জাহাজ ভাঙা শিল্পে বাড়বে নিরাপত্তা ও নজরদারি
বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (সংশোধিত) আইন, ২০২৬-এর খসড়া চূড়ান্ত
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (শিপ রিসাইক্লিং) শিল্পকে ঢেলে সাজাতে ২০১৮ সালের আইন পুনর্গঠন করছে সরকার। সংশোধিত আইনের খসড়ায় শ্রমিকের জীবন বীমা, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, কেন্দ্রীয় শ্রমিক ডেটাবেজ, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ট্রিটমেন্ট স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি (টিএসডিএফ), নতুন ধরনের অনুমোদন ও অনাপত্তি সনদ এবং জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ডের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া আইনে অনুমতি ছাড়া ইয়ার্ড স্থাপন, অনাপত্তি সনদ (এনওসি) ছাড়া জাহাজ আমদানি, ছাড়পত্র ছাড়া পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিলের মতো কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ (সংশোধিত) আইন, ২০২৬-এর খসড়া চূড়ান্ত করে অংশীজনের মতামত চেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম বড় জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক মান ঠিকভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অনেকে অভিযোগ করে থাকেন। সংশোধিত আইনের খসড়ায় এসব দুর্বলতা দূর করে শিল্পটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার চিন্তা প্রতিফলিত হয়েছে। সংশোধিত আইনের খসড়াটিতে ২০১৮ সালের আইনের কাঠামো পুনর্গঠন করে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) ২০০৯ সালের হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বাসেল কনভেনশনের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
খসড়া আইন অনুযায়ী, তিনটি জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ইয়ার্ডকে বাধ্যতামূলকভাবে ডকুমেন্ট অব অথরাইজেশন টু কনডাক্ট শিপ রিসাইক্লিং (ডিএএসআর) সনদ নিতে হবে। পাশাপাশি জাহাজ আমদানির আগে বোর্ড থেকে অনাপত্তি সনদ (এনওসি) সংগ্রহ এবং সৈকতায়ন (বিচিং) ও জাহাজ বিভাজনের জন্য পৃথক ছাড়পত্র নেওয়াও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতেই এসব নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনগুলোর একটি হলো ট্রিটমেন্ট স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি (টিএসডিএফ)। জাহাজ ভাঙা থেকে উৎপন্ন সব ধরনের বিপজ্জনক বর্জ্য এই বিশেষ স্থাপনার মাধ্যমে সংরক্ষণ, পরিশোধন ও অপসারণ করতে হবে। সরকার এই অবকাঠামো নির্মাণ করবে এবং প্রতিটি ইয়ার্ডের জন্য এটি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে।
সংশোধিত আইনের খসড়ায় শ্রমিক নিরাপত্তার বিষয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া যাবে না। সরকার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে এবং বোর্ড প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ সংরক্ষণ করবে। ইয়ার্ড মালিকদের সেই ডেটাবেজ থেকেই শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে। প্রতিটি শ্রমিকের জীবন বীমা বাধ্যতামূলক হবে।
নতুন আইনের খসড়ায় জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড বিষয়ে বলা হয়, শিল্প সচিবের নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদে পরিবেশ, শ্রম, নৌপরিবহন, রাজস্ব, নৌবাহিনী, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিত্ব থাকবে। বোর্ডকে ইয়ার্ড ও জাহাজে প্রবেশ, নথিপত্র পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ, তথ্য চাওয়া এবং তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে লিখিত কারণ উল্লেখ করে নোটিশ ছাড়াই কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত বা বাতিল করার নতুন বিধানও সংযোজন করা হয়েছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাস্তির বিধানও আরও কঠোর করার প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধিত আইনের খসড়ায়। এতে বলা হয়, সরকারের অনুমতি ছাড়া ইয়ার্ড স্থাপন করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। অনাপত্তি সনদ ছাড়া জাহাজ আমদানি করলে আমদানিকারককে নিজ খরচে জাহাজটি রপ্তানিকারকের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে। অনুমোদন ছাড়া জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, নিরাপত্তা পরিকল্পনা লঙ্ঘনে জরিমানা ও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। জাল কাগজপত্র দিলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে এ ক্ষেত্রে শুধু অর্থদণ্ডের বিধান ছিল। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে আগের শাস্তির দ্বিগুণ দণ্ড দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে নতুন খসড়া আইনে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আমরা খসড়া আইনের কপি হাতে পেয়েছি। খসড়া আইনটি ভালোভাবে পর্যালোচনা করার পর গুরুত্বপূর্ণ যেসব বিষয়ে সংশোধন কিংবা সংযোজন করা দরকার, সেসব বিষয়ে আমরা মতামত দেব। তবে এ খাতের সংশ্লিষ্টরা ব্যবসাবান্ধব পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।’
- বিষয় :
- জাহাজ