ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

মেসোপটেমিয়ার সিংহ: ট্র্যাজেডি পেরিয়ে যেভাবে বিশ্বকাপে ইরাকি তরুণ

মেসোপটেমিয়ার সিংহ: ট্র্যাজেডি পেরিয়ে যেভাবে বিশ্বকাপে ইরাকি তরুণ
×

ইরাকের সেন্টার-ফরোয়ার্ড আয়মান হুসেইন। ফাইল ছবি: এএফপি

আলজাজিরা

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ১৭:৪৬ | আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬ | ১৭:৪৮

ইরাকের সেন্টার-ফরোয়ার্ড আয়মান হুসেইনের বিশ্বকাপ যাত্রা ছিল দীর্ঘ ও কঠিন এক লড়াইয়ের গল্প। ইরাককে ৪০ বছর পর বিশ্ব আসরে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কারিগর তিনি। বাছাইপর্বে বলিভিয়ার বিপক্ষে তাঁর করা গোলেই জয়ের বন্দরে পৌঁছেছিল মেসোপটেমিয়ার সিংহরা।

মাত্র ১২ বছর বয়সে আয়মান যখন স্থানীয় একটি দলের হয়ে ফুটবল খেলতেন, তখন তাঁর পরিবারে নেমে আসে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। বাড়ি তৈরির সামগ্রী কিনতে যাওয়ার সময় তাঁর বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর কয়েক বছর পর অপহরণের শিকার হন তাঁর বড় ভাই। যাকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এক সাক্ষাৎকারে আয়মান বলেন, ‘আমি ফুটবল ছেড়ে দিয়ে পরিবারের দেখাশোনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মা আমাকে মানা করেন। তিনি খেলাটা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। বলেছিলেন, এটা তোমার স্বপ্ন। তোমাকে সে স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে।’

আয়মান সেই স্বপ্নের পিছে ছুটেছেন বছরের পর বছর ধরে।

বাবার বুকে গুলি, ভাইকে অপহরণ
আয়মানের জন্ম ১৯৯৬ সালে ইরাকের উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় আল-হাওইজা জেলার আল-সাফরা গ্রামে। পরিবারের জীবিকার উৎস ছিল কৃষিকাজ ও ভেড়া পালন। তাঁর বাবা ছিলেন ইরাকি সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য।

২০০৮ সালে ইরাকের কিরকুক ও আশপাশের এলাকা ছিল সশস্ত্র সংগঠন আল-কায়েদার নিয়ন্ত্রণে। ওই বছরই সংগঠনটির সদস্যরা আয়মানের বাবাকে হত্যা করে। আয়মান বলেন, ‘তিনি (বাবা) নির্মাণাধীন নতুন বাড়ির জন্য কিছু সামগ্রী কিনতে গিয়েছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর জানতে পারি তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর হৃদপিণ্ড লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছিল।’

ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আয়মান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে। ছবি: এএফপি

এই ঘটনার পর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন আয়মান। কিন্তু তাঁর বড় ভাই তাতে রাজি হননি। কয়েক বছর পর ইরাকের যুব ফুটবল দলে সুযোগ পেয়ে তুরস্কে যান আয়মান। সেখান থেকে ফেরার পথে জানতে পারেন, তাঁর ভাই নিখোঁজ। এরপর আর তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

‘বিনামূল্যেও খেলতে চেয়েছি’
সব ট্র্যাজেডির মাঝেও আয়মানের ফুটবল ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে। ২০১২ সালে তাঁর জীবনে বড় মোড় আসে। সুযোগ পান কুর্দিস্তান অঞ্চলের ইরাক স্টারস লিগের ক্লাব দোহুকে। ১ কোটি ৮০ লাখ ইরাকি দিনারে ক্লাবটির সঙ্গে তাঁর চুক্তি হয়। 

আয়মান বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি বিনামূল্যে খেলতেও রাজি ছিলাম। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাওয়াটা যে কত বড় বিষয়, তা কল্পনাও করা যায় না।’

বিভিন্ন ক্লাবে খেলার পর কাতারের আল খোর-এর সঙ্গেও চুক্তি হয় আয়মানের। সবশেষ ১ মিলিয়ন ডলারে তাঁর সঙ্গে চুক্তি করেছে নিজ দেশের ক্লাব আল কারমা। বর্তমানে আয়মান ইরাকের সবচেয়ে দামি ফুটবলারদের একজন।

ইরাকের সড়কে ফুটবলারদের দেয়ালচিত্র। ছবি: এএফপি

একনজরে আয়মানের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি ২০২৩ সালের ২৫তম অ্যারাবিয়ান গালফ কাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা। পরের বছর তাঁর করা গোলের বদৌলতে ইন্দোনেশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্যারিস অলিম্পিকে খেলার সুযোগ পায় ইরাক।

আশা-ভরসার প্রতীক
ইরাকের জাতীয় ফুটবল দল সবশেষ বিশ্বকাপে খেলেছিল ১৯৮৬ সালে। আয়মানের তখন জন্ম হয়নি। এবারের আসরে তিনি এখন ইরাকি সমর্থকদের আশা-ভরসার প্রতীক। সমর্থকরা আশা করছেন, আয়মানের পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে দল টুর্নামেন্টে যতদূর সম্ভব এগিয়ে যাবে।

ইরাকের গোলরক্ষক ও সহঅধিনায়ক জালাল হাসান আলজাজিরাকে বলেন, ‘আয়মান এমন একটি নাম, যার আলাদা করে পরিচয়ের দরকার নেই। পারফরম্যান্সের কারণে তিনি শুধু ইরাকে নয়, পুরো আরব অঞ্চলে পরিচিত।’

গ্রুপ পর্বে ইরাককে বেশ শক্ত প্রতিপক্ষ সামলাতে হবে- ফ্রান্স, নরওয়ে এবং সেনেগাল। ইরাকের ক্রীড়া সাংবাদিক জায়েদ আলসারাজ বলেন, আমাদের প্রত্যাশা এখন একটাই, সব খেলোয়াড় যেন শারীরিক, মানসিক ও কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকে।

আরও পড়ুন

×