ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

মূল সীমাবদ্ধতা দুর্বল আর্থিক কাঠামো

মূল সীমাবদ্ধতা দুর্বল আর্থিক কাঠামো
×

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:১২ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ | ০৯:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

এবারের বাজেট প্রস্তুতিতে কিছুটা চিন্তাভাবনার ছাপ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থমন্ত্রী যে সমস্ত বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে কথা বলেছেন, সেগুলোর প্রতিফলন বাজেট বক্তব্যে আছে। এগুলো বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দুর্বল আর্থিক কাঠামোই বাজেটের মূল সীমাবদ্ধতা। দুর্বল আর্থিক কাঠামোর বিপরীতে অনেক সময় অতিরঞ্জিত প্রাক্কলন করা হয়েছে; যা আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করবে। 
বাজেটে তিনটি চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। উদারীকরণ এবং বিনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যবসা ইত্যাদিতে ব্যয় কমানো এবং 

এর মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে কর আদায়ের একটা পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত–সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে অন্যান্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তুলনামূলক বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তৃতীয়ত–ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে এবং ডিজিটাল সমন্বয়ের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। একই পদ্ধতি ব্যবহার করে দুর্নীতি কমানো ও দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা আছে। 

সরকারের এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য অর্থের দরকার। রাজস্ব আয় যেমন বাড়ানো দরকার, তেমনি ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা দরকার। রাজস্ব আয়ের যে প্রাক্কলন আগামী অর্থবছরে করা হয়েছে, তা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। বর্তমানে রাজস্ব আয়ের যে অবস্থা, তাতে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে না। ফলে প্রকৃত অর্জনের ওপর ৩০ শতাংশের বেশি আগামী অর্থবছরে আয় করতে হবে। এটি ধরাছোঁয়ার বাইরে একটি লক্ষ্যমাত্রা। 

আরেকটি অস্বস্তি দেখছি, বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে। সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এটি পাওয়া যে একেবারে অসম্ভব, তাও আমি মনে করি না। ইতোমধ্যে এডিবি, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ থেকে টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের সকলেরই একটাই শর্ত যে, সংস্কার লাগবে। তারা সকলেই মনে করে যে, এই সরকার গত তিন মাসে সংস্কারের ক্ষেত্রে অনেক ধীর হয়ে গেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো পিছিয়েও পড়েছে। 

অর্থ সংগ্রহের আরেক জায়গা হলো অভ্যন্তরীণ উৎস বিশেষত ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া। ব্যাংকের বর্তমানে যে তারল্য পরিস্থিতি এবং সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাহলে সরকার ব্যাংক থেকে যদি এত ঋণ নেয় তাহলে অন্যেরা কী করবে? এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতে পুঁজির ঘাটতি বড় প্রকট এবং অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ আগের চেয়েও বেড়ে গেলে কোথা থেকে তারা সরকারকে ঋণ দেবে? ফলে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের ক্ষেত্রে কিছু অস্বস্তির জায়গা রয়ে গেছে। 

আমার কাছে মনে হয়, বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নের জায়গা কার্যকর করতে হলে মূল চালিকাশক্তি বা চাবুক হতে হবে সংস্কার। সংস্কারের কথা অর্থমন্ত্রী বক্তৃতার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বলেছেন ঠিকই। কিন্তু ব্যাকরণশুদ্ধভাবে একটা সংস্কার কর্মসূচি তিনি দিলেন না। এই জায়গাটাতে একটা অতৃপ্তি রয়ে গেছে।

কর এবং শুল্ক ক্ষেত্রে কিছু ব্যবস্থা প্রশংসনীয় মনে করি। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতিকে মাথায় রেখে উৎসে কর এবং ভ্যাটকে সরল বা সহজ করার ক্ষেত্রে বা কমানোর ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে কিছু শুল্ক সুরক্ষা রয়েছে। ব্যবসার ব্যয় কমানোর জন্য কিছু উদ্যোগ আছে, যা প্রশংসনীয়। তবে শেষ বিচারে বাস্তবায়নই বড় বিষয়। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থ সংগ্রহের মতো বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে আমরা দেখেছি, টাকা খরচ করা হয়েছে কিন্তু তাতে জনমানুষের উপকার হয়েছে কিনা তার নিশ্চয়তা আমরা পাই না এবং অতিমূল্যায়িত প্রকল্প থেকে টাকা তছরুপ হয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী বক্তৃতায় বলেছেন, এগুলো নজরদারিতে রাখা হবে। কিন্তু তার জন্য আগামীতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, কারিগরি উদ্যোগ এবং জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা কতুটুক প্রতিষ্ঠা হবে–তা দেখার ব্যাপার। নাগরিক সমাজ, ভোক্তা এবং উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিষয়গুলোকে নজরদারিতে রাখাটাই আগামীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। সরকার ত্রৈমাসিকভাবে যদি বাজেট বাস্তবায়নের প্রতিবেদন দেয় তাহলে উপকার হবে এবং সংসদ সদস্যরা যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সংসদীয় সভা চালু রাখেন তাহলে এই বাজেটের প্রতি হয়তো সুবিচার করা সম্ভব হতে পারে।

আমার কাছে মনে হয়, একটি সুচিন্তিত নীতিকাঠামোর সঙ্গে একটি দুর্বল আর্থিক কাঠামোর ফলাফলের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা গিয়ে পড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলনের ওপর। কারণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলনের ভিত্তি সঠিক নয়। এই ভিত্তি যখন ধরা হয়েছে, তখন চলতি অর্থবছরের শেষ দুটি ত্রৈমাসিকের হিসাব আসেনি। একই সঙ্গে যুদ্ধ যে শুরু হয়েছে, তার বিবেচনাও করা হয়নি। এটি করা হয়েছে মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে। সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার, তার বাস্তবতা এই মুহূর্তে নেই। বিশেষ করে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ। আবার অর্থায়নের জন্য ব্যাংক অথবা নিজস্ব তহবিলের বিষয়গুলোও সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না। এখন দেখার বিষয়, এই রাজস্ব কাঠামো আগামী দিনে বিনিয়োগকে সমর্থন দিতে পারে কিনা। আমি এখানে নীতি কাঠামোর সঙ্গে রাজস্ব কাঠামো এবং রাজস্ব কাঠামোর সঙ্গে প্রবৃদ্ধি কাঠামোর মডেলের ভেতরে বিযুক্তি দেখতে পাচ্ছি। সবশেষ বলবো, প্রয়োজনীয় সম্পদ সমাবেশ হবে বাজেটের প্রাণশক্তি। 

লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

আরও পড়ুন

×