একাত্তরের শরণার্থী শিবিরে বড়দিনের স্মৃতি
জুলিয়ান ফ্রান্সিস
জুলিয়ান ফ্রান্সিস
প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৮ | আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বড়দিনের আমার প্রথম স্মৃতি হলো ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিক এবং ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকের, যুক্তরাজ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর খাদ্য রেশনিং তখনও চালু ছিল। আমাদের মা বড়দিন ও জন্মদিনের জন্য মিষ্টি ও চকলেটের জন্য রেশন ভাউচার সংরক্ষণ করতেন। তাই ছোটবেলায় আমি এবং আমার ভাইবোন বড়দিনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। আমরা ঐতিহ্য মেনেই বড়দিন উদযাপন করতাম। সবাই বড়দিনের পুডিং নাড়তে সাহায্য করতাম এবং এ সমৃদ্ধ মিশ্রণ নাড়ার সময় আমাদের একটি ইচ্ছা পোষণ করার রীতি ছিল। বড়দিনের প্রায় ১০ দিন আগে আমাদের স্কুলের সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ক্রিসমাস ট্রি সাজাতাম এবং উৎসবের দিনেই আমাদের পরিবার ক্রিসমাস ট্রির চারপাশে জমে থাকা ক্রিসমাস উপহারগুলো খুলত।
সেই সময়, ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে– আমাদের নানি আমাদের সঙ্গে থাকতেন এবং তিনিই খেয়াল রাখতেন আমরা যেন বাইবেল থেকে যিশুর জন্মের বিবরণ সঠিকভাবে বুঝতে পারি। তিনি আমাদের বলতেন, একে অপরকে উপহার দেওয়ার সঙ্গে তিন রাজার যিশুকে উপহার দেওয়ার সম্পর্ক ছিল। এ রাজারা বড়দিনের ১২ দিন পর ৬ জানুয়ারি, দ্বাদশ রাত্রিতে, যিশুর কাছে পৌঁছেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
ছোটবেলায় ২৪ ডিসেম্বর রাতে খোলা অগ্নিকুণ্ডের ধারে আমি একটি বড় মোজা ঝুলিয়ে রাখতাম। আমার বোনেরা এবং আমি সান্তার জন্য একটি প্লেটে কিছু কেক, বিস্কুট এবং এক গ্লাস শেরি অথবা পোর্ট রেখে যেতাম, এ দুই মদ তাঁর ঠান্ডা শরীরকে উষ্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। আমি সান্তার বল্গাহরিণের জন্য কিছু গাজরও রেখে যেতাম। বড়দিনের দিন সকালে আমি এবং আমার বোনেরা এসে আমাদের মোজা উপহারে ভরা দেখতে পেতাম এবং সান্তা ও বল্গাহরিণ যে আশপাশে ছিল, তার একটি গল্পের চিহ্ন দেখতে পেতাম। রক্ত-উষ্ণ তরলের গ্লাসটি খালি এবং প্লেটে কেবল কিছু টুকরো অবশিষ্ট থাকত এবং গাজরটি প্রায় শেষ হয়ে যেত, কেবল চিবানো কিছু অংশ পড়ে থাকত।
তো এটুকুই বড়দিন সম্পর্কে কথা। এখানে চার্লস ডিকেন্স কীভাবে বড়দিনকে বর্ণনা করেছিলেন তা মনে করিয়ে দেওয়া যায়: তিনি বড়দিনের ছুটিকে ‘একটি ভালো সময়: একটি দয়ালু, ক্ষমাশীল, দানশীল, মনোরম সময়: বছরের দীর্ঘ ক্যালেন্ডারে আমার জানা একমাত্র সময়, যখন পুরুষ এবং মহিলারা একমত হয়ে তাদের বন্ধ হৃদয় মুক্তভাবে খুলে দেয় এবং তাদের নিচের অন্য লোকদের নিয়ে এমনভাবে চিন্তা করে যেন তারা সত্যিই কবরের সহযাত্রী এবং ভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রাকারী প্রাণীদের কোনো প্রজাতি নয়।’ আজকের বড়দিনের মূলকথা এটাই হওয়া উচিত, লোভী বাণিজ্যিকীকরণ নয়; বরং মানুষের হৃদয় এবং ঘরে স্থান পাওয়াই লক্ষ্য।
বছরের এই সময়ে আমি সব সময় ১৯৭১ সালে ভারতের শরণার্থী শিবিরে কাটানো বড়দিনের কথা মনে করি। মুসলিম ও হিন্দুরা চেয়েছিল যে যদি তাদের শিবিরে কয়েকজন খ্রিষ্টান থাকে, তবে তারা তাদের সঙ্গে বড়দিন উদযাপন করবে। সর্বোপরি তারা সবাই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদযাপন করেছিল এবং সবাই বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কেউ কেউ বলেছিল, একটি নতুন এবং ভিন্ন জীবন শুরু হতে চলেছে। ২০২৬ সালে কি বাংলাদেশেও একই মনোভাব অনুভূত হতে পারে? আমি তেমনটাই আশা করি।
পরিশেষে এটা বলা যেতে পারে, গাজা ও সুদানের মতো দেশগুলোতে যে নিরবচ্ছিন্ন গণহত্যা চলছে, তাতে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ আতঙ্কিত। ইউক্রেনে বেসামরিক মৃত্যু এড়াতে এটা বোঝা যায়, গাইডেড বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, যার নির্ভুলতা তিন ফুট। তবে গাজার জন্য এমনকি ভিয়েতনাম যুগের আনগাইডেড বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যহীন বোমাও ৩০ ফুট নির্ভুলতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। এটি দেখায় যে ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য অনেক দেশ কেউই বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনির মৃত্যুর বিষয়ে চিন্তা করে না। এই রক্তপিপাসু উন্মাদনার অবসান ঘটাতে এই বড়দিনে কিছু অলৌকিক প্রার্থনার প্রয়োজন। আর যিশু খ্রিষ্টের জন্ম উদযাপনের সময় ‘পবিত্র ভূমি’তে এটি ঘটছে। কেউ কি বেথলেহেম পরিদর্শন করতে পারবে?
জুলিয়ান ফ্রান্সিস: ‘মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু’ খেতাবপ্রাপ্ত ব্রিটিশ উন্নয়নকর্মী
- বিষয় :
- বড়দিন
- জুলিয়ান ফ্রান্সিস
- শরণার্থী শিবির
