পরিবর্তনের ছোঁয়া কি সাধারণ মানুষ পাবে
ড. জাহিদ হোসেন
ড. জাহিদ হোসেন
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:১১ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করা হয়। সরকারি ব্যয় বাড়ে, উন্নয়ন প্রকল্পের পরিধি বিস্তৃত হয় এবং নতুন নতুন কর্মসূচি চালু হয়। তবুও মৌলিক জনসেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ থেকেই যায়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় থাকে। সন্তানদের শিক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন অভিভাবকরা। ভালো চাকরির জন্য সংগ্রাম করছে তরুণ প্রজন্ম। নিত্যপণ্যের দাম এখনও উচ্চ পর্যায়ে। বহু বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অনেক পরিবার নিজেদের আগের চেয়ে বেশি অনিরাপদ মনে করে।
এমন এক সময়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এসেছে, যখন এসব উদ্বেগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকার উন্নত জনসেবা, অধিক কর্মসংস্থান, শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু নাগরিকরা সম্ভবত বাজেটকে এর বরাদ্দের আকার বা আর্থিক পূর্বাভাসের জটিলতা দিয়ে বিচার করবেন না। তারা অনেক সহজ একটি মানদণ্ডে এর মূল্যায়ন করবেন। তাদের চিন্তা, জীবন কি কিছুটা সহজ হবে? দ্রব্যমূল্য কি কমবে? চাকরি পাওয়া কি সহজ হবে? স্বাস্থ্যসেবার মান কি উন্নত হবে? শিক্ষার ফলাফল কি ভালো হবে? ঝুঁকিপূর্ণ ও অসহায় পরিবারগুলো কি কার্যকর সহায়তা পাবে? মূল প্রশ্ন আসলে এগুলোই।
মূল্যস্ফীতি কি শেষ পর্যন্ত কমবে?
অধিকাংশ পরিবারের জন্য মূল্যস্ফীতিই এখন সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক উদ্বেগ। গত কয়েক বছরে খাদ্য, পরিবহন, বাসস্থানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের আয়ের তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে। পরিসংখ্যানগতভাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও পরিবারগুলো চাপ অনুভব করে যাচ্ছে। কারণ একবার বেড়ে যাওয়া দাম সাধারণত আগের অবস্থায় আর ফিরে আসে না।
সরকার আশা করছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। যদি তা ঘটে, তাহলে কোটি কোটি মানুষ উপকৃত হবে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখন পর্যন্ত বেশ উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হলে খাদ্যের দাম সহজেই বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। আর বিনিময় হারজনিত চাপ আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে। সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নটি খুবই সহজ– ছয় মাস পরে যখন তারা বাজারে যাবেন, তখন কি তারা অনুভব করবেন যে তাদের বাজার খরচ আগের তুলনায় ধীরে বাড়ছে?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে বাজেটের অন্য অনেক সাফল্যই ম্লান হয়ে যেতে পারে। বাজেট মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাজেটের নিজস্ব হিসাব-নিকাশ কি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করে তুলছে?
তরুণরা কি চাকরি পাবেন?
বাংলাদেশের পরিবারগুলোর মধ্যে সম্ভবত কর্মসংস্থানের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে দেখেন, তাদের উপযুক্ত চাকরি খুবই সীমিত। আবার অনেকে পড়াশোনা শেষ না করেই স্থায়ী ও সম্মানজনক আয়ের কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খান।
সরকারের কৌশল হলো– সরকারি নিয়োগ নয়, বরং বেসরকারি বিনিয়োগই কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি হবে। এটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। সরকারি চাকরি বাড়িয়ে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। টেকসই কর্মসংস্থান আসতে হবে এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে– যারা বিনিয়োগ করবে, সম্প্রসারণ ঘটাবে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।
এ কারণেই বাজেটে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, দ্রুত অনুমোদন প্রদান, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, সংস্কারের পর চাকরি সৃষ্টি হতে সাধারণত সময় লাগে। ব্যবসায়ীরা তখনই নতুন লোক নিয়োগ করেন, যখন তারা শক্তিশালী চাহিদা, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা দেখতে পান– শুধু কোনো সংস্কার ঘোষণার কারণে নয়। এসব কারণে বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ কম, ব্যাংকিং খাত চাপে রয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও মন্থর। বাজেট এমন কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে কিন্তু স্বল্প মেয়াদে কর্মসংস্থানের দ্রুত উন্নতির যথেষ্ট প্রমাণ দেয় না।
তরুণ চাকরিপ্রার্থীরা খুব সহজ একটি মানদণ্ডে বাজেটকে বিচার করবেন এবং তা হলো, এক বছর পর কি আজকের তুলনায় চাকরির সুযোগ বেশি থাকবে? যতদিন না তার ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায়, ততদিন সরকারের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে মানুষের সংশয় থাকাই স্বাভাবিক।
স্বাস্থ্যসেবার মান কি উন্নত হবে?
এ বছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে অন্যতম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকার এ খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সেবার পরিধি সম্প্রসারণ, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও চিকিৎসা শিক্ষার উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ক্রমবর্ধমান ও নগরায়ণমুখী জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় কম ছিল। অতিরিক্ত সম্পদ বরাদ্দ তাই জরুরি। কিন্তু নাগরিকরা স্বাস্থ্য বাজেটকে বরাদ্দের অঙ্ক দিয়ে নয়, ফলাফল দিয়ে বিচার করবেন। কেউ যখন সরকারি হাসপাতালে যাবেন, তখন কি চিকিৎসক পাওয়া যাবে? প্রয়োজনীয় ওষুধ কি মজুত থাকবে? রোগ নির্ণয়ের সেবা কি সঠিকভাবে চালু থাকবে? রোগীরা কি সময়মতো চিকিৎসা পাবেন, নাকি তাদের আবারও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হবে?
বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়, বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা। বেশি অর্থ বরাদ্দ ভালো সেবার সম্ভাবনা বাড়ায়, কিন্তু তার নিশ্চয়তা দেয় না।
শিশুরা কি আরও ভালো শিক্ষা পাবে?
শিক্ষা খাতেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, শিশুরা কি এমন দক্ষতা অর্জন করছে, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে সফল হতে সাহায্য করবে? বাজেট এ সমস্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এতে দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা এবং কর্মসংস্থান উপযোগী শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা স্নাতক বেকারত্ব ও দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন। এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক অগ্রাধিকার। তবে অভিভাবকদের যুক্তিসংগত প্রশ্ন হতে পারে– শিক্ষার মান উন্নয়নে বাজেট কি যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে? বাজেট বক্তৃতায় শিক্ষকতার মান, শ্রেণিকক্ষের জবাবদিহি, শিক্ষার্থীদের শেখার মূল্যায়ন কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান কমানোর বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা রয়েছে।
অভিভাবকরা শিক্ষা বাজেটকে এভাবেই বিচার করবেন– তাদের সন্তান কি গত বছরের তুলনায় আরও ভালো শিক্ষা পাচ্ছে? এ প্রশ্নে বাজেট সমস্যার নির্ণয় তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে করেছে কিন্তু সমাধানের রূপরেখা ততটা পরিষ্কার নয়।
সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা কি প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছাবে?
বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি অর্থ ব্যয় করা নয়, বরং যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কাছে আরও কার্যকরভাবে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনও অনেক খণ্ডিত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত অসংখ্য কর্মসূচিতে বিভক্ত। সুতরাং চ্যালেঞ্জ শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়; বরং নিশ্চিত করা যে সহায়তা দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য এসব প্রশ্ন খুবই বাস্তব যে সহায়তা কি সময়মতো পৌঁছাবে? এটি কি ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় যথেষ্ট হবে? যেসব পরিবার এ সুবিধার অধিকারী, তারা কি বাস্তবে তা পাবে?
সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড
বাজেটে অনেক ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি কমানো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সম্প্রসারিত সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু নাগরিকরা বাজেটকে বক্তৃতা বা সরকারি নথির মাধ্যমে অনুভব করেন না। তারা এটি অনুভব করেন বাজারে যে দাম পরিশোধ করেন, যে সেবা পান এবং তাদের পরিবারের সামনে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়, তার মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত আগামী অর্থবছরের বাজেটের সাফল্যও এই বাস্তব মানদণ্ডেই বিচার করা হবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট
- বিষয় :
- বাজেট
- প্রতিক্রিয়া
