ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

পুঁজিবাজার থেকে এসএমইর অর্থায়ন একেবারেই সীমিত

পুঁজিবাজার থেকে এসএমইর  অর্থায়ন একেবারেই সীমিত
×

আনোয়ার ইব্রাহীম 

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ চার বছরেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। ২০২২ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে এসএমই প্ল্যাটফর্ম চালু হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২০টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। মূলধন সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১৪৪ কোটি টাকা। 

অথচ ভারতের এনএসই ইমার্জে ৭০০টির বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ মূলধন সংগ্রহ করেছে। চীন ও মালয়েশিয়ার চিত্রও তুলনামূলকভাবে ভালো। প্রশ্ন উঠছে–প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে এগিয়ে গেছে, বাংলাদেশ সেখানে কেন পিছিয়ে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী সমকালকে বলেন, দেশে প্রায় এক কোটি ১৮ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশ জোগান দেয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ৯৮ শতাংশই এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই বিশাল খাত এখনও অর্থায়নের জন্য পুরোপুরি ব্যাংক ঋণনির্ভর। উচ্চ সুদহার ও জামানত সংকটে পড়ে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত হারে সম্প্রসারণ করতে পারছে না। 

তিনি বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণখেলাপির হার ১ শতাংশেরও কম। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান নিয়মিত খেলাপি হলেও ব্যাংকগুলো তাদের প্রতি নমনীয়। অথচ  ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে কঠোর। ঋণের বাইরে শেয়ার বিক্রি করে পুঁজি সংগ্রহে ছোট কোম্পানিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সহজ করতে হবে।
২০১৯ সালে আইনি কাঠামো প্রণয়নের পর ২০২২ সালে ডিএসই ও সিএসইতে আনুষ্ঠানিকভাবে এসএমই প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়। লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সহজ শর্তে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া। তবে চার বছর পরও বাস্তব চিত্র হতাশাজনক। তালিকাভুক্ত ২০টি কোম্পানির মধ্যে পাঁচটি আবার মূল বাজার থেকে ২০০৯ সালে তালিকাচ্যুত হয়ে ওটিসিতে অন্তর্ভুক্ত পুরোনো কোম্পানি। নতুন উদ্যোক্তাদের থেকে সাড়া মেলেনি বললেই চলে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, বড় কোম্পানিগুলোর তুলনায় এসএমই কোম্পানিগুলোর জন্য শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ প্রক্রিয়া অনেক সহজ এবং নিয়মনীতি শিথিল করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করার ন্যূনতম যোগ্যতা সিংহভাগ কোম্পানির নেই। সিংহভাগ এসএমই কোম্পানি আয়-ব্যয় বা যে কোনো ধরনের লেনদেনের হিসাব রাখে না। সম্পদ কত, দায় কত– জানতে চাইলে বলতে পারে না। যখন প্রয়োজন ব্যক্তিগত টাকা ব্যবসায় লগ্নি করছে, আবার ইচ্ছামতো তুলে নিচ্ছে। প্রায় সব লেনদেন নগদে করে। এভাবে এসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনা সম্ভব নয়, ঠিকও নয়। নুজহাত আনোয়ার বলেন, বাস্তব এই অভিজ্ঞতার আলোকে স্টক এক্সচেঞ্জ সম্ভাবনাময় কিছু এসএমই কোম্পানিকে টার্গেট করে হিসাব রাখা, নগদের পরিবর্তে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করার সুবিধা বুঝিয়েছে। তারাও আগ্রহী। এসএমই ফাউন্ডেশন ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী চেম্বারের সঙ্গে মিলে আগ্রহী কোম্পানিগুলোকে খুঁজে বের করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর ফল আগামী তিন বছর পর মিলবে। এসব কোম্পানিকে হিসাব রাখার পদ্ধতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বোঝাতে হবে। সে কাজটি শুরু করেছি। এখন এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও হিসাব ঠিক করতে কিছু খরচও আছে। এই খরচ করার সামর্থ্যও কোম্পানিগুলোর নেই। কোম্পানিগুলোর এই প্রস্তুতিসহ এ ধরনের খরচ যেন তাদের নিজেদের পকেট থেকে না দিতে হয়, সেজন্য ডিএসই সুইস কন্টাক্টের মতো বিদেশি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কথা বলছে, যারা এসব ক্ষেত্রে আর্থিক অনুদান বা সহায়তা দেয়। এজন্য ডিএসইর একটি ‍টিম কাজ করছে, সিএসইও সহযোগিতা করছে। 

ভারতের সাফল্যের গল্প
এসএমই পুঁজিবাজার উন্নয়নে ভারতের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে আলোচিত। ২০১২ সালে দেশটির ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ ‘এনএসই ইমার্জ’ নামে এসএমই প্ল্যাটফর্ম চালু করে। তবে শুরুটা খুব আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রথম কয়েক বছরে খুব অল্পসংখ্যক কোম্পানি পুঁজি সংগ্রহ করে। এরপর স্টক এক্সচেঞ্জ, শিল্প সংগঠন, মার্চেন্ট ব্যাংকার ও সরকারের সমন্বিত প্রচারণার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এনএসই ইমার্জে ৭০০টির বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের এ পর্যন্ত ভারতে ৯১টি এসএমই কােম্পানি পুঁজিবাজার থেকে ৫ হাজার ১৯৩ কােটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেছে। শুধু গত বছরই ভারতে ২৬৭টি কােম্পানির সংগ্রহ ১৪,৭৮৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ মূলধন। ভারতের সাফল্যের পেছনে কয়েকটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ। মূল বাজারের তুলনায় তালিকাভুক্তির শর্ত সহজ করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক মার্কেট মেকার ব্যবস্থা চালু করে শেয়ারের তারল্য নিশ্চিত রাখা হয়েছে। করপোরেট গভর্ন্যান্স ও হিসাবরক্ষণ মানোন্নয়নে বিশেষ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, এসএমই বোর্ড থেকে মূল বোর্ডে স্থানান্তরের স্পষ্ট পথ তৈরি করায় উদ্যোক্তারা এটিকে শুধু অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম নয়, বরং ব্যবসা সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি সোপান হিসেবে দেখছেন।

চীনের কৌশল
২০২১ সালে চালু হওয়া বেইজিং স্টক এক্সচেঞ্জ মূলত উদ্ভাবনী ও উচ্চপ্রযুক্তি এসএমই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। ২০২৫ সালের মধ্যে এ বাজারে ২৭৪টির বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই এসএমই। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য ৯২২ বিলিয়ন ইউয়ান, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫ লাখ কোটি টাকার সমান।
চীনের সাফল্যের মূল রহস্য শুধু আলাদা বাজার তৈরি নয়। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং উন্নয়ন ব্যাংককে একসঙ্গে কাজ করানো হয়েছে। অনেক প্রদেশে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি ব্যয়ের অংশ সরকার বহন করে। উদ্ভাবনী কোম্পানিকে কর সুবিধা, গবেষণা ও উন্নয়ন ভর্তুকি এবং বিশেষ ঋণ সুবিধাও দেওয়া হয়। বেইজিং ইকুইটি ট্রেডিং সেন্টারের বিশেষায়িত এসএমই বোর্ডে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এক হাজার কোম্পানি যুক্ত হয়েছে এবং তারা ৪০ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি মূলধন সংগ্রহ করেছে।

মালয়েশিয়ায় সহজ প্রবেশ পথ
মালয়েশিয়ার স্টক এক্সচেঞ্জ বুরসা মালয়েশিয়া ২০১৭ সালে ‘লিপ মার্কেট’ চালু করে দ্রুত বর্ধনশীল ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিকল্প বাজার গড়ে তোলে। এখানে অনুমোদিত উপদেষ্টা ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির পুরো প্রক্রিয়ায় হাতে-কলমে সহায়তা দেওয়া হয়। প্রচলিত আইপিওর মতো জটিলতা না থাকায় ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে প্রবেশে আগ্রহী হচ্ছে এবং ধারাবাহিকভাবে নতুন কোম্পানি যুক্ত হচ্ছে।

কী করলে বদলাবে দেশের চিত্র
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে এসএমই প্ল্যাটফর্মকে কার্যকর করতে হলে বেশ কিছু নীতিগত পরিবর্তন এখনই জরুরি। প্রথমত–তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য নির্দিষ্ট সময়ের কর সুবিধা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত–তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি ব্যয়ের একটি অংশ সরকার বা বিশেষ তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া মার্কেট মেকার ব্যবস্থা চালু করে শেয়ারের তারল্য নিশ্চিত করা এবং এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ক্রয়, রপ্তানি সহায়তা ও স্বল্পসুদে ঋণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে নিয়মিত উদ্যোক্তা রোডশো ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী মনে করেন, যাদের অন্তত পাঁচ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন আছে তারা পুঁজিবাজারে আসার সক্ষমতা রাখেন। ফাউন্ডেশন ইতোমধ্যে বিএসইসির সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করেছে এবং কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তাঁর মতে, মানসিকতার পরিবর্তন এবং যথাযথ নীতিসহায়তা পেলে এসএমই খাতই হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিরৃ মূল চালিকাশক্তি।

আরও পড়ুন

×