ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাণিজ্যে এখনও বড় বাধা অদৃশ্য নিয়ম-কানুন

আঙ্কটাডের প্রতিবেদন

বাণিজ্যে এখনও বড় বাধা  অদৃশ্য নিয়ম-কানুন
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক বা ট্যারিফ বাড়লেও রপ্তানি ব্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে এখনও নন-ট্যারিফ ব্যবস্থা বা অ-শুল্ক বাধাগুলোই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। নানা ধরনের অদৃশ্য বাধা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপথ নির্ধারণ করছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের বিশ্ববাণিজ্য পরিস্থিতির ওপর মে মাসের প্রতিবেদনে এমন মত দেওয়া হয়েছে। 

সম্প্রতি প্রকাশিত গ্লোবাল ট্রেড আপডেট নামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্য এখন বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় ব্যয় তৈরি করছে অ-শুল্ক বাধা। প্রযুক্তিগত মানদণ্ড, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্ত, পরিবেশগত নিয়ম, পরীক্ষাগার সনদ এবং জটিল সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব বাধা আসছে। অ-শুল্ক বাধা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ৮৮ শতাংশ ক্ষেত্রে নন-ট্যারিফ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট ব্যয় ট্যারিফের চেয়েও বেশি। উন্নয়নশীল দেশগুলো একই সঙ্গে বাড়তি ট্যারিফ ও উচ্চতর অনুগত্য ব্যয়ের (কমপ্লায়েন্স কস্ট) মুখোমুখি হচ্ছে। শুধু স্বচ্ছতা বাড়ালেই এসব ব্যবস্থাজনিত বাণিজ্য ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ কমানো সম্ভব। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের তৈরি পোশাক খাত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু কার্বন নিঃসরণ, শ্রমমান এবং টেকসই উৎপাদন নিয়ে নতুন নতুন শর্ত সামনে আসছে। ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য এসব শর্ত পূরণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আরও বড় সমস্যা হচ্ছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। উন্নত দেশগুলোর মতো পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা বা প্রযুক্তিগত সহায়তা অনেক উন্নয়নশীল দেশে নেই। ফলে রপ্তানিকারকদের বিদেশে পরীক্ষা করাতে হয়, যা সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ায়।

গ্লোবাল ট্রেড আপডেটে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ট্যারিফ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে ঠিকই। কিন্তু গত কয়েক দশকে এগুলোই বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল না। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যয় তৈরি করছে নন-ট্যারিফ ব্যবস্থা; যেমন প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত এবং সনদপত্রের প্রক্রিয়া। এসব ব্যবস্থাই নির্ধারণ করে কে বাজারে প্রবেশ করতে পারবে এবং কোন শর্তে পারবে। অধিকাংশ দেশের জন্য এসব শর্ত পূরণের খরচ ট্যারিফের চেয়েও বেশি।
আনঙ্কাটের বিশ্লেষণ বলছে, এই চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়ছে না। উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে একই সঙ্গে উচ্চ ট্যারিফ এবং জটিল শর্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কিছু অঞ্চলে ২০২৫ সালে রপ্তানির ওপর ট্যারিফ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে মানদণ্ড পূরণের প্রক্রিয়াও আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো জি২০ বাজারে তাদের প্রায় ১০ শতাংশ রপ্তানি হারাচ্ছে, কারণ তারা এসব শর্ত পূরণ করতে পারছে না। ক্ষুদ্র রপ্তানিকারকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সীমিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং স্থানীয় পরীক্ষাগারের অভাব ব্যয় বাড়াচ্ছে ও প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সমস্যা শুধু এসব ব্যবস্থায় নয়, বরং সেগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাতেও। স্বচ্ছতার অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শর্তগুলো চিহ্নিত করা এবং তা মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অনিশ্চয়তা বিশেষ করে ছোট ব্যবসার জন্য বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করে। তথ্যে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব। বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এসব ব্যবস্থাজনিত বাণিজ্য ব্যয় প্রায় ১৯ শতাংশ কমানো যেতে পারে। কোনো শর্ত যথাযথভাবে জানানো না হলে তার ব্যয় ২৮ শতাংশ ট্যারিফের সমপর্যায়ের হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নন-ট্যারিফ ব্যবস্থার পেছনে বৈধ জনস্বার্থ রয়েছে। এগুলো নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়তা করে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত এগুলো তুলে দেওয়া নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। বেশি স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সহযোগিতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা রপ্তানিকারকদের এসব শর্ত আরও কার্যকরভাবে পূরণে সহায়তা করতে পারে। 
বিভিন্ন দেশের মানদণ্ডের সমন্বয় বা পারস্পরিক স্বীকৃতিও ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যে। এসব পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, ট্যারিফ কম থাকলেও বাস্তবে বিশ্ব বাণিজ্য আরও সীমাবদ্ধ হয়ে উঠবে।
 

আরও পড়ুন

×