ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুতি শাড়িতে আরাম

সুতি শাড়িতে আরাম
×

সুতি শাড়িতে সরু ও কনট্রাস্ট পাড়, হাতে আঁকা মোটিফ কিংবা বিমূর্ত নকশা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ছবি: বিশ্বরঙ

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভ্যাপসা গরমে পরার জন্য সুতি শাড়ি যেন বাঙালি নারীর চিরচেনা ভরসা। টাঙ্গাইল শাড়ি কিংবা তাঁতে বোনা যেকোনো সুতি শাড়ির প্রতিটি বুননে মিশে রয়েছে বাংলাদেশের মাটি, নদী, প্রকৃতি ও মানুষের গল্প। কখনও ফুল-লতা, কখনও জ্যামিতিক নকশা, কখনও বা সাদামাটা পাড়ে ফুটে ওঠে শাড়ির সৌন্দর্য। সময় বদলেছে, বদলেছে শাড়ির নকশা ও পরার ধরন।  তবুও গরমের দিনে সুতি শাড়ির আরাম ও আবেদন আজও অমলিন। লিখেছেন রিক্তা রিচি

ভ্যাপসা গরমে পোশাক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরামের বিষয়টি হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জায়গায় বাঙালি নারীর দীর্ঘদিনের ভরসা সুতি শাড়ি। হালকা, আরামদায়ক এবং বাতাস চলাচলের উপযোগী হওয়ায় গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় সারাদিন পরার জন্য সুতি শাড়ির জুড়ি মেলা ভার। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের তাঁত, মাটি, নদী, লোকজ নকশা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বয়নঐতিহ্য। কখনও একরঙা, কখনও পাড়ে-বুটিতে সাদামাটা নকশা, আবার কখনও জমিনজুড়ে ফুটে ওঠে লোকজজীবনের গল্প। সেজন্য সুতি শাড়ি একদিকে যেমন দৈনন্দিন পোশাক, অন্যদিকে তেমনি বাঙালির সংস্কৃতি ও নান্দনিকতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সাহিত্যে নারীর শাড়ি
‘আগে ওকে বারবার দেখেছি/লাল রঙের শাড়িতে–/দালিম-ফুলের মতো রাঙা…।’
শাড়ি শুধু নারীর পোশাক নয়, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও এর রয়েছে দীর্ঘ উপস্থিতি। ১২ হাত দৈর্ঘ্যের সেলাইবিহীন এ পোশাকটির ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। সময়ের সঙ্গে এর কাপড়, বুনন, নকশা, পরার ধরন ও উপস্থাপনায় এসেছে নানা পরিবর্তন। তবুও শাড়ির আবেদন কমেনি। চণ্ডীদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ– বাংলা সাহিত্যের অনেক কবির লেখায় নানা রূপে এসেছে শাড়ি পরা নারীর সৌন্দর্য। কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতায় পাওয়া যায় ‘উদয়তারার শাড়ি’, ‘মেঘডুমুর শাড়ি’ ও ‘বাসন্তী রঙের শাড়ি’। জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের ‘যতদিন বেঁচে আছি’ কবিতায় শাড়ি, নারী, সৌন্দর্য ও বিষণ্নতা একাকার হয়ে উঠেছে– ‘যেইখানে কল্কাপেড়ে শাড়ি প’রে কোনো এক সুন্দরীর শব/চন্দন চিতায় চড়ে–আমের শাখায় শুক ভুলে যায় কথা;/সেইখানে সবচেয়ে বেশি রূপ–সবচেয়ে গাঢ় বিষণ্নতা।’

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ছড়া গান ‘লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া’তেও মজার ছলে এসেছে শাড়ির প্রসঙ্গ। বড় চেকের টিয়ে রং শাড়ির বায়না ধরে সেখানে লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া। সাহিত্য থেকে লোকসংস্কৃতি–বাঙালির মনন ও কল্পনায় শাড়ির উপস্থিতি এভাবেই বহুমাত্রিক।

কেন গরমে সুতি?
সুতি কাপড়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর হালকা ও আরামদায়ক প্রকৃতি। প্রাকৃতিক তন্তুর তুলা দিয়ে তৈরি হওয়ায় সুতির কাপড়ে বাতাস চলাচল তুলনামূলক সহজ হয়। ফলে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় শরীরে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। আর্দ্রতাও শোষণ করতে পারে সুতি তন্তু। এ কারণে ঘামপ্রবণ গরমের দিনে সুতির পোশাক অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক মনে হয়। 

টাঙ্গাইলের তাঁতে ঐতিহ্যের বুনন
বাংলাদেশের সুতি শাড়ির কথা উঠলে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির কথা আলাদা করে বলতে হয়। টাঙ্গাইলের পাথরাইল, দেলদুয়ার, কালিহাতীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে তাঁতশিল্পের চর্চা হয়ে আসছে। এ অঞ্চলের বয়নঐতিহ্যের সঙ্গে বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিদের অবদানও গভীরভাবে যুক্ত।
বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী বিপ্লব সাহা বলেন, টাঙ্গাইলের শাড়ির পাড়ে নানা ধরনের জ্যামিতিক, ফুলেল ও ঐতিহ্যবাহী মোটিফ দেখা যায়। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, সাদা কিংবা মাটির কাছাকাছি রঙের সমন্বয়ে তৈরি হয় এর নান্দনিকতা। টাঙ্গাইল শাড়ির আকর্ষণের জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে এর নকশা পাড়, বুটি এবং সূক্ষ্ম বুনন। ঐতিহ্যবাহী নকশায় পদ্ম, লতা, ফুল ও জ্যামিতিক মোটিফের পাশাপাশি আধুনিক নকশারও ব্যবহার হচ্ছে। শাড়ির ধরনভেদে মিহি সুতা, রঙের বৈচিত্র্য এবং পাড়-আঁচলের কাজ এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়।

তাঁতের শাড়ি আর টাঙ্গাইল শাড়ি এক নয়
অনেক সময় ‘তাঁতের শাড়ি’ ও ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’কে একই অর্থে ব্যবহার করা হলেও বিষয় দুটি এক নয়। ‘তাঁতের শাড়ি’ একটি বৃহত্তর পরিচয়। হাতে বা পাওয়ারলুমে বোনা বিভিন্ন ধরনের সুতি, সিল্ক, হাফ সিল্ক বা মিশ্র তন্তুর শাড়িকে সাধারণভাবে তাঁতের শাড়ি বলা হয়। বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, নরসিংদীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতের শাড়ি এই বৃহত্তর শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে টাঙ্গাইল শাড়ি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্বতন্ত্র বয়নধারা। এর নকশা, বুনন, পাড়, বুটি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য একে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তাই সব টাঙ্গাইল শাড়ি তাঁতের শাড়ি হলেও সব তাঁতের শাড়ি টাঙ্গাইল শাড়ি নয়।

সুতি শাড়ির বৈচিত্র্য শুধু টাঙ্গাইলেই সীমাবদ্ধ নয়। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের তাঁত শাড়িও দীর্ঘদিন ধরে দেশের শাড়িপ্রেমীদের কাছে পরিচিত। বাংলাদেশের সুতি বস্ত্রঐতিহ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নাম কুমিল্লার খাদি। হাতে কাটা সুতা ও হাতে বোনা কাপড়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে খাদির সম্পর্ক গভীর। খাদি খানিকটা খসখসে, স্বাভাবিক টেক্সচার এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একরঙা খাদি শাড়িতে থাকে মাটির কাছাকাছি এক ধরনের স্নিগ্ধতা। আবার ব্লক, বাটিক কিংবা হাতে আঁকা নকশা যোগ হলে সেই খাদি হয়ে ওঠে আধুনিক ও ফ্যাশনেবল।

তাঁতশিল্প মানে অনেক মানুষের জীবিকা
বিপ্লব সাহা বলেন, সুতি শাড়ি পুরো তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের তাঁতশিল্প শুধু পোশাক তৈরির শিল্প নয়; এটি লোকজ সংস্কৃতি ও অর্থনীতিরও অংশ। একটি দেশীয় তাঁতের শাড়ি কেনার মধ্য দিয়ে একজন ক্রেতা পরোক্ষভাবে সেই ঐতিহ্য ও কারিগরদের টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এ কারণে দেশীয় তাঁতের শাড়ি কেনার বিষয়টি কেবল ফ্যাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে স্থানীয় উৎপাদন, কারিগরের শ্রম এবং একটি ঐতিহ্যকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।

ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতায়
সময় বদলেছে, বদলেছে সুতি শাড়ির নকশাও। একসময় যেখানে চওড়া পাড়, বুটি বা সাধারণ ডোরা ছিল বেশি জনপ্রিয়, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে সরু পাড়, কনট্রাস্ট পাড়, হাতে আঁকা মোটিফ, টাইপোগ্রাফি কিংবা বিমূর্ত নকশা। কে ক্র্যাফটের কর্ণধার খালিদ মাহমুদ খান জানান, তাঁতের শাড়িতে স্ক্রিনপ্রিন্ট, ব্লকপ্রিন্ট, রিবন ওয়ার্ক, ডলার ওয়ার্কসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করা হচ্ছে। জ্যামিতিক ও ফুলেল নকশার পাশাপাশি মূর্ত ও বিমূর্ত নানা মোটিফও শাড়ির সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে।

প্যাঁচওয়ার্কে নতুন রূপ
দেশীয় ফ্যাশনে এখন বেশ নজর কাড়ছে প্যাঁচওয়ার্কের সুতি শাড়ি। বিভিন্ন শাড়ির টুকরো কেটে নতুনভাবে জুড়ে তৈরি করা হয় এসব শাড়ি। ফলে একই শাড়ির কুচি, পাড়, জমিন ও আঁচলে দেখা যেতে পারে ভিন্ন ভিন্ন রং ও নকশা।

সুতি শাড়িতে সাজ
তরুণীরাও নিজেদের মতো করে তাঁতের শাড়ি পরছে। ঐতিহ্যবাহী শাড়ির সঙ্গে কেউ পরছেন ক্রপ টপ, কেউ কুর্তি, শার্ট কিংবা আধুনিক কাটের ব্লাউজ। বড় কানের দুল, কাঠের গহনা কিংবা একেবারে মিনিমাল অলংকার বেছে নিচ্ছে। একই শাড়ি কখনও সাদামাটা, কখনও আধুনিক, আবার কখনও উৎসবমুখর করে তোলা যায় সাজের সামান্য পরিবর্তনে।

সাধ্যের মধ্যে সেরা
বিভিন্ন দেশীয় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও পাওয়া যায় নানা ধরনের সুতি শাড়ি। কোটা, ফাইন সুতি, সুতি প্রিন্ট, তাঁত, মণিপুরি তাঁত, সুতি জামদানি, জ্যাকার্ডসহ বাজারে এখন রয়েছে নানা ধরনের সুতি শাড়ি। সাধারণ তাঁতের শাড়ি স্থানীয় বাজারে প্রায় এক হাজার টাকার মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে। নকশা, কাপড়ের মান, বুনন ও ব্র্যান্ডভেদে দাম বাড়ে। দেশীয় ব্র্যান্ডের বিভিন্ন নকশার সুতি শাড়ি সাধারণত তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা বা তার বেশি দামে পাওয়া যায়। 

আরও পড়ুন

×