সীমার মাঝে অসীম মেসি
আলজেরিয়ার বিপক্ষে গতকাল হ্যাটট্রিক করেছেন মেসি। ছবি: এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ১৪:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
অ্যারোহেডের ১২ তলা সমান ৭০ হাজার দর্শকের খোলা গ্যালারিটিকে তখন সূর্যমুখীর মতোই লাগছিল। মাঠের মাঝে দুই দলের সব খেলোয়াড়। অথচ সবাই তাকিয়ে ওই সূর্যের দিকে মুখ করে। তার নড়াচড়াতে গ্যালারির মুখও সরে যাচ্ছিল। সম্মোহনের প্রবল সেই টান উপেক্ষা করার সাধ্যি ছিল না মেসির। তাই গ্যালারিকে আলো করে তাঁর সেই সূর্যের তাপে পুড়িয়েছেন আলজেরিয়াকে। গুনে গুনে তিন-তিনটি গোল করেছেন এই ঊনচল্লিশের বাঁ পা দিয়েই! আসলে ওই জাদুকরি বাঁ পা তো স্রেফ কোনো সাধারণ মানুষের পা নয়; ওটা আসলে ফুটবল-ঈশ্বরের কোনো বরদান, যা দিয়ে প্রথম ম্যাচের প্রথম প্রহরেই সব রেকর্ড চুরমার করে বিশ্বমঞ্চের সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের শৃঙ্গে আরোহণ করেছেন তিনি। প্রমাণ নয়; শুধু মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফুটবল হচ্ছে তাঁর পায়ের ছোঁয়ায় আঁকা এক অলৌকিক শিল্পকর্ম। অসীমের অমর রূপকার তিনিই।
কাতারের সেই লুসাইলে বিশ্বকাপ যেখানে শেষ করে এসেছিলেন, এদিন যেন কানসাসে সেখান থেকেই শুরু করলেন। মাঝখানে লোকের শুধু বলাবলি, তিনি আর বিশ্বকাপ খেলবেন কিনা, খেললেও আগের মতো ক্ষিপ্রতা দেখাতে পারবেন কিনা? সকারের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এসে ফুটবল খেলে আর কী-ইবা হবে– এমন ধরনের সমস্ত ফিসফিসানির মুখ ছিপি দিয়েই যেন আটকে রাখলেন। এদিন প্রথম গোলটিই ছিল দূরপাল্লার রকেট শটে, দ্বিতীয় গোলটিতে ছিল চিতার ক্ষিপ্রতা, তৃতীয়টিতে চতুরতা। তিনি এখনও সেই আগের মতো আছেন। মুখের দাড়ি আর হেয়ার স্টাইল ছাড়া কিছুই বদলায়নি তাঁর। বন্ধু রদ্রিগে ডি পলের বাড়ানো অসাধারণ এক পাস পেয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁকানো মিসাইল গতির এক শট। গোলটি নেওয়ার পর কিছুটা আবেগী দেখায় তাঁকে। চোখ মুছে নেন মুহূর্তে। দ্বিতীয় গোলটি এসেছে ম্যাক অ্যালিস্টারের নেওয়া শট লুকা জিদান গ্রিপ করতে না পারায় ওত পেতে থাকা মেসি সেই সুযোগটি নেন ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। তৃতীয় গোলটিও এসেছে ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে ডি-বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এই হ্যাটট্রিক গোলটি দিয়েই ইতিহাস গড়ে নেন তিনি।
আর্জেন্টাইনরা এই যে গেল কয়েক দিন কানসাসে সকাল-দুপুর গান বেঁধে চলেছেন মেসিকে নিয়ে, তাদের বড় একটা অংশ সাক্ষী ছিল ইতিহাসের। তারাও জানতেন, ম্যাচটি জিতবে; গোলও পাবেন তাদের ‘গোট’। তা যে তিন-তিনটি, এতটা বোধ হয় আশা করেননি মেসি চাও... মেসি চাও... বলে সারাক্ষণ গ্যালারিকে উত্তাল করে তোলা সমর্থকরাও। রীতিমতো চমকে দেওয়া ব্যাপারই ছিল– ১৬ গোল করে বিশ্বকাপের সর্বাধিক গোলের যে রেকর্ড গত ১২টি বছর ধরে দখল করে রেখেছিলেন মিরোস্লাভ ক্লোসা, সেটিই কিনা মেসির পায়ে সমান হলো ৮০ মিনিট মাঠে থেকে। দেশের হয়ে তিনি আগেও ১১ বার হ্যাটট্রিক করেছেন, তবে বিশ্বকাপে এটিই তাঁর প্রথম। চাইলে আরও কিছুক্ষণ মাঠে থাকতে পারতেন। লোভী তিনি কখনোই নন। সে কারণে নিকো পাজের মতো নবাগতকে আসতে বলে নিজেই উঠে যান। অ্যারোহেডের দর্শকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে যান ভালোবাসার চুমু।
মেসি তো এমনই বড্ড আবেগী। দর্শককে বিনোদন দিয়ে যাওয়াটাকে তিনি তাঁর দায়িত্ব বলে মনে করেন। এদিন ম্যাচের পর আর্জেন্টাইন অনেক টেলিভিশন লাইভ করছিল দর্শকের অনুভূতি নিয়ে। স্প্যানিশ ভাষায় কী বলেছে, তা কাছে দাঁড়িয়েও বোঝা সম্ভব নয়। তবে তাতে কিলিয়ান-ক্রিশ্চিয়ানো শব্দগুলো শুনে আন্দাজ করা যায়, তাদের আলোচনার বিষয় মেসির সর্বাধিক ১৬ গোলের রেকর্ড ভাঙার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ওই দুজনের নাম এসেছে। এদিন মেসির আগে এমবাপ্পেও দুটি গোল করেন ঘানার বিপক্ষে। এ মুহূর্তে এমবাপ্পের বিশ্বকাপ গোলের সংখ্যা ১৪, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ৮ আর মেসির ১৬। তাদের তিনজনই যখন বিশ্বকাপ খেলছেন, সেখানে সংখ্যাটা অন্তত ১৯ জুলাই না যাওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। মেসি বার্সেলোনায় থাকার সময় রোনালদোর (রিয়াল মাদ্রিদে খেলতেন তখন) সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে যে দ্বৈরথ চলত, এবারের বিশ্বকাপেও তা থাকবে। কিন্তু বিশ্বকাপের পর? সময়ের দাবি মেনে একদিন বুটজোড়া তো তুলে রাখতেই হবে– এই চিরন্তন সত্য মনে রেখে বলা যায়, সীমার মাঝে অসীম মেসি। এটিও তো সত্য, সৃষ্টির কোনো সীমারেখা নেই।