ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

অভিমত

টিস্যু কালচার বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের কৃষি

টিস্যু কালচার বদলে দিতে  পারে বাংলাদেশের কৃষি
×

অধ্যাপক ড. এম এ রহিম

অধ্যাপক ড. এম এ রহিম

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের কৃষি গত পাঁচ দশকে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। খাদ্য উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছেছি। কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আগামী দিনের কৃষির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ, মানসম্পন্ন, রোগমুক্ত এবং উচ্চফলনশীল কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা। এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, টিস্যু কালচার প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে। কারণ, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, যেগুলোর সমাধান প্রচলিত পদ্ধতিতে অনেক কঠিন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো টিস্যু কালচার আমাদের ভাইরাসমুক্ত চারা উৎপাদনের সুযোগ করে দেয়। কৃষিতে ভাইরাসজনিত রোগ একটি বড় সমস্যা। সাধারণ গ্রাফটিং, কাটিং কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক বংশবিস্তার পদ্ধতিতে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। বাইরে থেকে চারা দেখতে সুস্থ মনে হলেও তার মধ্যে অনেক সময় ভাইরাস বহন করে, যা পরে পুরো বাগান বা ক্ষেতকে আক্রান্ত করে। কিন্তু টিস্যু কালচারের মাধ্যমে পরীক্ষিত মাতৃগাছ থেকে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে চারা উৎপাদন করা হয়। ফলে কৃষক শুরু থেকেই একটি নির্ভরযোগ্য, স্বাস্থ্যবান ও মানসম্পন্ন চারা পান।
রোগমুক্ত চারা ছাড়াও টিস্যু কালচারের আরেকটি বড় শক্তি হলো অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক চারা উৎপাদনের সক্ষমতা। অনেক ফসল আছে যেগুলোর স্বাভাবিক বংশবিস্তার ধীরগতির। আবার কিছু উদ্ভিদের চারা উৎপাদন ব্যয়বহুল বা সীমিত। এসব ক্ষেত্রে টিস্যু কালচারই সবচেয়ে কার্যকর প্রযুক্তি। একটি উন্নতমানের গাছ থেকে হাজার হাজার একই মানের চারা উৎপাদন করা সম্ভব, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে কল্পনাও করা যায় না।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই প্রযুক্তির গুরুত্ব বুঝেছে। নেদারল্যান্ডসের ফুল ও নার্সারি শিল্পের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। টিউলিপসহ অসংখ্য ফুলের চারা টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোও বাণিজ্যিক কৃষিতে এই প্রযুক্তিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে অর্কিড উৎপাদনে থাইল্যান্ডের সাফল্যের পেছনে টিস্যু কালচার অন্যতম ভিত্তি। তারা প্রতিবছর লাখ লাখ চারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে।
বাংলাদেশেও এখন এই প্রযুক্তির ব্যবহার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে জি-৯ কলা, স্ট্রবেরিসহ বিভিন্ন ফল ও উদ্যান ফসলের টিস্যু কালচার চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে ভবিষ্যতে বছরে লাখ লাখ উন্নতমানের চারা উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কৃষক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দেশের কৃষিও আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
আমি দীর্ঘদিন ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত আছি। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু প্রযুক্তি নয়, স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা। প্রশিক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, উন্নয়নকর্মী ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। তাঁরা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি একজন উদ্যোক্তা কীভাবে শুরু করবেন, কী ধরনের ঝুঁকি থাকবে, কীভাবে সেই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে এসব বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। হয়তো প্রশিক্ষণ শেষ করেই সবাই উদ্যোক্তা হয়ে যাচ্ছেন না। কিন্তু তাঁদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার যে আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহ তৈরি হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে বড় অর্জন। 
আমি নিজে মাঠে গিয়ে দেখেছি, এই প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান কাজে লাগিয়ে অনেকে ইতোমধ্যে সফল উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন। প্রকল্প চলাকালেই এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। আমার বিশ্বাস, প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও এর সুফল দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া যাবে।
টিস্যু কালচার কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোরও একটি কার্যকর মাধ্যম। মানসম্পন্ন চারা মানেই বেশি উৎপাদন, কম রোগবালাই এবং ভালো বাজারমূল্য। এতে কৃষকের আয় বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় কমে এবং ঝুঁকিও হ্রাস পায়। এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। বাংলাদেশের প্রায় চার কোটি মানুষ এখনও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিয়মিত মাছ, মাংস বা ডিম খাওয়ার সামর্থ্য রাখেন না। তাঁদের জন্য ফল ও শাকসবজিই ভিটামিন ও খনিজের প্রধান উৎস। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উন্নতমানের ফল ও সবজির চারা দ্রুত কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়বে, বাজারে সরবরাহ বাড়বে, দাম সহনীয় হবে এবং সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করা সহজ হবে। 
লেখক: স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী

আরও পড়ুন

×