সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন জুলাই থেকে ধাপে ধাপে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:০৯ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ১০:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে ‘ধাপে ধাপে’ বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল বৃহস্পতিবার আগামী অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তিনি এ ঘোষণা দেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। আমরা
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।’
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকলেও আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়তি বরাদ্দ দেখানো হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ বরাদ্দ ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য ১৪ হাজার ৪ কোটি টাকা, কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৩০ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা বাবদ ৪৫ হাজার ১২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৪ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে বেড়ে ৮৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বেতন-ভাতা ও পেনশনে বরাদ্দ ১ লাখ ২২ হাজার ২১১ কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরে জনপ্রশাসন খাতে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বরাদ্দ ৭২ হাজার ২৪ কোটি টাকার তুলনায় যা ৯৬ শতাংশ বেশি। পরে এ বরাদ্দ সংশোধন করে ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। ফলে সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় নতুন বরাদ্দ প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর একটি অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। এই টাকা থেকে অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা থাকছে সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনধারী ব্যক্তিদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে। পরে যা সংশোধিত বাজেটে সমন্বয় করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫ গঠন করে। গত ২২ জানুয়ারি কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে। এতে সর্বনিম্ন ধাপে বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপে ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। সুপারিশ বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে বছরে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
তবে কমিশনের প্রস্তাব হুবহু বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ওই কমিশনের সুপারিশ করা রিপোর্ট পর্যালোচনা করতে সরকার সচিব কমিটি গঠন করেছে। কমিটি সুপারিশ কিছুটা কাটছাঁট করে প্রতিবেদন জমা দিলে সে অনুযায়ী বস্তবায়ন করা হবে। নতুন বেতন কঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে তিন অর্থবছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে আগামী অর্থবছরে সংশোধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য বাড়তি প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। একই সঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিশনের সুপারিশও পর্যালোচনার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক সক্ষমতা না থাকার পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর করলে মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সরকার। বাজারে মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে কমিশনও তিন বছরে ধাপে ধাপে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিল।
তারা আরও বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশের ঘরে থাকলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে তারা কর আদায়ের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, কর ফাঁকি রোধের মাধ্যমে আয় বাড়ানো সম্ভব।
বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন। সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা পরে স্থগিত করা হয়। তবে গত বছরের জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে বিশেষ সুবিধা সমন্বয় করা হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আয়ের তুলনায় সরকারের পরিচালন তথা অনুন্নয়ন ব্যয় বেশি হচ্ছে। তাই উন্নয়ন ব্যয়তো রয়েছেই পরিচালন ব্যয় মেটাতেও সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন হলেও এখাতে আরও কিছুটা বাড়বে।
- বিষয় :
- বেতন
