ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

দৌলতপুর সীমান্ত

তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে চার শিশুসহ ১২ জন

বিজিবি-বিএসএফ অনড়, নাগরিকত্ব যাচাই করছে দুই পক্ষ

তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে চার শিশুসহ ১২ জন
×

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখার পাটক্ষেতে তিন দিন ধরে বন্দি হয়ে আছেন তারা। ছবি: সমকাল

আহমেদ রাজু, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ২৩:৩২

মাথার ওপর তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরম। চারপাশে সাপ আর পোকামাকড়ের আতঙ্ক। এরই মাঝে ত্রিপল বিছিয়ে উন্মুক্ত স্থানে দিন কাটছে চার শিশুসহ ১২ জন নারী-পুরুষের। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্তের শূন্যরেখার পাটক্ষেতে তিন দিন ধরে বন্দি হয়ে আছেন তারা। 

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) অনড় অবস্থানের কারণে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এই অসহায় পরিবারগুলো। 

গত শুক্রবার ভোররাতে ভারতের চরমেঘনা সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) চেষ্টা করে। তবে বিজিবির বাধার মুখে তারা এই শূন্যরেখায় আটকে পড়েন। সময় যত গড়াচ্ছে, খাবার ও পানির সংকটে অবরুদ্ধ মানুষগুলোর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। বিশেষ করে চার শিশুর অবস্থা এখন আশঙ্কাজনক। 

এই চরম দুর্ভোগে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের উদ্ধারে কোনো প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। তবে বিজিবি জানিয়েছে, দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। দ্রুতই সিদ্ধান্ত আসতে পারে। 

শূন্যরেখায় শিশুর কান্না, ঘরে থাকতে পারেনি সীমান্তবাসী 
এদিকে কাঁটাতারের বাধা পেরিয়ে জেগে উঠেছে দুই বাংলার মানুষের চিরন্তন মানবিকতা। নিজেদের সাধ্যমতো জামাকাপড়, খাদ্য ও চিকিৎসা উপকরণ নিয়ে আটকে পড়াদের পাশে ছুটে গিয়েছেন বাংলাদেশের সীমান্তের বাসিন্দারা। 

খাবার দিতে যাওয়া প্রাগপুর সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দা সুজন ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘কাঁটাতারের ওপারে পাটক্ষেতের মধ্যে বাচ্চাগুলো যেভাবে কাঁদছিল, তা শুনে ঘরে বসে থাকা যায় না। তীব্র রোদে আর গরমে ওরা প্রায় আধমরা হয়ে গেছে। বিজিবির নজরদারির মধ্যেই আমরা দূর থেকে মানবিক কারণে কিছু রুটি, ছাতু, বিস্কুট আর পানির বোতল ওদের দিকে ছুড়ে দিয়েছি।’ 

আটকে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১২ জনের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের দুই শিশুসহ পাঁচজন, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের এক শিশুসহ তিনজন, খুলনার ডুমুরিয়ার এক শিশুসহ তিনজন এবং বাগেরহাটের রামপালের একজন বাসিন্দা রয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন নিজেদের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রও দেখিয়েছেন। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। 

পতাকা বৈঠক ও অমীমাংসিত কূটনীতি
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত শনিবার সকালে দৌলতপুরের বিলগাথুয়া সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ৪৭ বিজিবি কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক নুরুল হুদা এবং বিএসএফের রাণীনগর ক্যাম্পের সহকারী কমান্ড্যান্ট সুনীল কুমার যাদবের মধ্যে ২০ মিনিট স্থায়ী এই বৈঠকে পুশইনের বিষয়টি নিয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। তবে বিএসএফ পুশইনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানায়, আটকে থাকা ব্যক্তিরা ভারতীয় নাগরিক কিনা, তা তারা যাচাই করে দেখছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া শেষ হতে কতদিন লাগবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সীমা জানায়নি তারা। 

৪৭ বিজিবি কুষ্টিয়া ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, ‘আমাদের সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে কোনো পুশইনের চেষ্টা আমরা সফল হতে দেব না। বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পতাকা বৈঠকে আমরা বিএসএফকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, নিয়মতান্ত্রিক যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে যেহেতু সেখানে নারী ও শিশু রয়েছে, তাই মানবিক দিকটি বিবেচনা করে বিষয়টি দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।’ 

এই অমানবিক পরিস্থিতির মাঝেই গত শুক্রবার গভীর রাত এবং রোববার ভোরে প্রাগপুরের বিলগাতুয়া ও মহিষকুণ্ডী সীমান্ত দিয়ে কয়েক দফায় নতুন করে পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়েছে। তবে বিজিবির কড়া নজরদারির কারণে সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়। রোববার রাত ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সীমান্তে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল এবং বিজিবির টহল জোরদার করা হয়। 

চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে ১১ জনকে পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি
চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা জানিয়েছেন, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-জয়নগর সীমান্তে ১১ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থানে তা ব্যর্থ হয়েছে। পরে তাদের সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় বিএসএফ। রোববার ভোর ৪টার দিকে দর্শনা-জয়নগর সীমান্তের ৭৫ নম্বর পিলারের কাছে ওই ঘটনা ঘটে। 

বিজিবি জানায়, দর্শনা আন্তর্জাতিক চেকপোস্টের পাশে ৭৫ নম্বর মেইন পিলার সংলগ্ন ভারতীয় অংশে ভোরের দিকে ১১ জন ব্যক্তিকে জড়ো করে বিএসএফ। উদ্দেশ্য ছিল তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানো। খবর পেয়ে দ্রুত সতর্ক অবস্থান নেন বিজিবি সদস্যরা। স্থানীয় গ্রামবাসীরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে জড়ো করা ১১ জনকে শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। 

এদিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-গেদে সীমান্তের নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাছ থেকে জুলফিকার আলী (২২) নামে এক বাংলাদেশি যুবককে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। গত শনিবার সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাছ থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। 

আটক জুলফিকার আলী দর্শনা পৌর এলাকার জয়নগর গ্রামের কালু মৌলভীর ছেলে। তিনি দর্শনা পৌর এলাকার রামনগর বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন বলে জানা গেছে। 
চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, বিএসএফ সদস্যরা জুলফিকারকে ভারতীয় পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছেন। আইনগত কার্যক্রম শেষে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে। 

রৌমারী সীমান্তে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা রুখে দিল বিজিবি
রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে নারী, শিশুসহ ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। রোববার সকালে উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া এবং রৌমারী সদর ইউনিয়নের ভন্দুরচর সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে। 

বিজিবির ৩৫ জামালপুর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান জানান, রোববার সকালে রৌমারীর গয়টাপাড়া ও ভুন্দুরচর সীমান্তে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিএসএফ ও স্থানীয়দের শক্ত অবস্থানের কারণে তা সফল হয়নি। তারা সবাই শূন্যরেখা থেকে ভারতের ৫০ গজ অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন। এ ঘটনায় পতাকা বৈঠকের জন্য আহ্বান করা হলেও বিএসএফ সাড়া দিচ্ছে না। 

ভুলবশত ভারতে ঢুকে আটক বাংলাদেশি কিশোরীকে ফেরত দিল বিএসএফ 
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ভুলবশত ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া জয়নব খাতুন (১২) নামে এক বাংলাদেশি কিশোরীকে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ফেরত দিয়েছে বিএসএফ। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে গত শনিবার রাত ১১টায় তাকে ফেরত দেওয়া হয়। আটক জয়নব ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ঘগয়ারপাড় এলাকার জামাল উদ্দিনের মেয়ে। 

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, শনিবার বাড়িতে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে দক্ষিণ অনন্তপুর নাজিরহাট সীমান্ত এলাকায় যায় জয়নব। সেখানে ভুলবশত সে ভারতে ঢুকে পড়লে টহলরত বিএসএফ সদস্যরা তাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে কাশিপুর বিওপির সদস্যরা তাকে আবারও ভারতীয় অংশে পাঠিয়ে দেন। পরে বিএসএফ সদস্যরা তাকে ক্যাম্পে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিজিবিকে জানান। বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাত ১১টায় পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাকে ফেরত নেয়। 

কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিক জানান, কিশোরী জয়নবকে বিজিবির সদস্যদের উপস্থিতিতে বিএসএফ গভীর রাতে ফেরত দিয়েছে। 

পাঁচবিবি সীমান্তে বৃদ্ধকে পুশইনের চেষ্টা, ফিরিয়ে দিল বিজিবি
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ধরঞ্জি ইউনিয়নের হাটখোলা সীমান্ত দিয়ে এক বৃদ্ধকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে বিএসএফ। বিজিবির সদস্যরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাঁকে আবার ভারতে ফেরত পাঠান। রোববার সকাল ৮টার দিকে হাটখোলা সীমান্তের ২৭৯ নম্বর প্রধান পিলারের ২৭ নম্বর সাব-পিলার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। 

পরে ‎বিকেল ৩টা পর্যন্ত ওই বৃদ্ধকে সীমান্তের শূন্যরেখায় বসিয়ে রাখে বিএসএফ। এ সময় সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

×