ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এই ‘সেভেন আপে’ সেই লজ্জা নেই কুরাসাওয়ের

এই ‘সেভেন আপে’ সেই লজ্জা নেই কুরাসাওয়ের
×

ফাতিউস ফাহমিদ সৌরভ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ০১:৫৪ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ | ১৮:৪৮

মারাকানায় ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে সেই রাতটার কথা ফুটবলপ্রেমীরা এখনও ভুলে যাননি; যাকে অনেকে ‘মারাকানাজ্জো’ নামে চেনেন। সেদিনের সেমিফাইনালে জার্মানি ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারায়। সেই থেকে ফুটবলে ‘সেভেন আপ’ শুধু একটা স্কোর না, এক ধরনের খোঁচা। এক ধরনের হাসি। এক ধরনের লজ্জার স্মৃতি।

এবারের বিশ্বকাপে আবারও সেই সেভেন আপের পুনরাবৃত্তি ঘটাল জার্মানি। চারবারের বিশ্বকাপজয়ী জার্মানির কাছে কুরাসাও হেরেছে ৭-১ গোলের ব্যবধানে। স্কোরলাইনটা দেখলে মনে হতে পারে এই ম্যাচের গল্পটাও বুঝি একই। তবে ম্যাচ শেষে কুরাসাওয়ের ফুটবলার ও সমর্থকরা প্রমাণ করে দিয়েছেন- সব সেভেন আপ এক রকম নয়, এটা একেবারেই আলাদা। ব্রাজিলের ৭-১ ছিল একটি বড় শক্তির ভেঙে পড়া। আর কুরাসাওয়ের ৭-১ হলো ছোট্ট একটি দেশের বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা।

তাই এই সেভেন আপে হতাশা থাকতে পারে, কিন্তু সেই লজ্জা নেই। কারণ কুরাসাও ব্রাজিল নয়। কুরাসাও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন না। কুরাসাওয়ে বিশাল ফুটবল কারখানা নেই। কুরাসাও একটি ছোট্ট দ্বীপ। এই ভূখণ্ড এত ছোট যে, অনেক বড় শহরের এক স্টেডিয়ামে যত মানুষ বসে, কুরাসাওয়ের লোকসংখ্যা প্রায় তত। সেই ছোট্ট দেশটাই বিশ্বকাপে এসেছে। জার্মানির সামনে দাঁড়িয়েছে, গোলও করেছে। এটাই তাদের গল্প। আর সে গল্পই এই হারকে অন্য রকম করে দেয়।

ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জার্মানি নিজের শক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। গোল এসেছে একের পর এক। স্কোরবোর্ডে ব্যবধান বেড়েছে। কাগজে-কলমে সবকিছুই যেন কুরাসাওর বিপক্ষে গেছে। কিন্তু মজার কথা হলো, মাঠের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা স্কোরবোর্ডে ছিল না, ছিল গ্যালারিতে।

দল গোলের পর গোল খাচ্ছে, কুরাসাওর সমর্থকদের মুখে তখনও আনন্দ। তারা চুপ হয়ে যায়নি, মাথা নিচু করেনি। তারা মাঠ ছেড়ে চলে যায়নি, বরং পতাকা উড়িয়েছে, গান করেছে, হাততালি দিয়েছে, নিজের খেলোয়াড়দের নাম ধরে চিৎকার করে সাহস দিয়েছে। তারা যেন ধরেই নিয়েছেন, এই হারে কোনো লজ্জা নেই। 

এ জায়গাটাই কুরাসাওকে সেদিনের ব্রাজিলের অবস্থান থেকে আলাদা করে। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, কুরাসাওর ফুটবলের গল্পটা আজকের না, শিকড়টা বেশ পুরোনো। একসময় তারা অন্য নামে খেলত। পরে নিজেদের আলাদা পরিচয়ে মাঠে নামে। নাম বদলেছে, দেশের কাগজে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু ফুটবলের প্রতি টানটা রয়ে গেছে আগের মতোই।

কুরাসাওর অনেক খেলোয়াড়ের জন্ম ও বড় হওয়া ইউরোপে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসে। তবে তাদের হৃদয়ের টান কুরাসাওয়ের প্রতি। সেটা পরিবার বা মা-বাবা দাদা-নানার জন্মের সূত্র ধরে। তাই বিশ্বকাপে তাদের দলটা শুধু একটা দ্বীপের দল না, এটা শিকড়ে ফিরে আসা মানুষের দল। বাইরে থেকে দেখলে ছোট মনে হলেও, এটা আসলে অনেক দূরের গল্প নিয়ে তৈরি একটা ফুটবল দল। এই কারণেই কুরাসাওর ফুটবল শুধু ফুটবল নয়, একটা টান, পরিচয় আর ফিরে আসার গল্প। সে গল্পটাই জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচটাকে আলাদা করে।

জার্মানির জন্য এটা হয়তো বড় জয়, কিন্তু কুরাসাওর জন্য এটি ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের নাম লিখে যাওয়ার রাত। হ্যাঁ, আজ তারা ৭ গোল খেয়েছে, তারা গোল করেছেও। সেই এক গোল কোনো মাপেই কম না! সে কারণেই জার্মানির মতো দলের বিপক্ষে এক গোল মানে গর্ব করে বলার মতো একটি গল্প। ম্যাচে তারা বেশ কয়েকবার জার্মানির রক্ষণে ভীতিও ছড়িয়েছে।

সাত গোল খেয়েও তাই কুরাসাও গ্যালারিতে মন খারাপের চিত্র ছিল না। ছিল আনন্দ আর তৃপ্তি। পতপত করে উড়তে থাকা জাতীয় পতাকা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার আনন্দ, যা সাত গোল কেন ৭০ গোলেও মুছে যায় না! 

২০১৪ সালে ব্রাজিলের ৭-১ ছিল যখন একটি দুঃস্বপ্ন, তখন ২০২৬ সালের কুরাসাওর ৭-১ অন্য কিছু। এটা এমন এক সেভেন আপ যা নিয়ে কেউ হাসাহাসি করবে না, বরং এটি এমন এক হার যেখানে স্বপ্নবাজ একদল মানুষ তাদের স্বপ্নকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। তাই এটি এমন এক দিন, যেদিন জার্মানি মাঠের লড়াইয়ে জিতলেও লাখো কোটি মানুষের মানুষের মন জিতেছে কুরাসাও। 

শেষ বাঁশি বেজে গেছে। স্কোরলাইন বলছে ৭-১। এই রাতের পুরো গল্প যদি এক লাইনে বলতে হয়, তাহলে হয়তো বলতে হবে, সব সেভেন আপ এক রকম নয়। কুরাসাওর সেভেন আপে হার আছে, কিন্তু লজ্জা নেই। আছে একটি ছোট্ট দেশের বড় হয়ে ওঠার স্বপ্ন।

আরও পড়ুন

×