পদ্মা-গঙ্গা উত্তাল ম্যাচ
ছবি: বাফুফে
সাখাওয়াত হোসেন জয়, কলকাতা থেকে
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৯ | ০১:০৭
ক্রিকেটে বাংলাদেশ-ভারত ব্যাট-বলের লড়াই মানেই বারুদের জ্বলামুখ! অলিখিত যুদ্ধংদেহী ভাব! অথচ একটা সময় ছিল, যখন দুই দেশের মধ্যে আসল উত্তাপটা ছিল ফুটবলেই। সেই সময় দক্ষিণ এশিয়া ফুটবলে বাংলাদেশ-ভারত লড়াইয়ের উত্তেজনা ছড়াত। প্রতিটি ম্যাচের পরতে পরতে থাকত আগুন। সেই উত্তাপ এখন ক্রিকেটেই বেশি। কিন্তু কয়েক দিন ধরে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনায় বাংলাদেশ-ভারত ফুটবল লড়াই নিয়ে। এখানকার সাংবাদিকদের কলমে যা 'গঙ্গা-পদ্মার মায়াবী ম্যাচ'। তবে পদ্মা পাড়ে এটা 'উত্তাল ম্যাচ' অবশ্যই। ৩৪ বছর পর মঙ্গলবার কলকাতার মাটিতে মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত। কলকাতার বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এখনও পদ্মা পাড়ের ছেলেরা মানেই দামাল ফুটবল।
২০২২ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কলকাতার ঐতিহাসিক সল্টলেক স্টেডিয়ামে প্রতিবেশী দুই দেশের ফুটবল ম্যাচে জামাল ভূঁইয়াদের সামনে চ্যালেঞ্জই থাকবে পয়েন্ট তুলে নেওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ঘিরে এখানকার দর্শকদের মনে জড়িয়ে থাকা ভালোলাগা স্মৃতিগুলো উসকে দেওয়া। ১৯৮৫ সালের পর আবারও কলকাতায় বাংলাদেশ-ভারত ফুটবল যুদ্ধ। রোমাঞ্চকর এই লড়াই দেখতে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন অনেক দর্শক। ৬৫ হাজার দর্শকের গগনবিদারী আওয়াজ উঠবে সল্টলেকে। সবুজের সমারোহে তৈরি সল্টলেক গ্রাউন্ডে ফুল হয়ে ফুটতে তৈরি জামাল ভূঁইয়ারা। ভারতীয়দের হৃদয় ভেঙে কলকাতায় বাংলাদেশের ফুটবলের জয়গান গাইতে চান রবিউল ইসলাম-বিপলু আহমেদরা। যুবভারতীতে স্বপ্নের এই ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখার প্রত্যয় লাল-সবুজের দলটির। বাংলাদেশ সময় ম্যাচটি শুরু হবে রাত ৮টায়।
কলকাতার নিউ টাউনের অভিজাত হোটেল নভোটেলের বলরুমে গতকাল ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে ভারতের সাংবাদিকরা বাংলাদেশকে হেয় করে বারবার প্রশ্ন করেছেন। তাদের ধারণা, ভারতের সামনে দাঁড়াতেই পারবে না বাংলাদেশ। অবশ্য ধারণাটা পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের বিচারেই করেছেন ভারতীয়রা। র্যাংকিংয়ে ভারতের অবস্থান ১০৪, বাংলাদেশের ১৮৭। দু'দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে অনেক ব্যবধান। ২৮ বারের সাক্ষাতে বাংলাদেশ ৩টি, ভারত ১৫টিতে এবং বাকি ম্যাচ হয়েছে অমীমাংসিত। ২০০৩ সালের ১৮ জানুয়ারি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়টিই ছিল বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি। সর্বশেষ দুটি ম্যাচের ফল ছিল ড্র।
২০১৪ সালের পর ভারতের ফুটবলের রূপ বদলে গেছে। এগিয়েছে অনেক, বাংলাদেশ পিছিয়েছে ঠিক তেমনই। ১০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে কাতারের কাছে ২-০ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। আবার বিশ্বকাপ আয়োজকদের তাদেরই মাঠে গত মাসে গোলশূন্যভাবে রুখে দিয়েছিল ভারত। কাকতলীয়ভাবে দুটি দলই কিন্তু কাতারের বিপক্ষে নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলেছে। সেই ম্যাচের দুই রকম ফলাফলে ভারতের আত্মবিশ্বাসটাও বেড়ে গেছে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তিন পয়েন্টে পেতে সুনীল ছেত্রির দল যেমন মরিয়া, জামাল ভূঁইয়ারাও চাচ্ছেন ভারতীয়দের ধারণা বদলে দিয়ে যুবভারতীতে নতুন ইতিহাস গড়তে। 'কাতার ম্যাচের পারফরম্যান্সটা আমরা এই ম্যাচে ধরে রাখতে চাই। অবশ্য নিজেদের মাঠ, ৬৫ হাজার দর্শক; সবকিছুই ভারতের অনুকূলে। তার পরও আমরা ইতিবাচক ফুটবল খেলব'- বলেন বাংলাদেশ কোচ জেমি ডে।
ইতিবাচক ফুটবল খেললেই আসবে জয়- শিষ্যদের মধ্যে এমন মন্ত্র জপে দিয়েছেন জেমি। তার পরও আজ রক্ষণাত্মক কৌশলেই দল সাজাবেন বলে জানিয়েছেন জেমি। প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলে কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা জেমির। তবে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম রানা ও ডিফেন্ডারদের। কারণ ভারতীয় দলে আছেন সুনীল ছেত্রির মতো দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ফরোয়ার্ড। ভারতের বিপক্ষে শেষ দুই ম্যাচে বাংলাদেশ যে জিততে পারেনি, তা এই ছেত্রির কারণেই। দু'বার শেষ মুহূর্তে গোল করে বাংলাদেশের হৃদয় ভেঙেছিলেন ভারতের সর্বকালের সেরা এই গোলদাতা।
আজও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে চান; তবে ড্র নয়, তিন পয়েন্ট চান ছেত্রি, 'যেই গোল করুক, আমি চাই আগামীকালের (মঙ্গলবার) ম্যাচ থেকে তিন পয়েন্ট।' একই চাওয়া তো বাংলাদেশরই। ভারতের মাটিতে জয়ের স্বপ্নটা জামালকে ঘিরেই দেখছে বাংলাদেশ। কাতারের বিপক্ষে এই মিডফিল্ডার ছিলেন অদম্য। পুরো মাঠে চষে বেড়িয়েছিলেন। সেই জামালের মতে, বাংলাদেশ-ভারত লড়াইয়ের পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন মিডফিল্ডাররা, 'আমি মনে করি, মধ্যমাঠে যারা ভালো খেলবে, যাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে তারাই ম্যাচটি জিতবে। একজন মিডফিল্ডার হিসেবে আমি চাইছি কালও নিজের সেরাটা মেলে ধরতে।' শুধু সেরাটাই নয়, দলকে জেতাতে চান বাংলাদেশ অধিনায়ক। ভারতের বিপক্ষে শেষ দুই ম্যাচের দলে জামাল ছাড়াও খেলেছিলেন মামুনুল ইসলাম, রায়হান হাসান, শহিদুল আলম সোহেল ও সোহেল রানা।
ভারতীয়রা যেমন ধরেই নিয়েছে আজকের ম্যাচে তারা খুব সহজেই জিতবে; কিন্তু তা মানতে নারাজ দেশটির কোচ ইগর স্টিমাচ। সাত মাস হলো ভারতীয় ফুটবলের দায়িত্ব এ ক্রোয়েশিয়ানের মুখে বাংলাদেশের প্রশংসা, 'দেখুন আপনারা বারবার প্রশ্ন করছেন কত ব্যবধানে জিতব; কিন্তু কেউ কি ভেবেছিলেন কাতারের বিপক্ষে আমরা ড্র করব? আসলে ফুটবলে কত কিছুই তো হয়। কাতারের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচটি আমি দেখেছি। ওই ম্যাচটি জেতা উচিত ছিল বাংলাদেশের, এমনকি আফগানিস্তানের সঙ্গেও। তারা এখানে হারতে আসেনি, জিততে এসেছে। আমরাও জয়ের জন্য নামব। সত্যিকার অর্থে আমি তিন পয়েন্ট খুব করে চাইছি।'
ভারত কোচের মতো একই চাওয়া বাংলাদেশেরও। যুবভারতীতে আজ কার চাওয়া পূর্ণ হবে, তার অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা।
- বিষয় :
- খেলা
- ফুটবল
- বাংলাদেশ-ভারত
- কলকাতা
