সাক্ষাৎকারে মাহমুদুল হাসান জয়
‘সবার চেষ্টা দেড়শ, দুইশ রান করার’
মাহমুদুল হাসান জয়
সেকান্দার আলী
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:২৫
মাহমুদুল হাসান জয়ের টেস্ট অভিষেক ছিল হতাশ করার মতো। নিজের পরের টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের সঙ্গী হয়েছিলেন। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে ৭৮ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেছিলেন। ২০ টেস্টের ছোট্ট ক্যারিয়ারে ওটাই তাঁর কাছে রোমাঞ্চকর। জাতীয় দলের এ ওপেনারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি দক্ষিণ আফ্রিকায়। তখন করেছিলেন ১৩৭ রান। এবার সিলেটে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে করেছেন ক্যারিয়ারসেরা ১৭১ রান। মাহমুদুল হাসান জয় তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ার নিয়ে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সেকান্দার আলীকে।
সমকাল: আপনাকে অভিনন্দন ক্যারিয়ারসেরা টেস্ট ইনিংস খেলার জন্য। এবার কিছুটা আত্মবিশ্বাসী দেখা গেছে আপনাকে। বিশেষ কোনো কাজ করেছিলেন?
জয়: ধন্যবাদ। আমি এনসিএল টি২০ থেকে ভালো প্র্যাকটিস করছিলাম। ওখান থেকেই আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। ওই টুর্নামেন্টে একটি ১০০ রানের ইনিংস খেলি। টি২০তে প্রথম ১০০ রান ছিল আমার। ওই আত্মবিশ্বাস কাজে লাগিয়ে জাতীয় লিগেও একটা ১০০ রানের ইনিংস খেলি। সেই ছন্দে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও ভালো ব্যাটিং করা সম্ভব হয়েছে।
সমকাল: নাজমুল হোসেন শান্ত সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন, ‘আমি অনুরোধ করবো সুযোগ পেলেই যেন টেস্ট ক্রিকেটাররা প্রথম শ্রেণির লিগে খেলে। এবং বড় বড় স্কোর করে। কারণ লিগে বড় স্কোর করার প্র্যাকটিস থাকলে টেস্টেও ভালো করবে।’
জয়: এটা অবশ্যই ঠিক। ঘরোয়া লিগে এখন খুব ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। এখানে ভালো এবং বড় স্কোর করতে পারলে ব্যাটারের আত্মবিশ্বাস উঁচুতে থাকে। সেটা জাতীয় দলে কাজে দেয়। ব্যাটার হিসেবে আপনি যখন বড় স্কোর করবেন, তখন সবকিছু ভালো যাবে।
সমকাল: ঘরোয়া লিগে বড় স্কোর খুব কম দেখা যায়। এনসিএলে ২০০ বা ৩০০ রানের স্কোর না হওয়ার কারণ কী?
জয়: যত বড় স্কোর করা যাবে, তত বড় নাম হবে। বাবর আজমের একটি সাক্ষাৎকারে দেখেছি- তাঁর বাবা বলেছিলেন, যত বড় স্কোর করবা, তত বড় নাম হবে। আমরা সবাই এখন চেষ্টা করছি বড় রান করতে। এনসিএলে দেখেন অনেকগুলো ১০০ রানের ইনিংস আছে। এখন সবাই চেষ্টা করছে দেড়শ, দুইশ রানের ইনিংস খেলতে। লিগে দেড়শ করলে জাতীয় দলে ১২০ বা ১৩০ রান করা যাবে। ওইখান থেকে মানসিক জায়গাটা তৈরি হবে। সামনে ২০০ থেকে ৩০০ রানের ইনিংসও কেউ না কেউ খেলবে, আশা করি।
সমকাল: আপনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেট শিখেছেন। আপনার ‘মেন্টাল স্ট্রেন্থ’ অন্যদের থেকে বেশি থাকার কথা, বেশি ভালো খেলার কথা। তাই নয় কি?
জয়: অবশ্যই। আমি বিকেএসপিতে ছিলাম, ওখানে খেলাধুলা, পড়ালেখার পাশাপাশি স্পোর্টস সায়েন্সেরও ক্লাস নেওয়া হয়। আমি বলব, বিকেএসপিতে পড়াশোনা করতে পারায় আমার জন্য ভালো হয়েছে। ক্রিকেট, মানসিকতা ও পড়ালেখার দিক থেকে লাভবান হয়েছি। যেটা খেলার ক্ষেত্রে কাজে দিচ্ছে। শেখা জিনিসগুলো সচেতনভাবে কাজে লাগাতে পারলে নিয়মিত পারফরম্যান্স করার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।
সমকাল: ডিউক বলে এনসিএল চার দিনের ম্যাচ হয়। উইকেটেও বৈচিত্র্য এসেছে। এই পরিবর্তন কি ব্যাটারদের পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
জয়: হ্যাঁ, উপকার হচ্ছে। ডিউক বলে ব্যাটিং করা একটু কঠিন। বল সব সময় মুভ করে। পুরাতন হলে সুইং করে। ওখানে যত বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রান করবেন, জাতীয় দলে এসে সেগুলোকে কাজে লাগাতে পারবেন। কারণ টেস্ট ম্যাচ খেলা হয় এসজি বা কুকাবুরা বলে। এসজি ও কুকাবুরা বলের থেকে ডিউক বল বেশি মুভ করে। সেদিক থেকে বলব, ডিউক বলে খেলে বড় স্কোর করলে টেস্ট খেলা সহজ হবে।
সমকাল: সিলেট ও মিরপুরে যে রকম উইকেটে খেললেন, সামনেও কি এ রকম উইকেটে খেলতে চাইবেন?
জয়: হ্যাঁ, অবশ্যই। সবাই জানে মিরপুরে স্পিন উইকেট থাকে। এবার স্পোর্টিং উইকেট ছিল। যারা ভালো ব্যাটিং করেছে, তারা রান করেছে। যারা বোলিং ভালো করেছে, তারা উইকেট পেয়েছে। আমি বলব, মিরপুরের উইকেট এবার খুবই ভালো ছিল। সিলেটেও একই রকম ছিল। আমরা চাইব এ রকম ভালো উইকেটে টেস্ট ম্যাচ এবং জাতীয় লিগের ম্যাচ খেলতে। ভালো উইকেটে ব্যাটাররা স্কোর দিতে পারলে বোলাররা ম্যাচ জেতাতে পারবে।
সমকাল: স্পোর্টিং উইকেটে খেলা হলে অ্যাওয়ে সিরিজেও ভালো করার সম্ভাবনা তৈরি হয় কি?
জয়: অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশন হয়তো ভিন্ন হবে। বাংলাদেশে ওই রকম কন্ডিশন বানাতে পারবে না। তবে স্পোর্টিং উইকেটে খেলতে পারলে কিছুটা হলেও মিল পাওয়া যাবে। তখন ওখানে গিয়ে ভালো প্রস্তুতি নিতে পারলে পারফরম্যান্স করা সহজ হবে।
সমকাল: দক্ষিণ আফ্রিকায় সেঞ্চুরি করেছিলেন। ১৬ টেস্ট পরে আবার সেঞ্চুরি পেলেন।
জয়: দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগেও ঘরোয়া লিগে ভালো খেলেছিলাম। ওই আত্মবিশ্বাসটা ওখানে কাজ করেছে। মুমিনুল হক সৌরভ ভাই, মুশফিকুর রহিম ভাই আমাকে খুব সাপোর্ট করেছিলেন তখন। তারা বলেছিলেন, তুমি দক্ষিণ আফ্রিকায় সেঞ্চুরি করেছো, তুমি অনেক বড় খেলোয়াড়। এই কন্ডিশনে সেঞ্চুরি করা সহজ নয়। এই কথাগুলো বলে আমাকে উজ্জীবিত করেছিলেন। এখনও তারা উজ্জীবিত করেন। এবার যেভাবে ব্যাট করেছি, চেষ্টা করব এই ছন্দটা যেন থাকে। যেভাবে প্র্যাকটিস করলে লাভবান হব, সেটাই করার চেষ্টা থাকবে। এবার যেভাবে প্র্যাকটিস করেছি, সেই চর্চাটা করতে থাকব। সামনে বিপিএল ও প্রিমিয়ার লিগ আছে। ওখানেও এই আত্মবিশ্বাস কাজে লাগানোর চেষ্টা করব।
সমকাল: আপনি ২০টি টেস্ট খেলেছেন। কোন জায়গায় এবং কোন দলের বিপক্ষে খেলে বেশি আনন্দ পেয়েছেন?
জয়: নিউজিল্যান্ডে যে টেস্ট ম্যাচটি জিতেছিলাম, সেটি খেলে খুবই আনন্দ পেয়েছি। ঐতিহাসিক জয় ছিল ওটি। মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্ট সেরা আমার কাছে। কন্ডিশন, আবহাওয়া, প্রতিপক্ষ– সব মিলিয়ে সেরা ছিল ওই টেস্ট। নিউজিল্যান্ড তখন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা দল, সেই দলকে তাদের মাটিতে হারিয়েছিলাম আমরা। খুবই রোমাঞ্চকর একটি টেস্ট ম্যাচ ছিল সেটি। বাংলাদেশের জন্য বড় প্রাপ্তি ছিল নিউজিল্যান্ডকে তাদের ওখানে হারানো।
সমকাল: মুশফিকুর রহিম ২০ বছর খেলে ১০০ টেস্ট খেললেন। তাঁকে দেখে আপনিও কি অনুপ্রাণিত?
জয়: মুশফিক ভাই যেভাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সার্ভ করেছেন, তা অবিশ্বাস্য। তিনি আমাদের রোল মডেল। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু নেওয়ার চেষ্টা করি আমরা। তিনি সব সময় চেষ্টা করেন আমাদের আগলে রাখার, হেল্প করার। মুশফিক ভাই আমাদের জন্য অসাধারণ একজন ব্যক্তিত্ব।
সমকাল: আপনিও কি চান ১০০ টেস্ট খেলতে, মুশফিকের রেকর্ড ভেঙে দিতে?
জয়: ওইভাবে লক্ষ্য সেট করিনি। চেষ্টা করব নিয়মিত জাতীয় দলে খেলতে। পাকিস্তানের বিপক্ষে পরের সিরিজটা খেলতে চাই। ভালো করতে থাকলে চেষ্টা থাকবে মুশফিক ভাইয়ের রেকর্ড ছোঁয়ার।
সমকাল: এবার বাংলাদেশকে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে কোন পজিশনে দেখতে চান?
জয়: আগের সাইকেলে সাত নম্বরে শেষ করেছিলাম। এই সাইকেলে চার-পাঁচ এ থাকতে পারলে বড় প্রাপ্তি হবে। ওই পজিশনে যেতে হলে বেশির ভাগ ম্যাচ জিততে হবে। দেশের মাটিতে যে সিরিজগুলো হবে, সেগুলো জিততে পারলে ভালো হবে।
