ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

রাজপথের সেই বীরেরা অগোচরে

রাজপথের সেই বীরেরা অগোচরে
×

 দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ১২:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত ও ভয়াল দিনগুলো পেরিয়ে আসে চূড়ান্ত বিজয়। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। তবে সেই বিজয়ের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অধরা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তেমনি সবার অগোচরে রাজপথের সেই বীরেরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি এবং বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন তারা। 

মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি
জাতীয় প্রেস ক্লাব ও জিরো পয়েন্টে আন্দোলনে শামিল হওয়া সাধারণ রিকশাচালক সুজন মিয়া সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিগত ১৭ বছরের অত্যাচার ও অন্যায় যখন চোখের সামনে দেখছিলাম, নিজের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠছিল। আমরা তো ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু এই ছাত্র-জনতার ভেতরেই সেই মুক্তির রূপ দেখতে পাচ্ছিলাম। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া, সাধারণ মানুষ হিসেবে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তবে দুই বছর পর আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি জানান, আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় গেজেটে তাঁর নাম ওঠেনি। উল্টো নিরাপত্তার হুমকিতে মুক্তভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে না পেরে বর্তমানে আত্মগোপনে সামান্য শ্রমিকের কাজ করে দিন যাপন করছেন। গুলিবিদ্ধ সহযোদ্ধা নাফিজকে নিজের রিকশায় ঢলে পড়ার আগ পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া বীর রিকশাচালক নূরু মিয়া বলেন, দুই বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু আমাদের মতো খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। 

বিচারের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই
৩১ জুলাইয়ের ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ও ১৯ জুলাইয়ের ভয়াল স্মৃতি স্মরণ করে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নূর আলম হাসান বলেন, ১৯ জুলাই যখন বাসা থেকে বের হই, মনে হচ্ছিল কাফনের কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে বের হচ্ছি। শান্তিনগর, মগবাজার, কাকরাইল– সব জায়গায় ছিল টিয়ার শেলের গ্যাস ও তাজা গুলি। তবে সেদিনের ভয়াবহ পরিবেশেও তরুণীদের সাহসিকতা ছিল অবিস্মরণীয়। তারা কার্ডবোর্ড দিয়ে বুক ঢেকে গুলির মুখে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভেবেছিলাম নতুন সরকার জনগণের সব প্রত্যাশা পূরণ করবে। কিন্তু ‘জুলাই সনদ’ বা শহীদদের বিচারের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনও নেই। 

মহান অর্জনকে কুক্ষিগত করার প্রতিযোগিতা
আন্দোলনে হলের তালা ভাঙা ও পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি সংগ্রামের কথা জানান ক্যামেলিয়া শারমিন চূড়া ও ফারজানা সিঁথি। সাভারের লাশের মিছিলের বিভীষিকা স্মরণ করে চূড়া বলেন, সরকার পরিবর্তনই একমাত্র অর্জন হওয়া উচিত ছিল না। বৈষম্যবিরোধী যে ভাবনার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়েছিল, সেখানে আবারও নানা বিভাজন তৈরি হয়েছে। একইভাবে সিঁথি আক্ষেপ করে বলেন, আন্দোলনের এই মহান অর্জনকে আজ নিজ নিজ স্বার্থে কুক্ষিগত করার প্রতিযোগিতা দেখছি। বৈষম্যহীন যে দেশের স্বপ্ন তরুণ সমাজ দেখেছিল, তা যেন রাজনৈতিক কৌশলে হারিয়ে না যায়।

চট্টগ্রামের নীলা আফরোজ বলেন, ১৮ ও ২৯ জুলাই পুলিশের গুলির মুখেও আমরা পিছু হটিনি। তবে দুঃখের বিষয়, আন্দোলনকালীন আমাদের মাঝে যে অভূতপূর্ব ঐক্য ছিল, তা আজ ম্লান হয়ে গেছে। 
পুলিশ কর্তৃক মুখ চেপে ধরে রাখা নাহিদুল ইসলাম বলেন, জুলাই আমাকে বৈষয়িক কিছু না দিলেও খাঁটি দেশপ্রেমিক হতে শিখিয়েছে। আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হয়ে আজীবন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম চালিয়ে যাব।

চিকিৎসকের চোখে সেই দিন
রাজপথের এই তীব্র লড়াকু অভিজ্ঞতার পাশাপাশি মর্মান্তিক স্মৃতির কথা তুলে ধরেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা। তিনি বলেন, দেশের জন্য অঙ্গ বিলিয়ে দেওয়া আহতরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। পড়ালেখা অসমাপ্ত থাকা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষ করতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়া, যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং দৃষ্টিশক্তি হারানো শ্রমজীবীদের নতুন পেশায় প্রশিক্ষণ দিয়ে পুনর্বাসিত করা এখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে তাদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ারও জোর দাবি জানান তিনি।

আরও পড়ুন

×