ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হঠাৎ কেন এত ছেঁড়া-ফাটা ছোট নোট

হঠাৎ কেন এত ছেঁড়া-ফাটা ছোট নোট
×

ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আপনি হয়তো দোকানির থেকে সদাই কিনে ১০০ টাকার নোট দিলেন। দোকানদার আপনাকে ১০ বা ২০ টাকা ফেরত দিলেন। তবে নোটটি হয়তো এত ছেঁড়া-ফাটা বা দুর্বল, যা আপনি নিতে চাচ্ছেন না। তবে তাঁর কাছেও এর চেয়ে ভালো নোট না থাকায় একপ্রকার নিরুপায় হয়েই নিলেন। আপনি আবার আরেকজনকে সেই নোট দিলেন। এভাবে প্রতিনিয়ত ৫, ১০ ও ২০ টাকার এমন অনেক নোট হয়তো আপনার হাতে আসছে, যা প্রায় অচল। এসব নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক মাঝেমধ্যে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করলেও কোনো সমাধান মিলছে না। 

নতুন টাকা ছাপানো একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। এই টাকা যে কেবল নতুন নোট ইস্যুর বিপরীতে ছাপানো হয় তেমনটি নয়। বরং পুরোনো নোটের বদলে নতুন টাকা বাজারে ছাড়া হয়। নিয়ম হলো, ছেঁড়া-ফাটা, ক্রটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট ব্যাংকগুলোর কাছে এলে নতুন করে তা আর বাজারে দেবে না। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফেরত দিয়ে সমমূল্যের ফ্রেশ নোট নিয়ে আসবে। এভাবে বাজারে ভালো নোটের প্রচলন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক গত নভেম্বর মাসে ‘ক্লিন নোট পলিসি’ করেছে। এর আগেও বিভিন্ন 
সময়ে ক্রটিযুক্ত নোট বদলে দেওয়ার বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে ব্যাংকগুলোতে নানা অজুহাতে বদলে না দেওয়ার ঘটনা সবার জানা। এবার হঠাৎ করে এত ত্রুটিযুক্ত নোট পাওয়ার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছোট নোট সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সব মূল্যমানের নোটে বঙ্গবন্ধুর ছবি থাকায় ডিজাইন বদলের একটি চাপ তৈরি হয়। নতুন ডিজাইনের নোট বাজারে আনতে দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সাধারণত একটি একটি করে নোটের ডিজাইন বদল করা হয়। তবে এবারের বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এক যোগে সব মূল্যমানের নতুন ডিজাইনের নোট বাজারে আনার চেষ্টা করা হয়। তখন সামগ্রিকভাবে বাজারে যেন নগদ টাকার সংকট না দেখা দেয়, সেজন্য মূল্যমান বিবেচনায় ছোট নোটের তুলনায় ১০০, ৫০০ ও ১০০০ হাজার টাকার নোট ছাপানোয় অগ্রাধিকার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ছোট নোট ছাপানো শুরু হয় দেরিতে। এতে করে কম মূল্যমানের নোটের সরবরাহ ঘাটতি হয়ে ছেঁড়া-ফাটা, ক্রটিপূর্ণ নোট প্রতিস্থাপিত হতে দেরি হচ্ছে। অবশ্য পর্যাপ্ত ছোট নোট ছাপানোর কাজ চলমান আছে।

কম মূল্যমানের এত ছেঁড়া-ফাটা নোট বেশি পাওয়ার আরেকটি কারণ, ব্যাংকগুলো সাধারণত ছোট নোট নিতে অনীহা দেখায়। বিশেষ করে গণনার ঝামেলা কিংবা ভল্টে রাখতে যেন বাড়তি জায়গা না লাগে, সেজন্য ব্যাংকের কর্মকর্তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটে লেনদেনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। গ্রাহকরাও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বড় নোট দিয়ে শাখার সঙ্গে লেনদেন করেন। যে কোনো মূল্যমানের ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে শাখায় গেলে তা বদলে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কীভাবে নোট বদলাতে হবে তার একটি নীতিমালা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংক গ্রাহককে বদলে দেবে। আর ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বদলে নিয়ে আসবে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পরিপালন করে না ব্যাংক। নানা অজুহাতে গ্রাহককে ফেরত দেওয়া হয়। ছোট নোটের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর এই অনীহা আরও বেশি। গ্রাহক অনেক জোরাজুরি করলে বলা হয়–ছেঁড়া নোটটি রেখে যান, বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে। সেখান থেকে বদলে দিলে পরে এসে নিয়ে যাবেন। 
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সাধারণ গ্রাহকরা নোট বদলে নেওয়ার সুযোগ ছিল। তবে গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শাখা থেকে এ ধরনের নোট বদলানোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছেঁড়া-ফাটা নোটের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র ও প্রাইজবন্ড বিক্রি এবং অটোমেটেড চালানসহ গ্রাহকের সঙ্গে কাউন্টার থেকে সরাসরি সব ধরনের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। একযোগে মতিঝিলসহ সব অফিস থেকে এসব সেবা বন্ধ করা হয়। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্বিঘ্নে এ রকম সেবা দিতে বলা হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা পরিপালন না হওয়ার বিষয়টি খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকই তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১২ এপ্রিল এক নির্দেশনায় বলেছে, জনসাধারণের স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু নগদ লেনদেন অব্যাহত রাখার স্বার্থে ব্যাংকের সব শাখা থেকে বিধি অনুযায়ী ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট সংক্রান্ত সেবা নিয়মিতভাবে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও বাজারে ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোটের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচ্ছন্ন নোট নীতিমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনসাধারণ থেকে বিভিন্ন মূল্যমানের ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট বিশেষ করে ছোট মূল্যমানের ৫, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট নিয়মিতভাবে বিশেষ কাউন্টারে গ্রহণপূর্বক ফ্রেশ বা পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোটের মাধ্যমে বিনিময়মূল্য দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সেবা দিতে কোনো ব্যাংক শাখার অনীহা পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আরও পড়ুন

×