হাবিবুরের জন্য গর্বিত বাবা-মা
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৫৩
ফোনে কথা শুনে মনে হচ্ছিল ছেলেটি কাদামাটির মানুষ। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধ শরীরে লেগে না থাকলেও কথায় টানটা রয়ে গেছে। মেকি শহুরে হয়ে ওঠার চেষ্টা করেননি তিনি। যাঁকে নিয়ে এত বিশেষণ, তিনি হাবিবুর রহমান সোহান। ক্রিকেটে সম্প্রতি বেশ ভালো কিছু অর্জন আছে তাঁর। এশিয়া কাপ রাইজিং স্টারস টি২০ টুর্নামেন্টে হংকংয়ের বিপক্ষে দ্রুততম সেঞ্চুরি করে রাতারাতি পরিচিতি লাভ করেন। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) নিলামের পর পরিচিতির ব্যাপ্তি আরও খানিকটা বাড়িয়ে নিলেন। নোয়াখালী এক্সপ্রেস ৫০ লাখ টাকায় দলে নিয়েছে ২৬ বছর বয়সী এ ব্যাটারকে।
ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে যখন নিলাম শুরু হয়, তখন জাতীয় লিগের ষষ্ঠ রাউন্ডের প্রথম দিনের খেলা শেষে হোটেলে ফিরেছেন রাজশাহীর এ ব্যাটার। ক্লান্ত শরীর নিয়ে টিভি সেটের সামনে বসেছিলেন নিলাম অনুষ্ঠান দেখতে। জাতীয় দলের অনেক তারকা ক্রিকেটারকে ভালো সম্মানী না পেতে দেখে বুক কাঁপছিল হাবিবুরের। বিডে যখন নিজেকে দেখতে পেলেন, তখন মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর নিলামের প্রতি বিডের সঙ্গে নাড়ির গতি বেড়ে গিয়েছিল বলে জানান হাবিবুর, ‘আমি আসলে এ রকম কোনো কিছু ভাবিনি বা আশাও করিনি। আলহামদুলিল্লাহ কিছু একটা হয়েছে (হাসি)। নিলাম থেকে ভালো সম্মানীতে দল পাওয়ায় ভালো লাগছে। সত্যি বলতে খুব ভালো লেগেছে।’
বাংলাদেশ ‘এ’ দলের ওপেনার হাবিবুর জানান মোটা সম্মানী পাওয়ার সঙ্গে দায়িত্বটাও বেড়ে গেল তাঁর, ‘যে কোনো খেলায় দায়িত্ব এমনিতেই থাকে। এর আগে যে দুবার বিপিএল খেলেছি, সেখানে নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়নি। আশা করি, এবার নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ পাব। এশিয়া কাপে যে ছন্দ নিয়ে খেলেছি, চেষ্টা থাকবে সেটি ধরে রেখে সুযোগ কাজে লাগাতে।’
টেপ টেনিস থেকে ক্রিকেট বলের ব্যাটার হয়ে ওঠার সময়ে কিছুটা ভুগতে হয়েছে হাবিবুরকে। ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবের একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিন বছর করপোরেট লিগে খেলেছেন। ২০২২ সালে প্রথম বিভাগ লিগে পূর্বাচল স্পোর্টিং ক্লাবে খেলার সুযোগ তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দেয়, ‘প্রথম দিকে কিছুটা কষ্ট হয়েছে ক্রিকেট বলে খেলতে। তবে সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে খেলা, ড্রেসিংরুম শেয়ার করার মজাটা যখন বুঝতে পেরেছি, তখন থেকে ক্রিকেট বলে খেলতে ভালো লাগে।’
হাবিবুর জানান, প্রথম বিভাগের টি২০ লিগে চার ম্যাচে আড়াইশ আর ওয়ানডেতে ৪৫৪ রান করার পর বিপিএলে নেওয়া হয়। খুলনা টাইগার্স ও ঢাকা ক্যাপিটালসে খেলেছেন। গাজী গ্রুপ ক্রিকেটার্সের হয়ে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবে খেলেছেন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ। মূলত ঢাকা লিগে খেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নির্বাচকদের নজর কাড়েন টপঅর্ডার এ ব্যাটার। দেশের হয়ে প্রথম খেলার সুযোগ পান এশিয়া কাপ রাইজিং স্টারস টি২০ টুর্নামেন্টে। বাংলাদেশ এ দলের এই ক্রিকেটারের মতে, ‘দেশের হয়ে খেলা সবসময় গর্বের। জীবনে প্রথম দেশের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছি। আল্লাহর রহমতে ভালোও করেছি। একটি সেঞ্চুরি পেয়েছি। সব ম্যাচেই কম বেশি রান করেছি। এ কারণেই হয়তো বিপিএলে ভালো সম্মানীতে দল পাওয়ার সুযোগ হয়েছে।’
হাবিবুর রহমান মনে করেন রাইজিং স্টারস এশিয়া কাপ তাঁর ক্যারিয়ারে বাঁক বদল করে দিয়েছে, ‘এশিয়া কাপ আমাকে পরিচিতি দিয়েছে। আমাকে এখন অনেকেই চেনেজানে। আগে তো দেশের হয়ে খেলিনি, ওই রকম পারফর্মও করিনি। প্রথমবার সুযোগ পেয়ে ভালো করতে পেরে ভালো লেগেছে।’
সিরাজগঞ্জের এই তরুণ জানান, ছোট বয়সে সম্মানের কাঙাল ছিলেন। আর্থিক সংগতি না থাকায় যাপিত জীবন ছিল সাদামাটা। রাজমিস্ত্রী বাবার সম্মান ছিল না গ্রামে। ক্রিকেটার হওয়ার পর সবকিছুই কেমন জাদুর মতো বদলে গেছে বলে জানান হাবিবুর, ‘গ্রামের মানুষ আমাকে নিয়ে অনেক খুশি। একটা সময়ে খুব একটা সম্মান ছিল না আমাদের। আমার বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রী। পাঁচ-সাত বছর আগে যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করি, তখন আমার বাবা-মাকে ওইভাবে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন সবাই অনেক দাম দেন, সম্মান করেন।’ শাহজাদপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের হাবিবুর এখন দেশের ক্রিকেটাঙ্গনেও সম্মানীত।
- বিষয় :
- হাবিবুর রহমান সোহান
- বিপিএল
