এই ‘সেভেন আপে’ সেই লজ্জা নেই কুরাসাওয়ের
ফাতিউস ফাহমিদ সৌরভ
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ০১:৫৪
মারাকানায় ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে সেই রাতটা ফুটবলপ্রেমীরা এখনো ভুলে যায়নি। যাকে অনেকে ‘মারাকানাজ্জো’ নামে চেনে। সেদিনের সেমিফাইনালে জার্মানি ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারিয়েছিল। সেই থেকে ফুটবলে ‘সেভেন আপ’ শুধু একটা স্কোর না। এক ধরনের খোঁচা। এক ধরনের হাসি। এক ধরনের লজ্জার স্মৃতি।
এবারের বিশ্বকাপে আবারও সেই সেভেন আপের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে জার্মানি। চারবারের বিশ্বকাপ জয়ীদের কাছে কুরাসাও হেরেছে ৭-১ গোলের ব্যবধানে। স্কোরলাইনটা দেখলে মনে হতে পারে এই ম্যাচের গল্পটাও বুঝি একই। ম্যাচ শেষে কুরাসাওয়ের ফুটবলার ও সমর্থকরা প্রমাণ করে দিয়েছে সব সেভেন আপ এক রকম নয়। এটা একেবারেই আলাদা। ব্রাজিলের ৭-১ ছিল এক বড় শক্তির ভেঙে পড়া। আর কুরাসাওয়ের ৭-১ হলো এক ছোট্ট দেশের বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা।
তাই এই সেভেন আপে হতাশা থাকতে পারে কিন্তু সেই লজ্জা নেই। কারণ কুরাসাও ব্রাজিল নয়। কুরাসাও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন না। কুরাসাওর বিশাল ফুটবল কারখানা নেই। কুরাসাও একটা ছোট্ট দ্বীপ। এত ছোট যে অনেক বড় শহরের একটা স্টেডিয়ামে যত মানুষ বসে, তাদের দেশের লোকসংখ্যাও প্রায় ততটাই। তবু সেই ছোট্ট দেশটাই বিশ্বকাপে এসেছে। জার্মানির সামনে দাঁড়িয়েছে। আর গোলও করেছে। এটাই তাদের গল্প। আর সেই গল্পই এই হারকে অন্য রকম করে দেয়।
ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জার্মানি নিজের শক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। গোল এসেছে একের পর এক। স্কোরবোর্ডে ব্যবধান বেড়েছে। কাগজে-কলমে সবকিছুই যেন কুরাসাওর বিরুদ্ধে গেছে। কিন্তু মজার কথা হলো মাঠের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা স্কোরবোর্ডে ছিল না। ছিল গ্যালারিতে।
দল গোলের পর গোল খাচ্ছে কিন্তু কুরাসাওর দর্শকদের মুখে তখনও আনন্দ। তারা চুপ হয়ে যায়নি। তারা মাথা নিচু করেনি। তারা মাঠ ছেড়ে চলে যায়নি। বরং পতাকা উড়িয়েছে, গান করেছে, হাততালি দিয়েছে, নিজেদের খেলোয়াড়দের ডেকে ডেকে সাহস দিয়েছে। যেন তারা খুব ভালো করেই জানতো আজকের রাতে জিততে না পারলেও তারা হেরে যায়নি।
এই জায়গাটাই কুরাসাওকে সেদিনের ব্রাজিলের চেয়ে আলাদা করেছে। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না যে কুরাসাওর ফুটবলের গল্পটা আজকের না। ফুটবলের শিকড়টা পুরোনো। একসময় তারা আরেক নামে খেলত। পরে নিজেদের আলাদা পরিচয়ে মাঠে নামে। নাম বদলেছে, দেশের কাগজে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু ফুটবলের টানটা রয়ে গেছে।
আরেকটা মজার কথা আছে। কুরাসাওর অনেক খেলোয়াড়ের জন্ম বা বড় হওয়া ইউরোপে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসে। তাদের কারও পরিবার, কারও শিকড়, কারও বাবা-মা বা দাদা-নানার টান কুরাসাওর সঙ্গে। তাই এই দলটা শুধু একটা দ্বীপের দল না। এটা শিকড়ে ফিরে আসা মানুষেরও দল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ছোট একটা দেশ। ভেতরে ভেতরে এটা আসলে অনেক দূরের গল্প নিয়ে তৈরি একটা দল।
এই কারণেই কুরাসাওর ফুটবল শুধু ফুটবল নয়, এটা টান, পরিচয় আর ফিরে আসার গল্পও। আর সেই গল্পটাই জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচটাকে এত আলাদা করেছে। কারণ জার্মানির জন্য এটা হয়তো আরেকটা বড় জয়। কিন্তু কুরাসাওর জন্য এটা ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের নাম লিখে যাওয়ার রাত। হ্যাঁ, আজ তারা ৭ গোল খেয়েছে। কিন্তু তারা গোলও করেছে। সেই এক গোলও তাদের জন্য কম না। এমন একটা দেশের বিপক্ষে যারা বিশ্ব ফুটবলের দানবদের একজন। সেই দলটির বিপক্ষে এক গোল মানে শুধু এক গোল না গর্ব করে বলার মতো গল্প। আজকের ম্যাচে তারা বেশ কয়েকবার জার্মানির রক্ষণে ভীতি ছড়িয়েছে।
আর তাদের দর্শকরা পুরো ম্যাচে তাদের খেলোয়াড়দের সমর্থন করে গেছেন। তাই তো গোল খেয়েও তাদের গ্যালারিতে মন খারাপের চেয়ে আনন্দই বেশি ছিল। তারা স্কোরটা দেখছিলেন না, তারা দেখছিল নিজেদের দেশকে। তারা দেখছিলেন ছোট্ট কুরাসাও বিশ্বকাপে খেলছে। দেখছিলেন তাদের পতাকা পতপত করে উড়ছে সারা পৃথিবীর চোখের সামনে। সাত গোল কেন ৭০ গোলেও সেই আনন্দ মুছে যায় না?
কুরাসাওর সমর্থকেরা সেটাই করেছে। তারা দলকে বিদ্রুপ করেনি। তারা রাগে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। তারা শেষ পর্যন্ত পাশে থেকেছে। তারা যেন বলেছে তাদের ভাইদের বলছে আমরা তোমাদের নিয়ে গর্বিত। এই ম্যাচের ফলাফলে কিছু এসে যায় না। সত্যি বলতে এই জায়গাটাতেই কুরাসাও আজ জিতে গেছে।
২০১৪ সালের ব্রাজিলের ৭-১ ছিল দুঃস্বপ্ন। ২০২৬ সালের কুরাসাওর ৭-১ হলো অন্য কিছু। এটা এমন এক সেভেন আপ যেটা নিয়ে কেউ হাসাহাসি করবে না। এটা এমন এক হার যেখানে একদল স্বপ্নবাজ মানুষ তাদের স্বপ্নকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। আজকের দিনটা এমন একটা দিন যেখানে জার্মানি মাঠের লড়াইয়ে জিতেছে কিন্তু কুরাসাও মানুষের মন জিতেছে।
শেষ বাঁশি বেজে গেছে। স্কোরলাইন বলছে ৭-১। কিন্তু এই রাতের পুরো গল্প যদি এক লাইনে বলতে হয়, তাহলে হয়তো বলতে হবে সব সেভেন আপ এক রকম নয়। কুরাসাওর সেভেন আপে হার আছে, কিন্তু লজ্জা নেই। আছে শুধু এক ছোট্ট দেশের বড় হয়ে ওঠার গল্প।
- বিষয় :
- কুরাসাও
- ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬
