কেইনের ব্যথায় এমবাপ্পের উপহাস
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, দোহা থেকে
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০২২ | ২১:৩৩
বড্ড মন খারাপ সাহেবদের। কাতারে আসার পর থেকেই বড় বড় ক্যামেরা, লেন্স, লাইট, মেকআপ বক্স- রীতিমতো মোবাইল স্টুডিও নিয়ে ঘুরছেন লন্ডন থেকে আসা বেশ কিছু ইংলিশ সাংবাদিক। ইংল্যান্ড দল কোথায় থাকছে, রাতে তাঁদের উটের ডাকে ঘুম হচ্ছে না, অনুশীলনে গরমে হাঁসফাঁস করছে, সমর্থকরা হোটেল পাচ্ছেন না- গত কয়েক সপ্তাহ বিশ্বকাপের সব ত্রুটি সাধ্যিমতো বের করেছে ব্রিটিশ মিডিয়া। তাঁদেরই কয়েকজনকে কাল দেখা গেল একেবারে নিশ্চুপ। হ্যারি কেইনদের বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়াটা ঠিক যেন মেনে নিতে পারছেন না তাঁরা। এমনিতেই হারের জ্বালা, তার ওপর আবার কেইনের পেনাল্টি মিসের দগদগে ক্ষতের মধ্যেই যেন 'লবণ-মরিচ' ছিটিয়ে দিয়েছেন এমবাপ্পে তাঁর অট্ট এক হাসিতে। সেই রাতে কেইন যখন পেনাল্টি মিস করেন, তা দেখে হাসিতে ফেটে পড়েন এমবাপ্পে। ডেইলি মিররের মতো, লন্ডনের দৈনিকগুলো সেই হাসিকে 'উপহাস' ধরেই শিরোনাম করেছে। দল জিতলেও এদিন কোনো গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি এমবাপ্পে, তাই ওভাবে হাসিটা তাঁকে অন্তত মানায় না- মেইলের প্রতিবেদনে সেটা তুলে ধরা হয়েছে। এমনিতে এমবাপ্পের সঙ্গে ফরাসি মিডিয়ারও তেমন ভাব নেই। কিন্তু তাঁর হাসির ছবিটি নিয়ে যখন জল ঘোলা চলছে, তখন কিন্তু স্বদেশি মিডিয়াকেও পাশে পাচ্ছেন এমবাপ্পে।
ফিল ফোডেন, হ্যারি কেইন, বুকায়ো সাকা, জুড বেলিংহাম, ডিকলেন রাইস, জর্ডান হ্যান্ডারসন- ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সারা বছরের তারকা নাম এসব। তাঁদের নিয়েই গত দুই বছরে দারুণ প্রতিভাবান একটি দল গড়েছিলেন কোচ সাউথগেট। শেষ ইউরোতেও ফাইনালে উঠে ইতালির কাছে হারতে হয়েছিল টাইব্রেকারে। তার আগের বিশ্বকাপেও ক্রোয়েশিয়ার কাছে সেমিতে পেনাল্টি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন হ্যারি কেইনরা। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপে সাতবার কোয়ার্টার ফাইনালে এসে হেরেছে ইংলিশরা। শব্দটি আপত্তিকর বলেই ইতিহাস যেটা বলতে পারছে না তা হলো, ফুটবলে তারা আসলেই 'চোকা'। চাপের মুখে কখনোই উঠে দাঁড়াতে পারে না, চাপ এলেই ভেঙে পড়ে গোটা দল। তা সেটা ডেভিড বেকহাম-রুনিদের প্রজন্মেও ছিল, এখনও আছে। এমবাপ্পের ওই উপহাসের পর এই ইংল্যান্ডকে তাই যেন কিছুটা সান্ত্বনাই দিয়েছেন ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম। 'ইংল্যান্ড অনেক ভালো দল, দারুণ খেলেছে। ফিজিক্যালি এবং ট্যাকটিক্যালি তারা বেশ শক্তিশালী। আমি তো বলব, আমরাই কিছুটা ভাগ্যবান যে, দুটি পেনাল্টি আমাদের বিপক্ষে যাওয়ার পরও ম্যাচটি জিতে নিয়েছি।' ম্যাচের পর ইংলিশ মিডিয়ার সামনে আসা এই দেশমকে খানিকটা অচেনাই মনে হয়েছিল।
ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান রেফারি সাকাকে করা একটি ফাউল দেননি বলে ক্ষোভ রয়েছে ইংলিশদের। তবে এবারই বোধ হয় প্রথম তাদের আত্মসমালোচনাও করতে দেখা গেছে। মিডিয়া সেন্টারের কফির আড্ডায় এটা বলাবলি হচ্ছে, এবারের আসরে ইংল্যান্ড দাপট দেখিয়েছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ওয়েলস ও সেনেগালের বিপক্ষে। ফ্রান্সকে মোকাবিলা করার আগে সেভাবে বড় কোনো প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি হ্যারি কেইনদের। তাই কোচ সাউথগেটের কৌশলেও কিছু ভুল খুঁজছেন অনেকে। তবে প্রতিবারের মতো বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর এবার বোধ হয় চাকরি হারাতে হচ্ছে না ইংলিশ কোচকে। হারের পরও এই দলকেই নিয়ে গর্বিত সাউথগেট। 'টুর্নামেন্টে যা হলো তা সত্যিই আমাদের জন্য কষ্টকর। আমাদের কিছু ভুল অবশ্যই হয়েছে। তবে আমি এই দল এবং দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্ববোধ করি। আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে পেরেছি, ইংল্যান্ডে ভালো খেলোয়াড় আছে এবং ভবিষ্যতেও আসবে।' ম্যাচের পর দার্শনিক ইংলিশ কোচ।
তবে হ্যারি কেইন অতটা স্বাভাবিক থাকতে পারেননি। যে কিনা ইংল্যান্ডের হয়ে এর আগে ২১টি পেনাল্টি শুটআউটের ১৭টিতেই সফল, সেই কিনা এমন নকআউট পর্যায়ে এসে ভুল করলেন। 'এই ভুলকে সঙ্গে নিয়েই আমার জীবনটা কাটাতে হবে। আমার প্রস্তুতিতে ভুল ছিল না, কিন্তু কোনো কারণে সেটা কার্যকর হয়নি। এই দায় আমরাই।' আহত কেইন এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন ম্যাচের পর, কাছে চলে আসা টেলিভিশন ক্যামেরাম্যানকে তাঁর ছবি না তোলার অনুরোধ করতে দেখা যায় ইংলিশ গোলরক্ষক পিকফোর্ডকে।