ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে পারছি

প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে পারছি
×

সৈয়দ আব্দুল মোমেন

সৈয়দ আব্দুল মোমেন এএমডি, ব্র্যাক ব্যাংক

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৮:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল: সিএমএসএমই খাতে ব্র্যাক ব্যাংক কতটা সাফল্য অর্জন করেছে? 

সৈয়দ আব্দুল মোমেন: আমাদের দূরদর্শী প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে থাকা ‘মিসিং মিডল’ বা মাঝারি স্তরের বঞ্চিত উদ্যোক্তাদের কাছে এই সেবা নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সেই চিন্তার ধারাবাহিকতা থেকেই ২০০১ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের জন্ম। যাত্রার শুরু থেকে বাংলাদেশে এসএমই ব্যাংকিংয়ের প্রবর্তক হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় সহজে ঋণ পাওয়া নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
দীর্ঘ ২৫ বছরের যাত্রায় ব্র্যাক ব্যাংক এখন কুটির, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে (সিএমএসএমই) বাংলাদেশের বৃহত্তম মর্টগেজবিহীন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান। এখন পর্যন্ত আমরা ২০ লাখের বেশি গ্রাহককে ২ লাখ কোটি টাকা সিএমএসএমই ঋণ দিয়েছি। এসব ঋণের ৮৫ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে কোনো মর্টগেজ নেওয়া হয়নি। এভাবেই আমরা ২০ লাখ পরিবারের কোটি মানুষের জীবন স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছি, যা আমাদের কাছে সাধারণ ব্যাংকিংয়ের চেয়েও বড় কিছু। আমরা দেশের প্রতিটি তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোক্তার পরিপূর্ণ ব্যাংকিং ও আর্থিক অংশীদার হতে চাই।
সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের বাইরে গিয়ে আমরা নানামুখী সেবা দিয়ে থাকি। ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নেটওয়ার্কিং ও বাজারে প্রবেশের সুবিধা দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়াও ‘উদ্যোক্তা ১০১’ এবং ‘আমরাই তারা’ এর মতো দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সাফল্য পেতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি আমরা উদ্ভাবনী ডিজিটাল লোন প্রোডাক্ট যেমন সাফল্য’, ‘জীবিকা’ এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্সকে উৎসাহিত করতে ‘স্বাবলম্বী’ চালু করেছি।

দেশের সব ব্যাংকের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও পুরো দেশের সব সিএমএসএমই উদ্যোক্তাকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলের আওতায় নিয়ে আসতে আমাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। কারণ আমাদের দেশে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বিশাল। অবশ্য আমাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং অ্যাপ ‘আস্থা’, স্বয়ংক্রিয় লোন অরিজিনেশন সিস্টেম ‘ই-ল্যাপ’, এসএমই ট্রানজ্যাকশন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম বিজ-পে এবং ডিজিটাল লোনসহ উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ করার কারণে আমরা এখন অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের কাছে আরও দ্রুত পৌঁছাতে পারছি।
ব্র্যাক ব্যাংকের সিএমএসএমই গ্রাহকরা ডিজিটাল সলিউশনের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দ্রুত, সাশ্রয়ী ও আরও সহজে পাচ্ছেন। এ ছাড়াও এসএমই খাতের উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত, আধুনিকায়ন ও উদ্যোক্তা বিকাশের লক্ষ্যে দেশের সর্বপ্রথম ব্যাংক হিসেবে সম্প্রতি ‘এসএমই ইনোভেশন ল্যাব” চালু করেছে ব্র্যাক ব্যাংক।

সমকাল: আগামী পাঁচ বছরে এসএমই ব্যবসা নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

সৈয়দ আব্দুল মোমেন: দেশের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাংক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক। এই পথে আমাদের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এসএমই ব্যাংকিং। বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৪৭ শতাংশই এসএমই খাতে। গত কয়েক বছরে এই এসএমই খাত প্রায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
ব্র্যাক ব্যাংক সবসময় তৃণমূল পর্যায়ের সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের সহজে অর্থায়নের সুযোগ দিতে চায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে আমাদের এসএমই ঋণ পোর্টফোলিও ৩৪ হাজার ৯১১ কোটি টাকা ও আমানত পোর্টফোলিও ১৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১৪ ও ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। দেশের চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আমাদের এই অর্জন। আমরা আগামী বছরগুলোতেও এ ধরনের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে চাই। বর্তমানে দেশে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট এসএমই অর্থায়নের ২২ শতাংশই আমাদের।

সমকাল: এসএমই ডিজিটালাইজেশন বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

সৈয়দ আব্দুল মোমেন: দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল রূপান্তর মূলত রিটেইল ও কর্পোরেট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তবে এসএমই খাতকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ব্র্যাক ব্যাংক প্রথমবারের মতো এসএমই খাতেও ডিজিটাইজেশন নিয়ে এসেছে। ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ করতে চালু হয়েছে ডিজিটাল অনবোর্ডিং। গত এক বছরে ৫০ হাজার এসএমই উদ্যোক্তার অ্যাকাউন্ট ডিজিটালি খোলা হয়েছে। উদ্যোক্তারা এখন আস্থা অ্যাপ ব্যবহার করেই তাদের লেনদেন সম্পন্ন করছেন, যেখানে মোট লেনদেনের ৬৫ শতাংশেরও বেশি এসএমই গ্রাহকরা করেন। পাশাপাশি বিজপে ট্রানজ্যাকশন ব্যাংকিং সল্যুশন চালু হয়েছে, যা বাল্ক পেমেন্ট, ই-চালান, ইউটিলিটি বিল, এক ক্লিকে বেতন প্রদান এবং বৃহৎ অঙ্কের লেনদেনকে আরও সহজ করেছে।

এসএমই ব্যাংকিংয়ের বিকাশে উন্নত প্রযুক্তি অপরিহার্য। ব্র্যাক ব্যাংক ইতোমধ্যেই ই-ল্যাপ সিস্টেমের মাধ্যমে ডিজিটাল এসএমই ঋণ প্রক্রিয়াকরণ চালু করেছে, যা ঋণের আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে, উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে এবং ঋণ পাওয়ার সময় কমিয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য চালু হয়েছে দেশের প্রথম ডকুমেন্ট-লেস রিয়েল-টাইম ডিজিটাল এসএমই ই-ঋণ ‘সাফল্য’ এবং ‘জীবিকা’। এর ফলে অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন, যা আগে সম্ভব ছিল না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলা কিউআর সেবা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের কাজ চলছে, যাতে সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা সহজে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারেন। একইসঙ্গে বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের ক্যাশ ক্রাঞ্চ সমস্যা সমাধানে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং প্রোডাক্ট আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের লক্ষ্য স্পষ্ট। আমরা ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে প্রোডাক্ট ও প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনী সল্যুশন এবং সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিংয়ের উন্নয়ন করতে চাই। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসাকে আরও টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা হবে।

সমকাল: গত এক বছরে আপনারা কি নতুন কোনো প্রোডাক্ট নিয়ে এসেছেন? 

সৈয়দ আব্দুল মোমেন: বিগত এক বছরে এসএমই ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে আমরা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের ডিজিটাল লোন প্রোগ্রাম ইতোমধ্যেই ২৩ হাজারেরও বেশি ব্যাংকবহির্ভূত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে কাগজবিহীন ই-ঋণ ও জীবিকা ঋণ প্রদান করেছে।
নৌপথ পরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে চালু হয়েছে বিশেষ ঋণ প্রোডাক্ট ‘তরঙ্গ’, যা ভেসেল ফাইন্যান্সিংকে ত্বরান্বিত করে দেশের সাপ্লাই চেইনকে আরও সুসংহত করছে। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের ধারাবাহিকতায় এসেছে ‘স্বাবলম্বী’, যা রেমিট্যান্সভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য রিয়েল-টাইম ঋণ সুবিধা। পাশাপাশি কুটির ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল কালেকশন ও কিউআর কোড পেমেন্ট সুবিধা সম্প্রসারিত হয়েছে। আমরা চালু করেছি ডিজিটাল অনবোর্ডিং, যা এসএমই অ্যাকাউন্ট খোলাকে দ্রুত ও সহজ করেছে। এ ছাড়া বিজপে ট্রানজ্যাকশন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম এসএমই লেনদেনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

আগামী পাঁচ বছরে আমাদের লক্ষ্য আরও বড়। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ডেটা-ভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিংয়ের মাধ্যমে এসএমই ব্যবসায় রূপান্তরে যেতে চাই। উদ্যোক্তাদের ক্যাশ-ফ্লো ও ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে মুহূর্তেই ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণ সম্ভব হবে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি গ্রিন ফিন্যান্সিং, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আধুনিক ‘তারা’ পোর্টফোলিও এবং দেশের প্রথম এসএমই ইনোভেশন ল্যাবের মাধ্যমে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিংয়ে নতুন ডিজিটাল সমাধান নিয়ে। 

আরও পড়ুন

×