বিদেশি আম্পায়ারেও নেই আস্থা!
বাংলাদেশ হকি প্রিমিয়ার লিগ। ছবি: ফাইল
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪ | ১৪:০১
আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মনঃপূত না হলেই যত ক্ষোভ। ডাগআউট থেকে ক্লাব কর্মকর্তারা ঢুকে পড়েন হকির নীল টার্ফে। তাদের সঙ্গে যোগ দেন খেলোয়াড়রা। অসহায় হয়ে পড়া মাঠের আম্পায়ার নিশ্চিত হওয়ার জন্য সহযোগিতা চান ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট আম্পায়ারের কাছে। ভিডিও দেখে তিনি সিদ্ধান্ত জানানোর পরও তা মানতে নারাজ ক্লাব কর্তারা। ম্যাচ হয়ে যায় বন্ধ। মীমাংসার জন্য মাঠে নামতে হয়েছে ফেডারেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। ৩০-৪০ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পরও দু’পক্ষকে বোঝাতে না পেরে তারাও যেন হাল ছেড়ে দেন।
২৭ মাস পর মাঠে গড়ানো প্রিমিয়ার হকি লিগের চিত্রটা এখন এমনই। বড় ম্যাচ হলেই মাঠের সার্কাসটা দেখা যায়। তাদের এই সার্কাস থামানোর জন্যই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে বিদেশি আম্পায়ার আনা হয়েছে। বড় ক্লাবগুলোর কর্মকর্তা এবং খেলোয়াড়রা হকির নিয়ম সম্পর্কে অজ্ঞাত হওয়ায় প্রতিনিয়ত আম্পায়ারদের সঙ্গে করছেন বাজে আচরণ।
দেশের সেলিম লাকি, শাহবাজের মতো আন্তর্জাতিক মানের আম্পায়ারকে উপেক্ষা করে শ্রীলঙ্কার ডায়ান দিসানায়েক এবং মালয়েশিয়ার ইসমাদি বিন আলিসকে এনেও কোনো সমাধান খুঁজে পায়নি ফেডারেশন। বরং বিদেশি আম্পায়ারদের সামনে কর্মকর্তা এবং খেলোয়াড়দের উগ্র আচরণ দেশের জন্য অসম্মান বয়ে আনছে বলে মনে করেন হকি সংশ্লিষ্টরা। আর ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মমিনুল হক সাঈদের কাছে তারা মানসিক রোগী। ‘এরা মানসিকভাবে অসুস্থ। এই মানসিক রোগীদের আমরা কীভাবে সমাধান করব।’
লিগ শুরুর আগে হকি ফেডারেশনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মিটিংয়ে বিদেশি আম্পায়ার ইস্যুতে ক্লাব কর্মকর্তারা একে অপরকে তুলে নেওয়ার মতো হুমকি দিয়েছিলেন। টেবিলের সেই উত্তাপ লিগের প্রথম পর্বের বেশির ভাগ ম্যাচেই দেখা গিয়েছি। আবাহনী, মোহামেডান, মেরিনার্স এবং ঊষা ক্রীড়া চক্রের খেলার দিন ঝামেলা করার মানসিকতা নিয়েই যেন মাঠে নেমেছিলেন কর্তারা। বিশেষ করে গত ৩০ মার্চ দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী ও মোহামেডানের লড়াইয়ের শেষ ৫৮ সেকেন্ডের খেলা শেষ করতে লেগেছে ৩৫ মিনিট। আম্পায়ারের একটি পেনাল্টি কর্নারের সিদ্ধান্ত নিয়ে দু’দলের খেলোয়াড়রা হাতাহাতিতে পর্যন্ত জড়িয়েছিলেন।
শুধু তাই নয়, ১ এপ্রিল মোহামেডান-মেরিনার্স ৬০ মিনিটের ম্যাচও শেষ হয়েছিল আড়াই ঘণ্টায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো ছোট ক্লাবগুলোর সঙ্গে খেলার সময় বড় ক্লাবের কোনো অজুহাত নেই। বড় ক্লাবের বিপক্ষে খেলতে নামলেই যত সমস্যা। যে ঝামেলা এবং বিতর্কের জন্য বিদেশি আম্পায়ার আনা, সেগুলো তো কমেইনি বরং বেড়েছে। দায় না নিয়ে দুর্বল আম্পায়ারিংকে সামনে এনেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্লাবের কোচ, ‘এই লিগটা একটা আইওয়াশ। করার জন্য করা। বিদেশি যে আম্পায়ার আনা হয়েছে, তারা ভালো মানের নন। অল্প কিছু পারিশ্রমিক পেয়েছে বলে তাদের আনা হয়েছে।’ এই বিষয়টি মানছেন না আবাহনীর হকি কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুল এহসান রানা, ‘সার্বিক বিষয়ে যদি বলি, আমরা যে অফিসিয়াল ও প্লেয়ার নিয়ম-কানুন ঠিকমতো জানি না। এর সঙ্গে আছে কর্তাদের বাজে মানসিকতা। কর্তা এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে একটা চিন্তা থাকে, অন্যায় করে কিংবা যে করেই হোক জিততে হবে।’
অথচ আড়াই বছর পর মাঠে গড়ানো লিগ যাতে বিতর্কহীন হয়, সে জন্য খেলাগুলো ইউটিউব ও ফেসবুকে লাইভ দেখানোর ব্যবস্থা করে ফেডারেশন। বড় ম্যাচে দুই বিদেশি আম্পায়ার খেলা পরিচালনা করেছেন আর ভিডিও আম্পায়ার হিসেবে ছিলেন সেলিম লাকি এবং শাহবাজ আলী। কিন্তু অনেক সময় ভিএআর আম্পায়াররা সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে মাঠে আম্পায়ারের ওপর ছেড়ে দেন। অথচ হওয়ার কথা এর উল্টোটা। অন দ্য টাইমে ভিডিও ক্যাপচার না হওয়াতে এই সমস্যা হয়েছে বলে সমকালের কাছে জানান সেলিম লাকি, ‘আমাদের সঙ্গে টেকনিশিয়ান থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, ভিডিওটা ঠিক সময়ে ক্যাপচার হয় না। তাহলে তো কিছু করার নেই। এখন টেকনিশিয়ানরা যদি অনটাইমে ভিডিও ক্যাপচার করতে না পারেন, আমাদের করার কী আছে। তখনই আমরা সিদ্ধান্তটা মাঠের আম্পায়ারের ওপর ছেড়ে দিই।’ আজ থেকে শুরু হচ্ছে সুপার সিক্স। দুই বিদেশি ডায়ান দিসানায়েক এবং মালয়েশিয়ার ইসমাদি বিন আলিসের পরিবর্তে ঈদের পর আনা হবে নতুন দুই বিদেশি আম্পায়ার।
হকি লিগের পৃষ্ঠপোষকতা করা গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স থেকে ফেডারেশন পেয়েছে ১৪ লাখ টাকা। লিগ করতে ব্যয় প্রায় ৬৫ লাখ টাকার মতো। সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদের দাবি, তিনি নিজে বাকি টাকা ম্যানেজ করেছেন। তার পরও বিদেশি আম্পায়ারদের সঙ্গে মাঠে ক্লাবগুলোর কর্তাদের বাজে আচরণ তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, ‘বিদেশি আম্পায়ার এনেছি , তাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। তো আমরা কী করতে পারব। কর্মকর্তারা ঠিক না হলে খেলোয়াড়রা কখনো তাদের খেলার মানসিকতা পরিবর্তন করবে না। এই জন্য আমি সর্বপ্রথম ক্লাব কর্মকর্তাদেরই দায়ী করব। তারা যদি কঠোর থাকেন, তাহলে এই জিনিসগুলো হতে পারে না।’
এর পর নিজেদের অসহায়ত্বের কথাও প্রকাশ করেছেন সাঈদ, ‘আজকে যদি আমি অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থায় থাকতাম, তাহলে প্রতিটি ক্লাবকে অনুদান দিতাম। রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন করতাম। তাদের শাস্তির আওতায় আনতে পারতাম। এখন যে লিগ চালাচ্ছি, এটাই তো ভিক্ষা করে আনছি। আমরা যদি ক্লাবকে কিছু দিতে পারতাম, তাহলে ক্লাবগুলো ভয়ে থাকত। তাদের জরিমানার আওতায় আনতে পারতাম।’
- বিষয় :
- হকি
- বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন
