দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
যুদ্ধ ও শান্তির চক্করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ১১:৩২
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের ইতিহাস মূলত লেখা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে একজন চরম অবিশ্বস্ত বর্ণনাকারী হিসেবে প্রমাণ করছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি ইরানকে ভয়ানক পরিণতির হুমকি দিয়ে আসছেন। তাঁর দাবি ছিল, ইরান আলোচনার টেবিলে এসে শান্তি চুক্তি সই না করলে চরম মূল্য দেবে।
কয়েক সপ্তাহ আগেই তিনি এই চুক্তিকে আসন্ন বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এখনও কোনো সুরাহা হয়নি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প এ পর্যন্ত অন্তত ৩৮ বার ইরান চুক্তি খুব কাছাকাছি বলে দাবি করেছেন।
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এই সংঘাতে নিজেদের পূর্ণাঙ্গ বিজয় দাবি করেছে। অথচ বিশ্ব তেলের বাজারের ২০ শতাংশেরও বেশি পরিবহন হওয়া হরমুজ প্রণালি এখনও বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও ট্রাম্প দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তিনি একদিকে ইরানকে পরাস্ত বলে ঘোষণা করছেন, অন্যদিকে শান্তি চুক্তি সই না হওয়ার জন্য তেহরানের একগুঁয়েমিকে দায়ী করছেন। গত সোমবার এক বার্তায় তিনি লেখেন, ইরান চমৎকার চুক্তি করার জন্য অনেক বেশি সময় নষ্ট করেছে, আর এখন তাদের এর খেসারত দিতে হবে। এরপর গত মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দফা তিনি দেশটিতে হামলা করেন এবং জবাবে ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পোস্টটি আসে ওমান উপকূলে ইরান একটি ড্রোনের মাধ্যমে আমেরিকার একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর। যদিও ট্রাম্প ও মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এর আগে দাবি করেছিলেন, ইরানের কোনো বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা বা রাডার নেই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ট্রাম্পের সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করছে। কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন মিত্রদের ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ওভাল অফিসে বসে ট্রাম্প একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও ভয়াবহ হামলার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, ঠিক তেমনি আবার বলছেন যে চুক্তি হাতের নাগালে রয়েছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও একদিকে যেমন আসন্ন চুক্তির আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তার পর মুহূর্তেই আবার ‘আজ রাতেই একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’ এমন হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও আচমকা অবস্থান পরিবর্তন ট্রাম্পকে খবরের শিরোনামে টিকিয়ে রাখছে। তবে এতে বিশ্বজুড়ে তাঁর বিবৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে মিত্ররা
বিশ্বনেতারা মার্কিন প্রশাসনের এই তৈরি হওয়া বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতিকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করছেন। ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানের ওপর পাল্টা হামলা না চালানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু ইসরায়েল যখন ইরানে আঘাত হানে ঠিক তখনই এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর কথা বলার আগেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। অবশ্য পরে তিনি নেতানিয়াহু তাঁর কথা অমান্য করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তিনি নেতানিয়াহুকে যা করতে বলেন, সে তাই করে।
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প আবারও ইরানের ওপর তীব্র সামরিক হামলার দিকে ঝুঁকছেন। এ পদক্ষেপ ইরানের অর্থনীতি, সামরিক ও বেসামরিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। তবে এই হামলা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা ইরান সরকারকে শান্তি চুক্তিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে তা নিশ্চিত নয়। ট্রাম্প প্রশাসন মূলত আবারও এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে, যেখানে তারা তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপান্তর করতে ব্যর্থ হচ্ছে। মূলত মাঠপর্যায়ে আলোচনার কোনো অগ্রগতি নেই। এ ক্ষেত্রে কেবল ট্রাম্পের নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তার পরিবর্তনশীল পোস্টগুলোই এখন একমাত্র ভরসা। অন্যদিকে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আত্মসমর্পণ করতে রাজি নয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লিখেছেন, ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী যে কোনো আক্রমণ বা হুমকির জবাব দিতে প্রস্তুত। মার্কিন সেনারা যদি নিরাপদ থাকতে চায়, তবে তাদের এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।
- বিষয় :
- ইরান
