ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

অভিমত

প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ও দ্রুত ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন

প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তারা  সহজ শর্তে ও দ্রুত ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন
×

শেখ নুর আলম

শেখ নুর আলম

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই) খাত এক অনিবার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ খাতের অবদান গভীর ও বহুমাত্রিক। বিশেষত সাম্প্রতিক সময়ে জামানতবিহীন ঋণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার সমন্বয়ে এই খাত একটি নতুন গতিশীলতা অর্জন করেছে, যা অর্থনীতির অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে নতুন ভিত্তি প্রদান করছে।
এক সময় প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তি ছিল মূলত জামানতনির্ভর। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঋণব্যবস্থার বাইরে থেকে যেতেন। ব্যবসার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পুঁজি সংকটে অনেক উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যেত কিংবা সীমিত পরিসরে আটকে থাকত। বর্তমানে পরিস্থিতি দৃশ্যত পরিবর্তিত হয়েছে। শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা উদ্যোক্তারা এখন তুলনামূলক সহজ শর্তে এবং দ্রুততার সঙ্গে ঋণসুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে জামানতবিহীন বা ক্যাশ ফ্লোভিত্তিক অর্থায়ন পদ্ধতির প্রসার।
বর্তমানে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দুই কোটি টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের অর্থায়ন সুবিধা যেমন–ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল, ফিক্সড অ্যাসেট ফাইন্যান্সিং, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের জন্য কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করছে। এই অর্থায়নের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এতে সম্পদের পরিবর্তে ব্যবসার বাস্তব নগদপ্রবাহ, লেনদেনের ধারাবাহিকতা এবং বাজার সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা হয়। ফলে অর্থায়ন আরও বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ডিউ ডিলিজেন্স বা যথাযথ যাচাই-বাছাই একটি কাঠামোগত রূপ পেয়েছে। উদ্যোক্তার ব্যবসার প্রকৃতি, বাজার অবস্থান, বিক্রয় প্রবাহ, আর্থিক শৃঙ্খলা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, ইতোপূর্বে নেওয়া ঋণ ব্যবহারের সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয়েছে এবং বাস্তবতার নিরিখে দেখা যাচ্ছে এ খাতে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ সঠিক মূল্যায়ন ও নিবিড় তদারকির মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণও একটি টেকসই অর্থায়ন মডেলে পরিণত হতে পারে–বাংলাদেশ তার একটি বাস্তব উদাহরণ।
নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সম্পদের মালিকানা না থাকা সত্ত্বেও তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ নীতিমালা, কম সুদের ঋণসুবিধা এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধে প্রণোদনা চালু করেছে। এর ফলে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং সামাজিক কাঠামোতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।
তবে এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন আরও উন্নত করতে হবে, যাতে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়।

শেখ নুর আলম : অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড হেড অব এস বিজনেস অ্যান্ড রিফাইন্যান্স, প্রাইম ব্যাংক
 

আরও পড়ুন

×