ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ভিনি-রাফিনিয়াহ: ব্রাজিলের টুইন টাওয়ার

ভিনি-রাফিনিয়াহ: ব্রাজিলের টুইন টাওয়ার
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ১০:০৫ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ১৬:৫৪

দেখে মনে হয় কেউ হাঁটছে না, অলিম্পিকের ম্যারাথনে অংশ নিয়েছে–সবার চোখেমুখে শুধুই ঘড়ির তাড়া। বড্ড যান্ত্রিকতা আর আধুনিকতার মধ্যে নিউইয়র্ক ডুবে আছে নিশাচর হয়ে। ২৪ ঘণ্টা সাবওয়ে চলছে স্বপ্নকে ছোঁয়া মানুষগুলোর জন্য। ডলারের বৈভব তার সব ক্লান্তি যেন ভুলিয়ে রেখেছে। তবুও একটা গভীর শূন্যতা আছে। ম্যানহাটানের লোয়ার পার্টে গেলেই সেই নীরবতার ক্ষত অনুভব করা যায়। পঁচিশ বছরেও টুইন টাওয়ার হারানোর ব্যথা আছে। তবে নিউইয়র্ক তো হার মানতে জানে না। সেই ধ্বংসস্তূপের বুকেই আজ দাঁড়িয়ে আছে ফ্রিডম টাওয়ার। ব্রাজিল দলটাও অনেকটা এই শহরের মতোই একটা চাপা কষ্ট নিয়ে আছে। আড়াই যুগের বেশি বিশ্বকাপ স্পর্শ না করার হাহাকার আছে, নেইমারকে আজকের ম্যাচে না পাওয়ার শূন্যতা আছে। তার পরও আছে তাদের নতুন আশার মিনার। ব্রাজিলের আশা ও আস্থার ‘টুইন টাওয়ার’–ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আর রাফিনিয়াহ। বাঁ দিকে রিয়াল মাদ্রিদের ভিনি, ডান দিকে বার্সার রাফিনিয়াহ। ব্রাজিল দলের দুই মূল স্তম্ভের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ব্রাজিলের এবারের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।

টুইন টাওয়ারের একটা ভেঙে পড়লে যেমন অন্যটার দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব, ব্রাজিলের আক্রমণভাগও ঠিক তাই। এদের একজন স্পিড মনস্টার, অন্যজন টেকটিক্যাল জিনিয়াস। দুজনকে একসঙ্গে সামলানোর মানে তো মরক্কোর ডিফেন্ডারদের জন্য মাঝসমুদ্রে কম্পাস হারিয়ে ফেলা! 

আধুনিক ফুটবলে কোনো দলের উইঙ্গাররা যখন ওয়ান অন ওয়ান (একজন ডিফেন্ডারের মুখোমুখি) লড়াইয়ে জিতে যেতে পারেন, তবে প্রতিপক্ষের রক্ষণ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ভিনি এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা ড্রিবলার, অন্যদিকে রাফিনিয়াহ হচ্ছেন বার্সার ছোঁয়ায় চতুর পাসিং মাস্টার। মুহূর্তেই যিনি ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে বল জালে পাঠাতে পারেন। লা লিগায় এল ক্ল্যাসিকোতে দুজন দুজনের পরম শত্রু। কিন্তু ব্রাজিলের জার্সি গায়ে তারা এক ঘাটে জল খেতে প্রস্তুত। মরক্কোর মতো দলগুলো সাধারণত ‘লো ব্লক’ অর্থাৎ নিচে নেমে রক্ষণভাগ জমাট করে খেলে এবং সুযোগ বুঝে আক্রমণে ওঠে। সেক্ষেত্রে তারা ব্রাজিলের বক্সে বল হারালে এই জুটির তাণ্ডব শুরু হয়ে যেতে পারে। বার্সার হয়ে অতিমানবীয় কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার কিছু মুহূর্ত আছে রাফিনিয়াহর। ইউরোপের ক্লাব ফুটবল কাঁপানো এই তারকাদের যদিও ব্রাজিলের হয়ে গোলসংখ্যা বলার মতো তেমন কিছু না। ভিনি ৪৭ ম্যাচ খেলে আটটি, রাফিনিয়াহ ৩৯ ম্যাচে ১১টি গোল করেছেন। তবে এবার নেইমারের শূন্যতায় তারা দুজনই ব্রাজিল দলের ফ্রিডম টাওয়ার।

ইতিহাস বলে ব্রাজিলের স্বর্ণ সময়গুলোতে কোনো না কোনো জুটির অবিশ্বাস্য অবদান ছিল। ব্যাপারটি এমন যে কোনো একজনের নামের সঙ্গে অন্যজনের নাম না জুড়লে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পেলের নাম বলতে গেলে চলে আসে গারিঞ্চার নাম। রোমারিওর সঙ্গে বেবেতো, রোনালদোর সঙ্গে রিভালদো। আসলে সফল এসব জুটির রসায়ন যত গাঢ় হয়েছে, ততই ব্রাজিলের সত্যিকারের রং বেরিয়ে এসেছে। 

১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬–ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় টুইন টাওয়ার ছিলেন পেলে-গারিঞ্চা। দুজনে মিলে দেশের হয়ে ৪৯টি ম্যাচ খেলেছেন; মজার ব্যাপার হলো এর একটি ম্যাচও হারেনি ব্রাজিল। এই আমেরিকা থেকেই বিশ্বকাপজয়ী জুটি দেখিয়েছিল ব্রাজিল। দুই ফরোয়ার্ডের বোঝাপড়া এতটাই গভীর ছিল যে অনেকে বলতেন একে অন্যের মন পড়তে পারে তারা। ২০০২–যে বছর সর্বশেষ বিশ্বকাপ তুলে ধরেছিল সেলেসাওরা, সেবারও এমনই টুইন টাওয়ার ছিল দলটিতে। রোনালদো আর রিভালদো। ঠিক আজকের ভিনিসিয়ুস আর রাফিনিয়াহর মতোই তারা তখন একজন খেলতেন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে, আরেকজন বার্সেলোনায়। রিয়ালের ‘ফেনোমেনন’ এবং বার্সার রিভালদোর সঙ্গে সেবার ব্রাজিল দলে তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত সেই থ্রি আর জুটি। বাকি ‘আর’– রোনালদিনহো।

এবারও ভিনি-রাফিনিয়াহর সেই রসায়নের ওপরই নির্ভর করছে ব্রাজিলের হেক্সা মিশন। ক্লাব ফুটবলে এ কথা সবারই জানা যে ভিনির প্রতি ঠিক কতটা আস্থা আছে তাঁর ক্লাব রিয়ালের সাবেক কোচ কার্লো আনচেলেত্তির। আর রাফিনিয়াহকে নিয়েও তাঁর আছে অগাধ বিশ্বাস। সব মিলিয়ে এই দুজনের মাঝে এল ক্ল্যাসিকোর ‘লক্ষ্মণরেখা’ মুছে দিতে পারলেই ব্রাজিলকে ব্রাজিলের মতোই দেখা যাবে।

আরও পড়ুন

×