পেঁয়াজে ভোক্তা, আলুতে হতাশ চাষি বছর শেষে ভোজ্যতেলের চাপ
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদায়ী ২০২৫ সালে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল পেঁয়াজ, আলু ও ভোজ্যতেল। কিছু সময়ের জন্য খাবার টেবিলের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছিল সবজি ও ডিম। বছরের বিভিন্ন সময়ে দাম ওঠানামা, আমদানিনির্ভরতা, উৎপাদন পরিস্থিতি ও নীতিগত সিদ্ধান্ত এসব পণ্যের বাজারকে প্রভাবিত করেছে। এতে ভোক্তাকে বছরজুড়ে বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, বেশি দাম হলে ভোক্তা চাপে পড়েন। অন্যদিকে, দাম পড়ে গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। সেজন্য সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা জরুরি।
কারসাজিতে শেষ পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি
চলতি বছর এক-দেড় মাসের জন্য বেশ আলোচনায় উঠে আসে পেঁয়াজের বাজার। শুরুতে দেশীয় উৎপাদন ও আগের মৌসুমের মজুতের কারণে দাম তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসে বদলে যায় পরিস্থিতি। হঠাৎ করে সরবরাহে টান পড়ে। এতে অস্থির হয়ে ওঠে বাজার। দাম বেড়ে কেজি ১৫০ টাকা স্পর্শ করে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার একাধিকবার আমদানির সিদ্ধান্ত নিলেও কৃষকের
ন্যায্য দর নিশ্চিত করার বিষয়টি
মাথায় রেখে আমদানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। শেষ পর্যন্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ ও আমদানিকারকদের চাপে সরকার আমদানির অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে আসার পর দাম অনেকটা কমে আসে।
আলুর উৎপাদন বেশি, লোকসানে কৃষক
পেঁয়াজের বাজারের ঠিক উল্টো চিত্র ছিল আলুর বাজারে। গত মৌসুমে চাহিদার তুলনায় অন্তত ১০ লাখ টন বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে। এতে রপ্তানি ও আলুর বিকল্প ব্যবহার না বাড়ার কারণে দাম তলানিতে পড়েছে। হিমাগারগুলোয় পাঁচ-ছয় লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থাকার কারণে পাইকারি পর্যায়ে কেজি পাঁচ-ছয় টাকায় বিক্রি হয়েছে; যেখানে উৎপাদন ব্যয় ছিল কেজিতে এলাকাভেদে ১৭ থেকে ২২ টাকা। বছরজুড়েই আলুর দর নিম্নমুখী থাকায় ভোক্তা স্বস্তি পেলেও কৃষক ন্যায্যমূল্য পাননি। হিমাগার ভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক কৃষক বড় লোকসানের মুখে পড়েন।
পুরোনো আলুর পর্যাপ্ত মজুতের মধ্যেই বাজারে চলে আসে আগাম জাতের নতুন আলু। এই ধরনের আলুতে সাধারণত কৃষক ভালো দাম পেয়ে থাকেন। এবার ভিন্ন বাস্তবতা দেখলেন কৃষক। নতুন আলুর দরও নেমে আসে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। আলুর বাজারে কৃষকের এমন হতাশার চিত্র নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আগামী বছর অনেক চাষি লোকসানের ভয়ে আলু আবাদ থেকে সরে আসতে পারেন বলে মনে করছেন অনেক ব্যবসায়ী।
শেষ দিকে ভোজ্যতেলের দামের চাপ
বিদায়ী বছরের বেশির ভাগ সময় স্থিতিশীল ছিল ভোজ্যতেলের বাজার। তবে বিশ্ববাজারে দাম নিম্নমুখী থাকলেও বছরের শেষ দিকে এসে নানা অজুহাত দাঁড় করান আমদানিকারক ও পরিশোধনকারীরা। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়া , ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে বছরের মাঝামাঝি এক পর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
তবে সরকার তাতে সায় দেয়নি। ফলে তাদের বর্ধিত দাম কার্যকর হয়নি। বছরের শেষ দিকে এসে তারা কোনো রকম ঘোষণা ছাড়াই বাজারে লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে নতুন দামের তেল সরবরাহ শুরু করে। এরপর সরকার হস্তক্ষেপ করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের প্রস্তাবে সম্মতি দিতে বাধ্য হয়। ফলে বছরের শেষ দিকে এসে ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম লিটারে যথাক্রমে ৬ ও ১৪ টাকা বাড়ার কারণে খরচ বেড়ে যায় সাধারণ পরিবারের।
কিছু সময় সবজির বাজার ছিল চড়া
পেঁয়াজ, আলু, ভোজ্যতেলের বাইরে চলতি বছর কিছু কিছু সময় সবজির দামও চড়া ছিল। বিশেষ করে বর্ষা ও অমৌসুমি বৃষ্টির সময় সরবরাহ কমে যাওয়ায় কাঁচামরিচ, টমেটো, শাকসবজির দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। তবে মৌসুম স্বাভাবিক হলে এসব পণ্যের সরবরাহ বাড়তে থাকে। দামও কমে আসে।
চালের বাজারেও ছিল উত্তাপ
এর বাইরে গত বছর চালের বাজার ছিল অনেক অসহনীয়। সরু চালের কেজি সর্বোচ্চ ৮৫, মাঝারি চালের কেজি ৬৫ এবং মোটা চালের কেজি ৫৮ টাকা স্পর্শ করেছিল। বছরের প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় ধরে চালের বাজারে উত্তাপ ছিল। অবশ্য, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চাল আমদানি এবং নতুন ধান ওঠা শুরু হলে বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
তবে ডিম-মুরগির বাজার অন্যান্য বছরের মতো তেমন আলোচনায় ছিল না। পণ্য দুটির দাম অনেকটা নাগালেই ছিল। বর্তমানে ডিমের ডজন ১০৫ থেকে ১১০ ও ব্রয়লারের কেজি ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকায় কেনা যাচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন সমকালকে বলেন, বিদায়ী বছরে তিন-চারটি পণ্যের দাম অনেক বেড়েছিল। এতে ভোক্তাকে বিপাকে পড়তে হয়েছে। তবে দু-একটি কৃষিপণ্যের দাম এত কমে যায়, কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। অতি মূল্য আবার দাম পড়ে যাওয়া– দুটিই বাজারে শৃঙ্খলা নষ্ট করে।
- বিষয় :
- বাজার দর
