ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঘাসের মাঠে খেলে টার্ফে হাবুডুবু!

ঘাসের মাঠে খেলে টার্ফে হাবুডুবু!
×

প্রিমিয়ার লিগ হকির ম্যাচ।

সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২৪ | ১৮:৪৬

পাঁচ ম্যাচ করেও সব দল খেলেনি। এরই মধ্যে ১১ দলের প্রিমিয়ার বিভাগ হকিতে দুইশর ওপরে গোল হয়েছে। মেরিনার ইয়াংস ক্লাব, ঢাকা আবাহনী, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবই প্রতিপক্ষের জালে দশবারের বেশি বল পাঠিয়েছে একাধিকবার। গোল হজমের হাফ সেঞ্চুরি করেছে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব। চল্লিশের ওপরে গোল করে মেরিনার্স ও আবাহনী তাদের শক্তির যেমন জানান দিয়েছে, তেমনি করে দেশের হকির সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা কতটা অসম, তা যেন নতুন করে ফুটে উঠেছে। 

প্রথম সারির চার-পাঁচটা ক্লাব ছাড়া বাকিগুলোর দৈন্যদশা দেখে মনে হচ্ছে শুধু অংশগ্রহণের জন্যই প্রিমিয়ার লিগে নাম লেখানো। অবশ্য ২৭ মাস পর হওয়া প্রিমিয়ার হকির মান যে এত বাজে হবে, তা অনেকটা অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু ভিক্টোরিয়া, দিলকুশা, আজাদের মতো ক্লাবগুলোর গোল হজমের সেঞ্চুরি বাস্তবে ঘরোয়া হকির দুর্দশাই যেন ফুটিয়ে তুলেছে। খেলোয়াড়দের মানের পার্থক্যই ফুটে উঠেছে বেশি। ৩৫-৪০ জন খেলোয়াড়ের বাইরে বাকিদের বেশির ভাগই বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন ঢাকায় খেলতে। সারা বছর ঘাসের মাঠে খেলতে অভ্যস্ত খেলোয়াড়রা মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের টার্ফে খেলতে গিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন।

লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মেরিনার্স, আবাহনী, মোহামেডান ও ঊষা ক্রীড়া চক্রই ভালোমানের দেশি-বিদেশি খেলোয়াড় নিবন্ধন করিয়েছে। তাদের সঙ্গে পেরে উঠছে না বাকিরা। দিলকুশা, আজাদ, ভিক্টোরিয়ার জালে যথাক্রমে ১৮, ১৩ এবং ১১ বার বল পাঠিয়েছে মেরিনার্স। ভিক্টোরিয়ার জালে আবাহনী ১৬ ও মোহামেডান দিয়েছে ১০ গোল। ঘরোয়া হকিতে প্রতি মৌসুমেই হয়েছে গোলের বন্যা।

এই শতাব্দীর আগের শতাব্দীতেও লিগে হয়েছে অসম লড়াই। ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে ঊষা ক্রীড়া চক্র ১৯ গোলে হারিয়েছিল বাংলাদেশ আনসারকে। সেই লিগে ঊষা গোল করেছিল ১১১টি। এবারের লিগে মঙ্গলবার পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ঝড় গেছে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়াড়দের ওপর। কোনোমতে দল গড়া এই ক্লাবটি হজম করেছে ৫১ গোল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪১ গোল খেয়েছে দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব। 

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, এই দুই ক্লাব নাকি শুরুতে লিগে খেলতে চায়নি। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মমিনুল হক সাঈদের আর্থিক সহযোগিতায় জোড়াতালি দিয়ে দল গঠন করে লিগে নাম লেখায় মতিঝিলপাড়ার এ দুই ক্লাব। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্লেয়ারদের নিয়ে দল গঠন করে বেশ কয়েকটি ক্লাব। জেলা পর্যায়ে ঘাসের মাঠে স্টিক নিয়ে খেলা আর টার্ফে খেলা এক নয়। তার ওপর আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে লিগ হয়নি। 

আর বাংলাদেশে মওলানা ভাসানী স্টেডিয়াম এবং বিকেএসপি ছাড়া আর কোথাও টার্ফ নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে খেলতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খেলোয়াড় সমকালকে জানান, ‘আমরা সাধারণত ঘাসের মাঠে খেলে অভ্যস্ত। টার্ফে খেলাটা অনেক স্পিডি। প্রচুর দৌড়াতে হয়। এখানে মানিয়ে নিতে একটু সমস্যা হচ্ছে। তার সঙ্গে নিয়মিত খেলা না হওয়াটাও অন্যতম কারণ। আপনি দেখেন জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা কিন্তু বিভিন্ন বাহিনীর হয়ে খেলে বলে অনুশীলনের সুযোগ পায়। তাদের অর্থ নিয়েও খুব একটা চিন্তা করতে হয় না। আমাদের ক্ষেত্রে কিন্তু এর উল্টো। তাহলে আমরা কীভাবে তাদের সঙ্গে লড়ব।’

সর্বোচ্চ গোল দেওয়া তিন দল
৪৩– মেরিনার্স
৪১– আবাহনী
২৮– মোহামেডান

সবচেয়ে বেশি গোল হজম করা তিন দল
৫১– ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব
৪১– দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব
৩৩– আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব

দশ বা তার বেশি গোলের ম্যাচ
মেরিনার ইয়াংস ক্লাব    ১১:২    ভিক্টোরিয়া
মেরিনার্স                      ১৮:১    দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব
মেরিনার্স                      ১৩:২    আজাদ
আবাহনী লিমিটেড       ১৬:০    ভিক্টোরিয়া
আবাহনী                      ১০:০১    আজাদ
আবাহনী                      ১০:১    দিলকুশা
মোহামেডান                 ১১:১    দিলকুশা
মোহামেডান                 ১০:১    ভিক্টোরিয়া

০– ভিক্টোরিয়া, দিলকুশা ও আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি।

শুধু ঘাসের মাঠই বড় সমস্যা নয়, নিয়মিত হকি চর্চা হয়নি বলেই লিগের এমন বাজে অবস্থা। প্রিমিয়ার লিগ তো দূরের কথা প্রথম, দ্বিতীয় বিভাগ লিগও হয় না নিয়মিত। তাতে করে আর্থিক সংকটে থাকা খেলোয়াড়রা হকির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে নানা পেশায় নিজেদের যুক্ত করেছেন। জাতীয় দলে খেলা বেশির ভাগ খেলোয়াড় বিভিন্ন সার্ভিসেস বাহিনীতে যোগ দেওয়ায় তাদের জীবনের নিশ্চয়তা আছে। 

আর সারা বছর অনুশীলনেও থাকেন তারা, যেটা জেলার খেলোয়াড়দের পক্ষে সম্ভব নয়। এর বাইরে আছে অভিজ্ঞতার ঘাটতি। এভাবে চলতে থাকলে দেশের হকি লিগের মান ভবিষ্যতে আরও কমবে বলে মনে করেন মেরিনার্সের কোচ মামুন উর রশিদ, ‘প্রিমিয়ার বিভাগ হকির মতো বড় আসরে এত গোল হচ্ছে বিষয়টি আমাদের কাছেই খারাপ লাগছে। এটা আরও বাজে যাবে। দিনকে দিন আরও খারাপ যাচ্ছে। প্লেয়ার নেই, খেলা নেই। ২৭ মাস পর লিগ হচ্ছে। ঘরোয়া কোনো কাঠামো নেই, এভাবে কয়দিন? গোঁজামিল দিয়ে তো আর হয় না।’ 

কিছু ক্লাব শুধু অংশগ্রহণের জন্যই এসেছে বলে মনে করেন মামুন, ‘এটাই সত্যি। আর জেলাতে ঘাসে খেলে আসা খেলোয়াড়রা টার্ফে মানিয়ে নিতে পারছে না। এটাও বড় সমস্যা হতো না, যদি নিয়মিত খেলা হতো। আড়াই বছর পর লিগে আপনি এর চেয়ে আর ভালো মান কি আসা করেন? পাঁচ-ছয়টার পরে বাকি পাঁচটি টিমের অবস্থান খুবই বাজে।’ এর জন্য সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করছেন তিনি, ‘প্লেয়ার সংকটের চেয়ে আমার কাছে মনে হচ্ছে সাংগঠনিক ব্যর্থতাই বেশি। প্লেয়ার আছে; কিন্তু সাংগঠনিকভাবে মাঠে খেলা রাখতে পারে নাই। যখন নিয়মিত খেলা হবে, তাহলে মান এমনিতেই বাড়বে।’

আরও পড়ুন

×