ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

টেকসই উন্নয়নে এখনও বাধা বাল্যবিয়ে

টেকসই উন্নয়নে এখনও বাধা বাল্যবিয়ে
×

প্রতীকী ছবি

 তাসলিমা তামান্না

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০২ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ১২:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল পাবনার চাটমোহর উপজেলার মাথুরাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আমেনার। পাত্র ছিলেন তাঁর চেয়ে ১৫ বছরের বড়। বিয়ের এক বছরের মাথায় আমেনা এক ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। দুই বছর পর তাঁর আরেকটি ছেলে হয়। বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যেই আমেনার স্বামী মারা যান দুরারোগ্য অসুখে। ১৯ বছর বয়সে বিধবা হয়ে ছোট দুই সন্তান নিয়ে আমেনা আশ্রয় নেন বাবার বাড়ি। 

আমেনার বয়স এখন ৩১। এর মধ্যে তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা অসুখ। নিজে অসুস্থ হওয়ায় সন্তানদের ঠিকমতো যত্ন নিতে পারেননি। জরায়ুতে সমস্যা দেখা দেওয়ায় অপারেশন করে ফেলে দিতে হয়েছে। অপুষ্টির কারণে এরই মধ্যে তাঁর চোখের দৃষ্টিও হয়েছে ঝাপসা।

মেয়ের বাল্যবিয়ে প্রসঙ্গে আমেনার মা ফুলজান আক্তার (৬০) জানান, গ্রামে উঠতি বয়সী মেয়ে ঘরে রাখা নিরাপদ ছিল না। মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবেই অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর নিজেরও ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল বলে জানান ফুলজান আক্তার। মেয়ের এই দুর্দশায় এতটুকু স্বস্তি পান না এখন তিনি। মেয়ে আর নাতিদের দেখে শুধুই চোখের পানি ফেলেন। 

আমেনার বিয়ে হয়েছিল ১৭ বছর আগে। গত এক যুগে বাল্যবিয়ের মাত্রা কমে এলেও এ সংখ্যা কম নয়। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, একজন মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হলে বিয়ের যোগ্যতা অর্জন করে। বিশেষ ক্ষেত্রে বয়স ১৬ বছর পূর্ণ হলে অভিভাবক এবং কমিউনিটির মধ্যস্থতায় তাঁকে বিয়ে দেওয়া যাবে। পাশাপাশি একজন ছেলেরও বিয়ের জন্য ২১ বছর পূর্ণ হতে হবে। 

বাল্যবিয়ে নিয়ে প্ল্যান বাংলাদেশ, আরডিআরএস বাংলাদেশ ও মাহিদেব যুবসমাজ কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে ‘সিএনবি’ প্রকল্পের আওতায় ‘দ্য চাইল্ড, নট ব্রাইড’ শীর্ষক একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এর আওতায় রয়েছে কুড়িগ্রামের ৯টি উপজেলা। দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম অঞ্চলে বেশির ভাগ বাল্যবিয়ে হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মেয়েদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্কুল থেকে ঝরে পড়া এবং পারিবারিক সম্মানজনিত কারণে। যখন পরিবারগুলো কোনো ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে তখন দ্রুতই মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনিসেফ প্রকাশিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ সালের জরিপের তুলনায় বর্তমানে ১৮ বছর বয়সের আগে মেয়েদের বিয়ের অনুপাত সামান্য কমেছে। কিন্তু এখনও বিভিন্ন স্থানে এ সংখ্যা একই হারে কমেনি। বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের শীর্ষদিকে রয়েছে।

ক্লাস্টার সার্ভের তথ্য বলছে, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সুনামগঞ্জ ও উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোয় বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি। নানা কারণে এসব অঞ্চলে বাল্যবিয়ের হার কমানো যাচ্ছে না। প্রথমত, এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবারগুলোর বারবার থাকার জায়গা পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দ্বিতীয়ত, দরিদ্র পরিবার ও গ্রামাঞ্চলের কিশোরীরা বিভিন্নভাবে নিপীড়ন, বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। যার ফলে পরিবারগুলো মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, শিশু নির্যাতন, অনলাইনে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়ার মতো বিষয় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে।

বাল্যবিয়ের কুফল প্রসঙ্গে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শামীমা ইয়াসমিন রীমা জানান, বাল্যবিয়ে বেশি ঘটছে গ্রামাঞ্চলে। মেয়ের অভিভাবকও অল্পবয়সী মেয়ের অন্তঃসত্ত্বাকালীন আলাদা যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝে না। এতে শিশুর বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না। 
নানা ধরনের প্রচারণা ও সচেতনতামূলক উদ্যোগের পরও বাল্যবিয়ে নির্মূল করা যাচ্ছে না।

এ ব্যাপারে মানবাধিকার সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম জানান, বাল্যবিয়ে নির্মূল না হওয়ার জন্য দুটি বিষয় কাজ করছে– পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয়। বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে জেলা-উপজেলা ও কমিউনিটি পর্যায়ে অনেক ধরনের সংস্থা আছে। কোনোটিই সেভাবে কার্যকর নয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার যেমন দায়িত্ব আছে, তেমনি স্থানীয় সরকার, কমিউনিটিরও দায়িত্ব বাল্যবিয়ে রোধে কাজ করা। কিন্তু জবাবদিহির বিষয়টি কেউ মানছে না।

আরও পড়ুন

×