এক্সপ্লেইনার
বিশ্বকাপে ঢেউ তুলেছে ‘ভাইকিং রো’, কেন এমন উদযাপন
সেনেগালের বিপক্ষে জয়ের পর ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন করেন নরওয়ের ফুটবলাররা। সোমবার নিউইয়র্কে। ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ১৮:০৯ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ১৮:৩৮
সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জয়ের পর নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছে নরওয়ে। এমন মুহূর্ত কীভাবে উদযাপন করতে হয়, তা হলান্ডদের বেশ ভালো করেই জানা। সোমবার তাই নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকরা সাক্ষী হলেন ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’র।
চলতি বিশ্বকাপে নিজেদের দুটি ম্যাচেই নরওয়ের সমর্থকরা স্টেডিয়ামে বিশেষ ঢঙে উল্লাস করেছেন। এই উদযাপন করতে তারা গ্যালারিতে এমনভাবে সারি তৈরি করেন যা দেখে মনে হয়, একটি ভাইকিং যুদ্ধজাহাজে (লংবোট) বসে আছেন। এরপর ড্রামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবাই একসঙ্গে দাঁড় টানার ভঙ্গি (রোইং) করতে থাকেন।

সোমবার বিশেষ এই উদযাপনের পর নরওয়েজিয়ান তারকা আর্লিং হলাল্ড জানান, তিনি এই উদযাপনের বড় ভক্ত। ফক্স স্পোর্টসকে দেওয়া হলান্ডের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে ইএসপিএন। হলাল্ড বলেন, ‘আমি এটি অনলাইনে দেখেছি, পুরোপুরি ভাইরাল হয়ে গেছে।’ ম্যাচের আগে হলান্ডকে মার্টিন (নরওয়ের মিডফিল্ডার) জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাদেরও কি এতে অংশ নেওয়া উচিত? জবাবে হলান্ড বলেছিলেন, যদি জিততে পারেন তবে অবশ্যই এভাবে উদযাপন করবেন।
যেমন কথা তেমন কাজ। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই হলাল্ড ও তাঁর সতীর্থরা স্টেডিয়ামে নরওয়ের সমর্থকদের গ্যালারির কাছে যান। মাঠের এক পাশে হলান্ডরা আর সামনের গ্যালারিতে সমর্থকরা জয় উদযাপন করেন দাঁড় টানার ভঙ্গিতে।
The Norwegian team and fans doing the Row are just beautiful.pic.twitter.com/hi2YqZimUi
— World Cup 2026 Daily (@TotalFootball) June 23, 2026
ভাইরাল হওয়া এক উদযাপন
আসরের শুরু থেকে নরওয়ের সমর্থকদের বিভিন্ন জায়গাতে ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন করতে দেখা গেছে। স্টেডিয়ামের ভেতরের করিডোর, ফ্যান জোন, আয়োজক শহরের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে শপিংমলের চলন্ত সিঁড়িতেও ভক্তরা দাঁড় টানার ভঙ্গিতে ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন।
সোমবার নকআউট পর্ব নিশ্চিত হওয়ার পর কয়েক হাজার নরওয়েজিয়ান সমর্থক নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে জড়ো হন। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই স্থানটি মুহূর্তের মধ্যে একযোগে দাঁড় টানার সমুদ্রে রূপ নেয়। এই উন্মাদনা কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে পড়েছে দূর-দূরান্তে। ম্যাচের ফাইনাল বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে নরওয়ের ট্রনহেইম শহরেও সমর্থকরা ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন করেন।

উদযাপনটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, নরওয়ের রাজনৈতিক মহলেও পৌঁছে গেছে। গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচ জয়ের পর দেশটির এমপিরাও ভাইরাল ট্রেন্ডে মাতেন। জাতীয় ফুটবল দলের প্রতি সমর্থন জানাতে তারা পার্লামেন্টের ভেতর দাঁড় টানার ভঙ্গি প্রদর্শন করেন।
কেন এমন উদযাপন?
এই উত্তরের আগে জানতে হবে ভাইকিংদের সম্পর্কে। ভিজিট নরওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮০০ থেকে ১০৫০ সালে ভাইকিংরা ছিল নর্ডিক দেশগুলোর কৃষক, নাবিক, ব্যবসায়ী ও যোদ্ধা। তারা বাণিজ্য, নতুন বসতি স্থাপন ও প্রভাব বিস্তারের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রযাত্রা করত। তবে শুধু বাণিজ্যই করত না; অনেক সময় বিভিন্ন এলাকা দখল এবং লুটপাটও করেছে।
All of Norway has taken over Times Square pic.twitter.com/0pEHrEeFbE
— Barstool Sports (@barstoolsports) June 22, 2026
নরওয়েজীয় ভাইকিংরা তাদের সাহসী মানসিকতার জন্য পরিচিত ছিল। স্থলযুদ্ধ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ নৌ অভিযান- তারা সাধারণত ক্ষতির মুখেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখাত।
ওয়ারফেয়ার হিস্ট্রি নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, ভাইকিংদের দ্রুত অভিযান পরিচালনার প্রধান চাবিকাঠি ছিল তাদের ‘লংবোট’। এই নৌযানের মাধ্যমে তারা সমুদ্রবন্দরসহ বিস্তৃত সামুদ্রিক ও নদীপথে যাতায়াত করতো। লংবোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর তলদেশ। সৈন্য, সরঞ্জাম ও লুট করা সম্পদে বোঝাই থাকলেও এটি অল্প পানির মধ্য দিয়েও চলতে পারত।

লংবোটে দাঁড় টানা হতো একযোগে। একেকটি নৌকায় ৬ থেকে সর্বোচ্চ ১৬টি বেঞ্চ থাকতো। সেখানে বসে নাবিকরা দাঁড় টানতেন। শক্তি সঞ্চয় ও একঘেয়েমি কাটাতে ছন্দ করে ‘রো... রো’ শব্দ করতেন।
নরওয়ের ফুটবলে এই উদযাপন কবে শুরু হয় তা জানা যায়নি। তবে ভিজিট নরওয়ের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তাদের সংস্কৃতিতে ভাইকিং ঐতিহ্যের প্রভাব এখনো গভীরভাবে বিদ্যমান। দেশজুড়ে আছে ভাইকিং যুগের আকর্ষণীয় নিদর্শন, জাদুঘর ও ঐতিহাসিক গ্রাম।
গত রোববার সামাজিক মাধ্যমে উদযাপনটির একটি রিল প্রকাশ করে সিএনএন। সেখানে উলে ফ্রয়স্টাদ নামে এক সমর্থক বলেন, এর মাধ্যমে তারা হাজার বছর আগে ফিরে যান। ভাইকিংরা যেকোনো যুদ্ধের আগে অনুপ্রেরণা পেতে ‘রো...রো’ স্লোগান দিতো। ফুটবল দলকে অনুপ্রেরণা দিতে এখন তারা (ফ্রয়স্টাদ) এই স্লোগান দিচ্ছেন।

শুধু নরওয়েজিয়ানরা উদযাপন করে?
নরওয়ে ফুটবল দলের সমর্থকদের মাধ্যমে উদযাপনটি ভাইরাল হলেও এটি ২০১৬ সালের ইউরোতেও দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্পোর্টস নিউজ পোর্টাল ‘গিভ মি স্পোর্টসের’ তথ্য অনুযায়ী, সেবার নর্ডিক অঞ্চলের আরেক দেশ আইসল্যান্ডের সমর্থকরা প্রায় একই ধাঁচে উদযাপন করেছিলেন। সেটি পরিচিতি পেয়েছিল ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’ নামে।
নেদারল্যান্ডসের সমর্থকদেরও প্রায় কাছাকাছি ভঙ্গিতে উদযাপন করতে দেখা গেছে। ‘লিংকস রেখটস’ শিরোনামের গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাচরা এমন উদযাপন করেন। তবে ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনের ভঙ্গি ডাচদের তুলনায় সহজ। গ্যালারি কিংবা যেকোনো স্থানে বসেই উদযাপন করা যায়।
- বিষয় :
- নরওয়ে
- আর্লিং হালান্ড
- ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬
