ও নতুনের এ সংযোগ থেকে তৈরি হতে পারে স্বতন্ত্র একটি শিল্পভাষা।
‘সহজ সুতা, মাটির টান, দৈনন্দিন আরাম’–এই ভাবনাকে সামনে রেখে স্টুডিও নুভিয়া ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রেরণা নেয়, শিল্পকে সঙ্গে রাখে এবং সমকালীন জীবনের উপযোগী করে নিজের গল্প বলার চেষ্টা করে। ডিজিটাল প্রিন্টের আকর্ষণ তাই শুধু আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। এর আসল শক্তি হলো একটি ভাবনাকে রঙে, রেখায় ও আকারে এমনভাবে প্রকাশ করা। 

যত্ন
ফেব্রিক যাই হোক না কেন, ডিজিটাল প্রিন্টের পোশাক প্রথমবার ধোয়ার আগে বালতিতে পানি ও লবণ মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণে কাপড় ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এরপর ধুয়ে ফেলুন। ধোয়ার পর কখনোই কাপড় অতিরিক্ত চিপে পানি বের করবেন না। ডিজিটাল প্রিন্টে একসঙ্গে অনেক রঙের সমাহার থাকে। তাই এটি কড়া রোদে অতিরিক্ত সময় থাকলে ঝলসে যেতে পারে। পোশাকটি উল্টো করে রোদে শুকালে দীর্ঘদিন কাপড়ের রং ঠিক থাকবে। পোশাক প্রতিবার ধোয়ার সময় মাইল্ড ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা ভালো। 
ছবি: স্টুডিও নুভিয়া

আরও পড়ুন

×