ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি

মাসের প্রথম ৯ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়েছে ৭ গুণ

জুনের ৩০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২২, জুলাইয়ের ৯ দিনেই ১০৮ জন

মাসের প্রথম ৯ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়েছে ৭ গুণ
×

ফাইল ফটো

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০২ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। গত জুন মাসের প্রথম ৯ দিন এডিস মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৭ জন। কিন্তু চলতি জুলাই মাসের প্রথম ৯ দিনে রেকর্ড ১০৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে; যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই হিসাবে আক্রান্তের হার বেড়েছে প্রায় সাত গুণ। এর মধ্যে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় নাকাল চট্টগ্রাম নগরবাসী। বিভিন্ন এলাকা ডুবে আছে। এতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, বৃষ্টি ডেঙ্গু বিস্তারে অত্যন্ত সহায়ক। ঘরের চারপাশের পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, ফুলের টবে জমা স্বচ্ছ পানি মশার বংশ বৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। কয়েক দিন ধরে চলমান বৃষ্টির মধ্যে অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ। এ জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদারের তাগিদ স্বাস্থ্য প্রশাসনের। 

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মাসের ৯ দিনে রেকর্ড ১০৮ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। অথচ জুন মাসের ৩০ দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২২। এর আগের পাঁচ মাসে আক্রান্তের হার ছিল আরও কম। এর মধ্যে মে মাসে ৩৭ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মার্চে ২০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন এবং জানুয়ারিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৬৮ জন। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৪০৬ জন। মারা গেছেন একজন। হাসপাতালে ভর্তি অর্ধশতাধিক।

নগরীর শমসেরপাড়ার বাসিন্দা আকলিমা হক বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দি। ঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় অনেক জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। চারপাশে কেবল পানি আর পানি। সঙ্গে আছে ময়লা-আবর্জনা। এ কারণে মশার অত্যাচার বেড়েছে কয়েক গুণ।’

মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা বর্ণ চৌধুরী বলেন, ‘বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় সীমাহীন কষ্টে দিন কাটছে। কষ্ট আরও বাড়িয়ে তুলেছে মশা। এতে বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অশোক সাহা বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীজুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রশাসনের অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা, অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। এখন ডেঙ্গুর মৌসুম হওয়ায় জমে থাকা পানি ও জলাবদ্ধতায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জুন থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেড়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কারণ, চট্টগ্রামে টানা কয়েক দিন ধরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় এখনও জমে আছে পানি। সঙ্গে আছে ময়লা-আবর্জনা। এসব কারণে মশার অত্যাচার বেড়েছে। বৃষ্টি পুরোপুরি থামার পর আক্রান্তের হার আরও বাড়তে পারে। বিষয়টি উদ্বেগের।

তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি যাতে জমে না থাকে ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করতে সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করতে হবে।

সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সরফুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে করপোরেশনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চলমান। পাশাপাশি ৪১টি ওয়ার্ডেই মশক নিধনের জন্য লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড ছিটানো হচ্ছে। কোথাও যাতে পানি, আবর্জনা জমে না থাকে, সেটিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করা হচ্ছে। মেয়র প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছেন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও জরুরি।’

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, বাসাবাড়ির ছাদের কোনা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক, ড্রাম ও খাল-নালায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশা সহজেই লার্ভা ছাড়ে। এ ছাড়া নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত ভবনের ছাদও এডিস মশার নিরাপদ প্রজননস্থল। এসব জায়গায় টানা কয়েক দিন ধরে জমে থাকা পানি, ময়লা-আবর্জনা মশার বিস্তারেও সহায়ক। এর প্রমাণও মিলেছে একাধিক গবেষণা ও জরিপে। তাই ঘরের ভেতরে-বাইরে বা আশপাশে যাতে কয়েক দিন ধরে পানি জমে না থাকে, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

নগরবাসীর উদ্দেশে সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। দিনে বা রাতের বেলা যখনই বিছানায় যাবেন, তখন অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। জ্বর হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন। বিশেষ করে এই মৌসুমে জ্বর হলে অবশ্যই ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষাগুলো সরকার বিনামূল্যে বিভিন্ন হাসপাতালে করার ব্যবস্থা করেছে। 

আরও পড়ুন

×