কর্মসংস্থানের বড় শক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো, ছোট ও মাঝারিশিল্প খাত (এমএসএমই)। সংখ্যার হিসাবে অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই এমএসএমই, যেখানে প্রায় তিন কোটি ছয় লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এখনও অনানুষ্ঠানিক। কর্মসংস্থানের দিক থেকে এমএসএমই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলেও শিল্পায়নের দিক থেকে এর কাঠামোগত অনেক দুর্বলতা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের মতে, দেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের ভিত্তি বড় শিল্প নয়, বরং লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তবে আনুষ্ঠানিকীকরণ, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, অর্থায়ন, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করতে পারলে এমএসএমই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার দেশে আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস পালিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘উদ্ভাবন ও টেকসই শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে এমএসএমইর ক্ষমতায়ন’। দিবসটি উপলক্ষে এক বার্তায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, বিশ্বজুড়ে এমএসএমই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবার ও সম্প্রদায়কে টিকিয়ে রাখা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যুবকদের কর্মসংস্থানেরও সবচেয়ে বড় খাত এটি।
জাতিসংঘ মহাসচিব তাঁর বাণীতে বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারণে অর্থায়ন সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে ব্যবসায়িক মডেলের পরিবর্তন, উচ্চ শুল্ক ও মূল্যস্ফীতি এমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং উৎপাদন ও ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রপ্তানি বাজারের বহুমুখীকরণ, নতুন কাঁচামালের উৎস খোঁজা এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী সমকালকে বলেন, নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। প্রায় ৭০ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তা ঢাকার বাইরে অবস্থান করলেও সেবা, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের কেন্দ্রীয় কাঠামো এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে উদ্যোক্তাদের বড় অংশ রাষ্ট্রীয় সহায়তার বাইরে রয়ে গেছেন। তিনি বলেন, এসএমইকে শক্তিশালী করতে নিয়মিত বাজেট সহায়তা, সহজ অর্থায়ন ও বিকেন্দ্রীভূত সেবা কাঠামো গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ সমকালকে বলেন, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আলাদা নীতিমালা দরকার। বেশির ভাগ সুবিধা পাচ্ছে মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তিনি বলেন, ছোটদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি মনোযোগী হতে হবে। বিভিন্ন মেলায় নামমাত্র ভাড়ায় উদ্যোক্তার পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
এক দশকে যা পরিবর্তন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে অর্থনৈতিক ইউনিট ছিল ৭৮ লাখ ২০ হাজার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ১৭ লাখে। এর প্রায় সবই এমএসএমই
খাতের। এক দশকে ইউনিট বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। এ সময় কর্মসংস্থান দুই কোটি ৪৫ লাখ থেকে বেড়ে তিন কোটি ছয় লাখ হয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৬১ লাখ।
মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে মাইক্রো, কুটির, ছোট ও মাঝারিশিল্প খাতের প্রতিষ্ঠান রয়েছে এক কোটি ১৭ লাখের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে তিন কোটি ৬৩ লাখের বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান মাত্র ৯ হাজার ২৮৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান প্রায় ৬৮ লাখ মানুষের।
উদ্বেগের বিষয় হলো, ৬৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান অনানুষ্ঠানিক। মাত্র ২৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় রয়েছে। বাকি অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে নিবন্ধন বা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে, যা দেশের অর্থনীতির বড় একটি দুর্বলতা। কারণ অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ আয়কর, ভ্যাট, শ্রম আইন, হিসাবরক্ষণ কিংবা ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নিজস্ব পুঁজি বা অনানুষ্ঠানিক উৎসের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে না, প্রযুক্তি ব্যবহার কম থাকে এবং ব্যবসাও ঝুঁকিতে থাকে।
বিবিএসের তথ্যমতে, এক দশক আগে শিল্প খাতে অর্থনৈতিক ইউনিটের অংশ ছিল ১১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে সেবা খাতের অংশ ৮৮ দশমিক ৪৬ থেকে বেড়ে ৯০ দশমিক শূন্য দুই শতাংশ হয়েছে। এমএসএমইভিত্তিক উৎপাদন খাতের অবদান ১২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে।
১০-১২ বছর আগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৭১ দশমিক ৪৮ শতাংশই ছিল গ্রামে। বর্তমানে তা ৬৩ দশমিক ১১ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে ২৮ দশমিক ৫২ থেকে বেড়ে ৩৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে শহরাঞ্চলে এমএসএমই প্রতিষ্ঠান ৪৩ লাখ ১৭ হাজার আর গ্রামাঞ্চলে রয়েছে ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার। গ্রামে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি মনে হলেও বাস্তবে শহরমুখী প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে নারী নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হার মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৩ সালে এই হার ছিল ৭ দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ এক দশকে নারী উদ্যোক্তার অংশ কিছুটা কমেছে।
এ ছাড়া দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ২৭ দশমিক ১ শতাংশ ঢাকা বিভাগে। সবচেয়ে কম সিলেটে; মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এই বৈষম্য আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে ১৭৭টি এমএসএমই ক্লাস্টার রয়েছে; যেখানে প্রায় ৬০ হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বার্ষিক লেনদেন ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতি ক্লাস্টারে গড়ে ৩৯৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৫৯টি ক্লাস্টার থাকলেও সিলেটে মাত্র সাতটি।
- বিষয় :
- অর্থনীতি
