ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

‘গ্রামে এখন আমাদের অনেক সম্মান’

‘গ্রামে এখন আমাদের অনেক সম্মান’
×

ক্রিকেটার হাবিবুর রহমান সোহান। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

...

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২২:০০ | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২২:১৭

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে হাবিবুর রহমান সোহান ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিলেন সম্মান পাওয়ার লোভ থেকে। এলাকায় টেপ টেনিস খেলে নাম হওয়ার সঙ্গে রোজগারেরও পথ হয়ে গিয়েছিল। স্বপ্নের পরিধি বড় হলে ঢাকায় এসে ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলেন। খেলেছেন করপোরেট ক্রিকেট লিগ। ২০২২ সালে ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগে বাজিমাত করার পর বিপিএল, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও অভিষেক হয় ২০২৩ সালে। হাঁটি হাঁটি পা পা করে টেপ টেনিসের হাবিবুর সম্প্রতি এশিয়া কাপ রাইজিং স্টারস টি২০ টুর্নামেন্টে হংকংয়ের বিরুদ্ধে দেশের দ্রুততম সেঞ্চুরি করে পরিচিতি লাভ করেন। এশিয়া কাপে ভালো খেলার পুরস্কার পেলেন বিপিএলে। রোববার নিলাম থেকে ৫০ লাখ টাকায় তাঁকে দলে নেয় নোয়াখালী এক্সপ্রেস। নিজের উত্থান নিয়ে সমকালের সেকান্দার আলীকে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন হাবিবুর রহমান সোহান। 

সমকাল: বিপিএল নিলামে আপনি বাজিমাত করেছেন। ৫০ লাখ টাকা সম্মানী পাবেন নোয়াখালী এক্সপ্রেস থেকে। এতটা আশা করেছিলেন?

হাবিবুর: আমি আসলে এরকম কোনো কিছু ভাবিনি বা আশাও করিনি। আলহামদুলিল্লাহ কিছু একটা হয়েছে (হাসি)। নিলাম থেকে ভালো সম্মানীতে দল পাওয়ায় ভালো লাগছে।

সমকাল: আপনি আগেও বিপিএল খেলেছেন। এবার সম্মানীর সঙ্গে দায়িত্বও কি বেশি?

হাবিবুর: অবশ্যই। যে কোনো খেলায় দায়িত্ব এমনিতেই থাকে। এর আগে যে দুইবার বিপিএল খেলেছি, সেখানে নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি। আশা করছি এবার নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ পাব। যেহেতু ছন্দে আছি, সেটি ধরে রেখে সুযোগ কাজে লাগাতে চাই। 

সমকাল: এশিয়া কাপ রাইজিং স্টারস টি২০ টুর্নামেন্ট কি আপনার জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছে?

হাবিবুর: অবশ্যই। দেশের হয়ে খেলা সব সময় গর্বের। আমি জীবনে প্রথম দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছি। রাইজিং স্টারস টুর্নামেন্ট খেলেছি বিদেশে। আল্লাহর রহমতে ভালোও করেছি। একটি সেঞ্চুরি পেয়েছি। সব ম্যাচেই কম বেশি রান করেছি। এ কারণেই হয়তো বিপিএলে ভালো সম্মানীতে দল পাওয়ার সুযোগ হয়েছে। 

সমকাল: এশিয়া কাপের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেমন লেগেছে?

হাবিবুর: আমরা খুব ভালো দল ছিলাম। প্রত্যেক খেলোয়াড় অনেক ভালো করেছে। দুই-একটি জায়গায় খারাপ হওয়ায় ফাইনাল ম্যাচে কিছুটা পিছিয়ে গেছি। 

সমকাল: আপনি টেপ টেনিসে ক্রিকেট খেলতেন। পুরো দস্তুর ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্পটা শুনতে চাই।

হাবিবুর: আমি লম্বা সময় টেপ টেনিস খেলতাম। অনেক জেলায় গিয়ে খেলেছি। সেখান থেকে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবে প্র্যাকটিস করেছি। ওই সময় তিন বছর করপোরেট লিগে খেলেছি। ওখান থেকে আমার একটা বড় ভাই হুসনে আবেদ মেহেদী ঢাকার প্রথম বিভাগ লিগে দল খুঁজে দেন। সুযোগ পেয়ে টি২০ তে চার ম্যাচে আড়াইশ রান করি। ওয়ানডেতে করেছিলাম ৪৫৪ রান। মেহেদী ভাই গাজী গ্রুপে ক্রিকেটার্সে প্রিমিয়ার লিগে খেলার সুযোগ করে দেন। ২০২৩ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলার পরই এখানে আসা। গত বছর খেলেছি ধানমন্ডি স্পোর্টিং ক্লাবে। প্রিমিয়ার লিগে খেলার আগেই আমার বিপিএলে অভিষেক হয়। খুলনা টাইটান্সে খেলেছি দুই বার। গত বিপিএলে খেলেছি ঢাকায়। 

সমকাল: টেপ টেনিস কোথায় কোথায় খেলতেন?

হাবিবুর: সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়াতে খেলেছি। যেখানে সুযোগ পেয়েছি সেখানেই খেলতে গেছি। খেলতে ভালো লাগত এবং টাকাও পেতাম। 

সমকাল: তার মানে আপনার বেশ নাম ডাক হয়েছিল?

হাবিবুর: হ্যাঁ, মোটামুটি (হাসি)। কয়েক বছর খেলার পর মানুষ চিনতে শুরু করেছিল। 

সমকাল: টেপ টেনিস খেলার কারণেই কি আপনার বড় শট খেলার অভ্যাস?

হাবিবুর: এখন পর্যন্ত আমার নেচারাল খেলা পরিবর্তন করিনি। ১০ বছর আগে যখন টেপ টেনিসে ক্রিকেট খেলা শুরু করি তখন যেমন ছিল এখনও সেরকম আছে। চেষ্টা করি ওটা ধরে রাখার। 

সমকাল: ওই সময়ের আনন্দ স্মৃতি বা দুঃখের স্মৃতি আছে?

হাবিবুর: একটা মজার স্মৃতি আছে। সেটি হচ্ছে আমাদের এলাকা থেকে একটি জায়গায় খেলতে গিয়েছিলাম। সেই দলে কয়েকজন বড় ভাই ছিলেন। তখন আমি নতুন, আমাকে কেউ চিনতেন না। ওই এলাকায় যাওয়ার পর কিছু সিনিয়র খেলোয়াড়সহ বসে ছিলাম। এলাকার যত লোকজন আছেন তারা খেলোয়াড় দেখতে এসেছিলেন। ম্যাচ শুরুর আগে ভিড় লেগে গিয়েছিল। একজন খেলোয়াড়কে সবাই চিনতেন এবং তাঁর নাম ধরে বলাবলি করছিলেন, খুব ভালো খেলোয়াড়। ম্যাচ শুরু হলে ওই খেলোয়াড় করেছিলেন শূন্য রান। আমি করেছিলাম ১২২ রান। ইনিংস শেষ করার পর লোকজন আমাকে ঘিরে নিয়েছিলেন। সেদিন খুব ভালো লেগেছিল। 

সমকাল: টেপ টেনিস থেকে ক্রিকেট বলে খেলতে কষ্ট হয়েছে?

হাবিবুর: প্রথম দিকে কিছুটা কষ্ট হয়েছে। সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলতে পারা, ড্রেসিংরুম শেয়ার করা–এই মজা পাওয়ার পর থেকে ক্রিকেট বলে খেলতে ভালো লাগে। ক্রিকেট খেলোয়াড়দের খুব সম্মান দেওয়া হয়। ওই সম্মানের লোভেই আমার এই জায়গায় আসা। 

সমকাল: আপনার পরিবারে আর কেউ খেলোয়াড় ছিলেন?

হাবিবুর: না, না। আমার পরিবারে আমি একা খেলোয়াড়। আমার গ্রামের মধ্যেও প্রথম খেলোয়াড়। 

সমকাল: এশিয়া কাপের পরে কি সম্মানটা বেড়ে গেছে?

হাবিবুর: অব্যশই। এশিয়া কাপ আমাকে পরিচিতি দিয়েছে। এখন অনেকেই চেনেন জানেন। আগে তো দেশের হয়ে খেলিনি, ওইরকম পারর্ফমও করিনি। প্রথমবার সুযোগ পেয়ে ভালো করতে পেরে খুশি। 

সমকাল: জাতীয় দলের কেউ আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন?

হাবিবুর: তাসকিন ভাই আমাকে নিয়ে পোস্ট করেছেন। শান্ত (নাজমুল হোসেন) ভাইয়ের সঙ্গে তো প্রায় কথা হয়। খেলা শেষ করেই শান্ত ভাইয়ের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলি। 

সমকাল: এই যে ভালো করলেন, প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে গ্রামের মানুষ কী বলছে? 

হাবিবুর: সবাই অনেক খুশি। একটা সময়ে আমাদের খুব একটা সম্মান ছিল না। কারণ আমার বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রী। পাঁচ-সাত বছর আগে যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করি তখন আমার বাবা মাকে ওইভাবে কেউ গুরুত্ব দিতেন না। এখন আল্লাহর রহমতে সবাই অনেক দাম দেন, সম্মান করেন। 

সমকাল: টি২০ খেলতে বেশি ভালো লাগে না প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট?

হাবিবুর: টি২০ আমার মূল খেলা। প্রথম শ্রেণির লিগে খেলছি আমার শেপ ঠিক করতে। ম্যাচ টেম্পারমেন্ট বাড়াতে; যাতে অনেকক্ষণ উইকেটে থাকতে পারি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে এই অভ্যাসগুলো করে নিচ্ছি। 

সমকাল: দেশের হয়ে টেস্ট খেলার ইচ্ছে নেই?
হাবিবুর:
দেশের হয়ে সব কিছু খেলার ইচ্ছা করে। তবে টি২০ ক্রিকেটে ঝোঁক বেশি। 

আরও পড়ুন

×