হকির হাল-হকিকত
গণরুমে গাদাগাদি আর খাবারে দুর্গন্ধ
হকি খেলোয়াড়রা থাকছেন গণরুমে। ওয়াশরুম ব্যবহারের অনুপযোগী, নেই ছিটকিনি।
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৪ | ১২:০৪
রুমের বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য জুতা। মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলার দক্ষিণ পাশ দিয়ে হাঁটলে সেই জুতার স্তূপ দেখলেই বোঝা যায়, এখানে খেলোয়াড়রা থাকছেন। কৌতূহলবশত রুমে ঢুকতেই চোখে পড়ল অন্যরকম দৃশ্য। যে রুমে থাকার কথা দুই থেকে তিনজন, সেখানে থাকছেন সাতজন। ঠিক যেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ‘গণরুম’। সেই গণরুমের খাটে জায়গা না হওয়ায় বেশ কয়েকজনকে ফ্লোরে ঢালাও বিছানা পেতে গাদাগাদি করে ঘুমাতে দেখা গেল।
এমন ছোট্ট চারটি রুমে গাদাগাদি করে থাকছেন প্রিমিয়ার লিগে খেলা হকির খেলোয়াড়রা। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে সবাই হাসিমুখেই এগিয়ে এলেন। কিন্তু ভেতরে যে কষ্ট, সেটা একটু পরই বোঝা গেল, যখন নিজেদের দুঃখের কথাগুলো বলতে থাকেন দেশের হকির তারকারা।
‘দেশের হকির সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের স্টেডিয়ামের ভেতরে অপরিচ্ছন্ন রুমে থাকতে হচ্ছে। খাটে জায়গা হচ্ছে না, ফ্লোরিং করতে হচ্ছে, বিছানা-বালিশ নেই পর্যাপ্ত, রুমের এসি নষ্ট, বাইরের গাড়ির শব্দে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। এভাবে কি থাকা সম্ভব? হ্যাঁ, আমরা থাকতেছি। কারণ হকির খেলোয়াড়রা এখন অবহেলিত। চাইলে আমাদের জন্য আরেকটু ভালো ব্যবস্থা করা যেত।’
প্রিমিয়ার লিগের ১১টি ক্লাবের মধ্যে মোট পাঁচটি ক্লাবের খেলোয়াড়রা থাকেন হকি স্টেডিয়ামে। এর মধ্যে আবাহনী লিমিটেড এবং অ্যাজাক্স স্পোর্টিং ক্লাব থাকে দু’তলায়। আর নিচে প্লেয়ারদের ড্রেসিংরুমে কোনো মতে থাকছেন ভিক্টোরিয়া, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব এবং পুলিশ এসসির কয়েকজন খেলোয়াড়। নতুন ক্রীড়া কমপ্লেক্স করার জন্য অনেকটা বাধ্য হয়েই ক্লাবের পরিবর্তে হকি স্টেডিয়ামের রুমে থাকতে হচ্ছে আবাহনীর দেশি খেলোয়াড়দের। অ্যাজাক্স স্পোর্টিং ক্লাবের স্থানীয় ১২ থেকে ১৫ খেলোয়াড় দুই রুমে ভাগাভাগি করে থাকেন।
বিদেশি খেলোয়াড়রা থাকেন হোটেলে। রুমের বাইরে এ দুই ক্লাবের খেলোয়াড়দের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে টয়লেট। কোনো রুমের ভেতরে নেই ওয়াশরুম। পাশে যে ওয়াশরুম রয়েছে, তা ব্যবহারের অনুপযোগী। এতটাই দুর্গন্ধ যে, ওয়াশরুমের ভেতরে ঢোকাই যায় না। টয়লেটের দরজাগুলোর একটিতেও নেই ছিটকিনি। হকি ফেডারেশনের অফিসের পাশের ওয়াশরুমটি ভালো। তবে বেশির ভাগ সময় সেটি তালা দেওয়া থাকে। গোসল করার কোনো ব্যবস্থা নেই। রুমে থাকার চেয়ে দুই ক্লাবের ৩০-৩৫ জন খেলোয়াড়ের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওয়াশরুম।
উপায় না পেয়ে নিচতলায় ড্রেসিংরুমের ওয়াশরুম ব্যবহার করছেন তারা। সেটা করতে গিয়েও পড়ছেন বেকায়দায়। কারণ ড্রেসিংরুমে থাকছেন ভিক্টোরিয়া ও দিলকুশার খেলোয়াড়রা। তাই দেখা গেল অ্যাজাক্স ও আবাহনীর খেলোয়াড়রা ঘুমাচ্ছেন ওপরে, আর টয়লেট করতে হচ্ছে নিচে নেমে। এটা নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় দলের এক হকি তারকা, ‘হকি খেলে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশকে যারা প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের কিনা পড়তে হচ্ছে ওয়াশরুম বিড়ম্বনায়। সবচেয়ে খারাপ লাগে রাতে সেহরি খেতে উঠে যখন টয়লেটে যাব, তখন এক ফ্লোর নিচে নেমে ড্রেসিংরুমের ওয়াশরুমে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায় অনেক সিরিয়াল। রুমে না হয় গাদাগাদি করে রাখছে; কিন্তু ওয়াশরুম তো ঠিক করতে পারত।’ এ প্রসঙ্গে জানতে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মমিনুল হক সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে তাঁর ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
শুধু আবাসন সংকটই নয়, হকি খেলোয়াড়দের নিম্নমানের খাবার নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। এই অভিযোগ দিলকুশা ও ভিক্টোরিয়ার খেলোয়াড়দেরই বেশি। দুই ক্লাবের ৩০ জনের মতো খেলোয়াড় ক্যাম্পে থাকেন। তাদের খাবার নিয়ে পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়। রমজান বলে সেহরি এবং ইফতার করতে হয়। রোজা রাখা বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের অভিযোগ, সেহরিতে তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারেন না। ভাতে যেমন দুর্গন্ধ থাকে, পরিমাণেও অনেক কম। ইফতারেও মানসম্মত খাবার জোটে না, থাকে না কোনো শরবত। কোনোমতে খাবার খেয়ে দিন পার করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে জানতে দুই ক্লাবের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফোন দিলে তারা জানান, সবকিছু সমাধান হয়েছে। দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের কর্মকর্তা শাহাদাত জোবায়ের সমকালকে জানান, ‘যতটুকু বলেছে খেলোয়াড়রা, ততটুকু কিন্তু হয়নি। ক্যাম্পে থাকলে টুকটাক একটু সমস্যা হয়। এখন আমরা চেষ্টা করছি, সবকিছু যেন সুন্দরভাবে শেষ হয়।’ খাবার নিয়ে আপত্তি না করলেও অ্যাজাক্সের খেলোয়াড়দের অভিযোগ মান নিয়ে। পর্যাপ্ত খাবার দিলেও সেগুলোতে প্রচুর মসলা এবং তেল দেওয়া থাকে; যা একজন খেলোয়াড়ের জন্য খাওয়া কঠিন বলে মনে করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খেলোয়াড়।
- বিষয় :
- প্রিমিয়ার লিগ হকি
