ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক বাজেট

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক বাজেট
×

 জাকির হোসেন

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:১৭ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

পুনরুদ্ধার শব্দটি একটু কঠিন। সহজ করে বলা যায়, কোনো কিছু ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে বারবার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শব্দবন্ধটি এসেছে। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিকে খুবই খারাপ উল্লেখ করে বাজেটের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। 

তবে পুনরুদ্ধারের জন্য অর্থমন্ত্রী বাজেটের যে সামগ্রিক কাঠামো উপস্থাপন করেছেন, তার বাস্তব ভিত্তির নানা দুর্বলতার কথা এসেছে বিশেষজ্ঞদের বাজেট বিশ্লেষণে। তার মর্মার্থ দাঁড়ায়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে অর্থনৈতিক চিন্তার চেয়ে রাজনৈতিক অভিপ্রায় গুরুত্ব পেয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মাথায় রেখে জনতুষ্টির বিবেচনা থেকে অর্থমন্ত্রী হয়তো তা করেছেন।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা ধরা যাক। বর্তমান ভঙ্গুর পরিস্থিতির ওপর আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। এক দিন আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো চলতি অর্থবছরে ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে বলে তথ্য দিয়েছে। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশেরও কম। 

ফলে এক বছরে প্রবৃদ্ধি এত বাড়ানোর মতো বাস্তব ভিত্তি নেই। 

আয়-ব্যয় কাঠামোও ‘পরাবাস্তব’ মনে হয়েছে। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ, বর্তমানে যা ৮ শতাংশের মতো। আবার মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতি-কৌশলে বর্তমান সরকারের শেষ অর্থবছরে তা ১১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মানে চার বছরে বাড়বে ১ শতাংশের কম, অথচ এক বছরে বাড়বে ২ শতাংশের বেশি। ফলে আয়-ব্যয়ের অঙ্কের যৌক্তিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেট উপস্থাপন করেন নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বাজেট। এর আগে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের শিরোনাম– গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা। তিনি বলেছেন, জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবনিকাশ নয়; বরং দেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়ণের পথনকশা। সবার জন্য সমান সুযোগ রেখেছেন তিনি। অথচ গতানুগতিকভাবে রাজস্ব আয়ে পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি রেখেছেন। ভ্যাটের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। আবার একটি ক্ষেত্রে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রেখেছেন। এটি সৎ করদাতাদের সামনে ভালো উদাহরণ নয়।

আগামী অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছেন, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে যা ১৯ শতাংশ বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ঘোষিত চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় পরিকল্পনা গত অর্থবছরের চেয়ে কম ছিল। 

ব্যয়ের জন্য অর্থমন্ত্রী ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছেন, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যা সাড়ে ১৮ শতাংশ বেশি। অঙ্কের হিসাবে এটি প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। 

এনবিআরের কাছে রাজস্ব সংগ্রহের হিসাব আছে গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এতে দেখা যায়, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক লাখ কোটি টাকা পিছিয়ে আছে সংস্থাটি। অর্থবছর শেষে এটি আরও বাড়বে। এর মানে চলতি অর্থবছরে হয়তো পাঁচ লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আদায় হবে। ফলে  আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে দুই লাখ কোটি টাকা, যা এক প্রকার অসম্ভব। 

ঋণের লক্ষ্যমাত্রাও বিশাল 
বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে। বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া হবে এক লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে নেওয়া হবে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বাকিটা সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে। সরকার যদি বিদেশি ঋণ কম পায়, তাহলে ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। সে ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত ঠিকমতো ঋণ পাবে না। এতে বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে না।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ব্যয়ের মধ্যে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে ২২ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের এই বাবদ বরাদ্দ ছিল এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। 

মূল্যস্ফীতি এতটা কমবে? 
অর্থনীতিতে দুর্বলতার সবচেয়ে বড় দিক হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি এখন সাড়ে ৯ শতাংশের মতো। মাঝে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার প্রবণতা ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে সমস্যা এবং দেশে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো, বাজারে জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ছে, বেশির ভাগ মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। 

আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতটা কমবে কিনা তার অনিশ্চয়তা অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে এসেছে। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সুদহারে ঊর্ধ্বগতি, বাণিজ্য শুল্কের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন– এসবের যে কোনো একটি ঘটনাই দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। 

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমানে ঋণ পরিস্থিতি ঝুঁকির মুখে। এ কারণে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে বেরিয়ে এসে কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার নীতিকৌশল নিয়েছে সরকার। অথচ আগামী অর্থবছরের বাজেটে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। যদি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হয় এবং সরকার বাজেট সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে ঋণ গ্রহণ আরও বাড়বে। 

ব্যবসা-বাণিজ্য কতটুকু সহজ হবে
অর্থমন্ত্রী ডি-রেগুলেশন বা বিনিয়ন্ত্রণকরণের মাধ্যমে সরকারি কাজে বিলম্ব এবং বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ পরিহারের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য সুসংবাদ। ডি-রেগুলেশনের জন্য অর্থমন্ত্রী দ্রুত একটি টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। একটি ডেডিকেটেড ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতারা অভিযোগ জানাতে ও প্রতিকার চাইতে পারবেন। এর বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্র কতটুকু সমর্থন করে, তা এখন দেখার বিষয়। এ ছাড়া জ্বালানির নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরিবেশের উন্নতি না হলে শুধু ডি-রেগুলেশনের পদক্ষেপ বিনিয়োগ বাড়াবে না। 

করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা ভালো পদক্ষেপ। তবে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্যের কঠিন পরিস্থিতিতে কোম্পানির করের হার কিছুটা কমানো উচিত ছিল। করের হার কমিয়ে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যেত। রপ্তানিতে উৎসে কর কমানোর কোনো ঘোষণা নেই। এটি রপ্তানিকারকদের জন্য দুঃসংবাদ।

বাজেট অনুমোদন
রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এরপর জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট উপস্থাপনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সংসদ কক্ষে প্রবেশ করেন তিনি। এ সময় তাঁর হাতে ছিল ব্রিফকেস।

জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের নির্ধারিত কক্ষে প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিলে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। এরপর শুরু হয় বাজেট উপস্থাপনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। 

এর আগে সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। 

বিকেল ৩টার কয়েক মিনিট আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন অর্থমন্ত্রী। আসর ও মাগরিবের নামাজের বিরতিসহ বাজেট অধিবেশন চলে এবং শেষ হয় সন্ধ্যায়। অধিবেশন কক্ষে ঢোকার সময় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। নেভি ব্লু স্যুট ও নীল টাই পরিহিত অর্থমন্ত্রীকে তখন বেশ হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। 

আরও পড়ুন

×